প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “সুলিমুল্লাহ খানরা মুসলমান হিসেবে হিন্দুদের চেয়ে আলাদা জাতি?”

“সুলিমুল্লাহ খানরা মুসলমান হিসেবে হিন্দুদের চেয়ে আলাদা জাতি?”

সুষুপ্ত পাঠক

225

*বাংলাদেশের সলিমুল্লাহ খান ডয়েচ ভেলে সংবাদ মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন যেখানে তিনি দাবী করেছেন, ‘অখণ্ড ভারত’ হচ্ছে বিজেপির পুরোনো রাজনীতির অংশ। তার কথা সিরিয়াসলি ধরলে মনে হতে পারে কেবলমাত্র হিন্দুত্ববাদীরাই অখণ্ড ভারত চায়। এটা নাকি অনেক পুরোনো খেলা, এ কারণেই ল’ড়াই হয়েছিলো ৪৭ সালে। এবার নাকি কাশ্মিরকে অখণ্ড ভারতে যুক্ত করায় ভারত ভে’ঙ্গে যাবে এবং এ জন্য নরেন্দ মোদি নন্দিত হবেন স্বাধীনতাকামীদের কাছে। তারপর যে কথাটি তিনি বলেছেন, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তিনি দাবী করেছেন ‘অখণ্ড ভারত’ মানে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করার সুদূরপ্রসারি একটি পরি’কল্পনা।

*তার কথাতে কোন রাখঢাক নেই। তিনি পরিস্কার করে দ্বিজাতি তত্ত্বকে সমর্থন করলেন এবং পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিকে মেনে নিলেন যারা কিনা ভারতের ষ’ড়যন্ত্রের শি’কার। সলিমুল্লাহ খানের ভাষ্য হলো, ভারতীয় বলতে কোন জাতি কোনকালেই ছিলো না। ইউরোপ বলতে যা বুঝায়, ভারতীয় বলতে সেরকমই কিছু বুঝায়। ভারতের রাজ্যগুলো আসলে একেকটা দেশ। ইউরোপের মতই এগুলোর স্বাধীনতা দরকার।

*জনাব সলিমুল্লাহ খান, ‘বাংলাদেশী’ কিংবা ‘পাকিস্তানী’ বলতে কোন জাতি কিংবা দেশ কি এখানে ছিলো? বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এতগুলো জাতি স’ম্প্রদায় মিলে তাহলে কেমন করে থাকছে? ভারতে পাঞ্জাবি, বাঙালি, তামিল, তেলুগু, মারাঠি, মালায়ালমসহ অন্যান্য জাতি সম্প্রদায় যে অখণ্ড ভারত রচিত করেছে আপনার কি কেবল তাতেই সমস্যা? ভারত ভে’ঙ্গে মুসলমানরা পাকিস্তান করল। আপনার তত্ত্ব হলো এদেশগুলো কখনই ভারত নামের কোন কিছুর অঙ্গ ছিলো না। তাই ভাগ হয়েছে। শ্রীলংকা, ভুটান, নেপালের উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তান কেন হলো তার ব্যাখ্যা এখানে দেননি। কেন কেবল মুসলমানদের সমস্যা ঘটে ভারতে? কাশ্মির ভারতের মূলধারায় মিশে গেলে বা মেশানোর চেষ্টা করলে ভারত ভে’ঙ্গে যাবে অথচ ভারতে এতগুলো জাতি একসঙ্গে ইউনিয়ন করে থাকছে, তাদের কোন সমস্যা নেই কেন?

*জনাব সলিমুল্লাহ খান, তাহলে বেলুচ পাঞ্জাবী আর পাঠানরা কিসের ভিত্তিকে ‘পাকিস্তানী’ হয়ে একত্রে বাস করবে? ‘পাকিস্তান’ এই নামটি ভূগোল খুলে পাওয়া গিয়েছিলো নাকি কবির কবিতার উপমা থেকে এই নামটি ধার করা? আপনি ও আপনার মত যারা কাশ্মির নিয়ে ব্য’থিত এবং ভারত ভা’ঙ্গার আশায় গোঁফে তেল মেখে বসে আছেন, তারা কেউ কিন্তু বলেন না বেলুচ পাঞ্জাবী পাঠানদের উচিত নিজেদের আলাদা আলাদাভাবে স্বাধীন হবার চিন্তা করা। পশ্চিমবঙ্গের একজন বাঙালি ভারতে নিজেকে পরা’ধীন মনে করবে কেন? যদি সেরকম করাই উচিত তাহলে কি পার্বত চট্টগ্রামের একজন চাকমা মারমা’র কি একই রকমভাবে নিজেকে পরাধীন মনে হওয়া উচিত নয়?

*কাশ্মিরের উপর নাকি ভারতকে চা’পিয়ে দেয়া হচ্ছে। একইভাবে কি বাংলাদেশকে চাকমা মারমাদের উপর চা’পানো হয়নি? তাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো ‘বাঙালি রাষ্ট্র’ তারা চায় কিনা। মুক্তিযুদ্ধ যদি বাঙালী জাতীয়তাবাদের উপর হয়ে থাকে তাহলে সেই রাষ্ট্র কি আদিবাসী পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠির উপর চা’পানো হলো না? তবু তাদের ‘বাংলাদেশী’ হয়ে বাস করতে কোন আপত্তি নেই। তাহলে পাঞ্জাবি, বাঙালি, তামিল, তেলুগু, মারাঠিসহ ভারতের শখানেক জাতির ‘ভারতীয়’ হয়ে থাকতে কেন সমস্যা হবে? একজন মাঠাটা, কিংবা তেলুগু কি বলেছে ভারতে তারা পরাধীন জাতি?

*আসল কথা হচ্ছে মুসলমানদের আলাদা হতে হয়। কারণ সুলিমুল্লাহ খানরাও মনে করেন তারা মুসলমান হিসেবে হিন্দুদের চাইতে আলাদা জাতি। সমস্যা তাই কাশ্মিরের মুসলমানদের। সমস্যা ছিলো পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের। কাশ্মিরের অপর একটি অংশ পাকিস্তান দ’খল করে রেখেছে। সেখানে স্বাধীনতার প্রশ্ন আসে না। সুলিমুল্লাহ খান কিংবা বাংলাদেশী কবি দাউদ হায়দারের কিন্তু সেই কাশ্মির নিয়ে কোন ব্যথা-বেদনা নেই। চীনের হাতে দখ’লকৃত কাশ্মির, তিব্বত, উইঘুর নিয়ে কারোর কোন মাথাব্যথা নেই। হংকংয়ে এতদিন ধরে চীনের দখ’লদারীর বিরুদ্ধে আ’ন্দোলন চলছে অরুন্ধতীর তাতে কোন সমস্যা নেই। চীনের ৫০০০ সৈন্য হংকংয়ে থাকে তাতে হংকংয়ের সর্বভৌ’মত্ব ক্ষু’ণ্ন হয় না। হংকংয়ের প্রশাসকরা হংকংবাসীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নয়, কাঠামোগতভাবে তাদের চীনের কাছে দা’য়বদ্ধ থাকতে হয়।

*কাশ্মিরে এতদিন তো এরকম কোন অবস্থা ছিলো না। তাদের আলাদা আইন সংবিধান ছিলো। তারপরও কবি দাউদ হায়দারের কাছে বিশ পঁচিশ বছর আগে সেখানকার মুসলিম অধ্যাপক বুদ্ধিজীবীরা কেন আ’ক্ষেপ করে পরাধীনতার গল্প বলতেন? কারণ দ্বিজাতি তত্ত্ব আকাশ ফু’ড়ে বেরয়নি, এই তত্ত্ব মুসলমানদের ধর্মে আছে। এই তত্ত্ব সব মুসলমানের মনস্তত্বে আছে। হংকং, তিব্বত, বেলুচদের মত উপনিবেশ শাসন কাশ্মিরীদের ভো’গ করতে হয়নি। এখন ৩৭০ উঠে যাবার পর তারা ভারতের পাঞ্জাবি, বাঙালি, তামিল, তেলুগু, মারাঠিসহ আরো শ’খানেক জাতি সম্প্রদায়ের মত একই সংবিধান আইনে ভারতবাসী হয়ে বাস করবে। ‘বাংলাদেশী’ ‘পাকিস্তানী’ বলতে যদি কিছু না থেকেও বিনি সুতার মালায় নানা জাতি সম্প্রদায় এক রাষ্ট্রে বাস করতে পারে- তাহলে ভারতে সমস্যা কোথায়?

*সমস্যাটা মনে। হিং’সায় আর ঘৃ’ণায় এই উপমহাদেশের মুসলমানরা ভারতকে অভিশাপ দেয়। ৪৭ সালের দেশভাগ থেকে রে’ষারেষি কারণ প্রতিযোগীতায় টিকতে না পারা। পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে এ যাবতকালের সবগুলো যু’দ্ধে পরাজিত হয়েছে। সলিমুল্লাহ খানদের মত ছদ্ম’বেশী মুসলিম জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের এই পরাজয়ে ক্ষু’ব্ধ। আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের প্রভাবে তারা সাম্রাজ্যবাদ দেখতে পেলেও চীনের ব্যাপারে কবি দাউদ হায়দার নিরব! এই নিরবতার মানে অন্য রকম। যেমন দুনিয়ার এত স্বাধীনতাকামী জাতি থাকতে আহমদ ছফা ৯৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের উচিত স্বাধীনতা যু’দ্ধ করা ভারতের বিরুদ্ধে আর এরকম কিছু হলে বাংলাদেশের উচিত তাদের সাহায্য করা।

*একজন ভারতীয় বাঙালি কেন ভারতে নিজেকে পরা’ধীন মনে করবে? আহমদ ছফারা কি পূর্ব পাকিস্তানে পরা’ধীন ছিলেন? তাদের এই রকম ইতিহাস রচনা মি’থ্যা অসম্পূর্ণ। পূর্ব পাকিস্তানীরা পরা’ধীন ছিলো না। পাকিস্তানে বাঙালিদের প্রতি চরম বৈ’ষম্য চালানো হত। তাদের প্রকৃত মুসলমান মনে করা হতো না। তাদের হাফ হিন্দু মনে করা হত। বাঙালিরা ৪৭ সালে ঘোষণা দিয়ে মুসলমান হতে চাইল কিন্তু সেখানেও তাদের অপ’মান করা হলো। এই অপ’মানই তাদের সম্ভবত বাঙালি সংস্কৃতিতে সাময়িক সময়ের জন্য ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। নইলে বড় শখ করে, ভালোবেসে, র’ক্ত দিয়ে তারা ‘মুসলমানের নিজস্ব দেশ পাকিস্তান’ গড়েছিলো। ‘পরা’ধীন পাকিস্তান’ বলাটা তাই এখানে অন্যের উপর দোষ চা’পানো। পাকিস্তানী সে’নাবাহিনীকে ‘হানা’দার বাহিনী’ বলাটাও যৌক্তিক নয়, কারণ তারা বাইরে থেকে এসে আ’ঘাত করেনি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একই দেশ ছিলো।

*যাই হোক, এটা জেনে ভালো লাগছে আস্তে আস্তে প্রগতিশীলতার ছাল খু্লে শেয়ালগুলো হুক্কাহুয়া ডেকে উঠছে। তারা এখন দৃঢ়ভাবে বলছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লড়াই হয়েছিলো ‘অখণ্ড ভারত’ করার ষ’ড়যন্ত্র রু’খতে। সম্ভবত আনিসুজ্জামান, হায়াৎ মামুদরাই হচ্ছেন বাংলাদেশী সেক্যুলার প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের শেষ প্রতিনিধি। বাকী যারা এখন দা’পিয়ে বে’ড়াচ্ছেন তারা সকলেই তাদের চিন্তা ও লেখায় ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠায় অবিরাম চেষ্টা চা’লিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ হবার পর আহমদ ছফা, আবদুর রাজ্জাকদের চেষ্টা এখন ফরহাদ মজহার. সলিমুল্লাহ, রাইসু, সাজ্জাদ শরীফদের হাতে প্রপা’গান্ডা পাচ্ছে। কারণ তাদের হাতে মিডিয়া আছে, কাগজ আছে। তাদের বক্তব্য প্রচার পায়। আর আমাদের হাতে কেবল ফেইসবুক। তাতেই মু’খোশ খোলা অব্যাহত থাকুক…।