প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মুসলমানদের মানুষ বানাচ্ছি”

“আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মুসলমানদের মানুষ বানাচ্ছি”

তসলিমা নাসরিন

45

*আমি ডানপন্থী কখনও ছিলাম না। বাম-ঘেঁষা চিন্তাভাবনা বরাবরই ছিল। কোনওদিন পার্টি করিনি। কৈশোর পার হওয়ার পর ময়মনসিংহ শহরে দুটো দল যা গড়েছিলাম তা নিতান্তই শিল্প সাহিত্য বিষয়ক। মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন শতাব্দি চক্র, তারপর সকাল কবিতা পরিষদ। আরও একটা দল গড়েছিলাম সেটির নাম ধর্মমুক্ত মানববাদি মঞ্চ, সেটি কলকাতায়, শিক্ষিত সচেতন ধর্ম মুক্ত মুসলমান সমাজের নারী পুরুষদের নিয়ে। এটি গড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু নেপথ্যে ছিলাম। নেপথ্যে ছিলাম কারণ তখন নোং’রা রাজনীতি চলছে আমাকে নিয়ে, বাম দল আমার বাম-ঘেঁষা বই নি’ষিদ্ধ করেছে। ভ’য় ছিল মুসলমানদের মানুষ বানাচ্ছি এই অভিযোগে মুসলিম মৌলবাদি দলগুলো আমার বিরুদ্ধে আবার পথে না নামে।

*আমাকে ভারত বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক দলই কখনই পছন্দ করেনি। যে আমি বাম-ঘেঁষা বা বামপন্থী, সেই আমার সবচেয়ে বেশি স’র্বনাশ করেছে বাম দলই। আমার কাছ থেকে আমার শেষ সম্বল আমার বাংলাকে কেড়ে নিয়েছে। বাম দলের জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসুর সংগে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। তাঁদের সহানুভূতি সাহচর্যও পেয়েছি। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই আমার বই নিষিদ্ধ করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমার মুখ দেখা বন্ধ করলেন।

*দু বছর পর কলকাতা হাইকোর্ট বইটিকে নিষে’ধাজ্ঞা থেকে মুক্তি দেওয়ার পর শুরু হলো আমার ৭ নম্বর রওডন স্ট্রিটের বাড়িতে ঘন ঘন পুলিশের ফোন, পুলিশের বড়কর্তার সশরীরে আসা, আমাকে রাজ্য ছা’ড়ার আদেশ দেওয়া, নি’রাপত্তা উঠিয়ে দেওয়ার হু’মকি। আদেশ মানিনি বলে গৃহব’ন্দি করা হলো আমাকে। চার মাস গৃহব’ন্দি করে রাখার পর বাম নেতারা আয়োজন করলেন চোর ছ্যাচড়দের পথে নামানোর, কাগজে ‘তসলিমা গো ব্যাক’ লিখে টেলিভিশনের সামনে ধরে রাখার ব্যবস্থা করলেন, খামোকা আর্মি নামালেন, বিমান বসু বললেন, আমাকে যদি ওই চোর ছ্যাচড়্গুলো পছন্দ না করে, তা হলে আমি চলে যাই না কেন রাজ্য ছে’ড়ে!

*রাস্তার নাটকটি চলার অনেক আগে থেকেই কিন্তু আমার বাড়িতে হুম’কি দিয়ে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রীর হু’মকিবাহক প্রসূন মুখার্জি, বিনিত গোয়েল। ৭ নভেম্বর ২০০৭ তারিখে আমাকে নিরা’পত্তা পুলিশেরা উঠিয়ে নিয়ে খোলা একটি বাড়িতে রেখে চলে গেলেন। বলে গেলেন সিদিকুল্লাহ মিছিল নিয়ে আমাকে মা’রতে আসছে, বলে গেলেন একটা টে’ররিস্ট দল আমাকে মে’রে ফেলার প্ল্যান করেছে। সারাদিন আমি নিরা’পত্তাহীন বাড়িটিতে বসে রইলাম। এই হচ্ছে বাম রাজনীতি, আমাকে ভ’য় দেখাচ্ছে, ভ’য়ে ত’টস্থ হয়ে যেন নিজে থেকে রাজ্য ছেড়ে চলে চাই। আমাকে লোকে চেনে বলে আমাকে মে’রে ফেলেননি ওঁরা, নাহলে মে’রেই ফেলতেন বোধহয়। যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, সে বাড়ির মালিককে দিয়ে বলালেন বাড়ি ছা’ড়তে। আমার একার প্রতি’রোধে শেষ অবধি কাজ হয়নি। একদিন ঠিকই ঘাড় ধা’ক্কা দিয়ে বের করলেন। একটা ফ্রি ওয়ান ওয়ে টিকিট দিয়ে দিলেন হাতে।

*আমাকে রাজ্যছা’ড়া করেও বাম রাজনীতি শান্ত হয়নি। কেন্দ্রে বাম রাজনীতিকদের একজন ঘনিষ্ঠ লোক ছিলেন। তাঁকে দিয়ে আমাকে দেশ ছা’ড়া করার নানা রকম কায়দা কানুন শুরু হয়ে গেল। গৃহব’ন্দিত্ব থেকে শুরু করে মানসিক নির্যা’তন। অতঃপর কিছুতেই কাজ না হলে শারী’রিক। ডাক্তার দেখানো চলবে না। ওষুধ খাওয়া চলবে না। ব্লাড প্রেসার আকাশে উঠছে উঠুক। চিল্লাচিল্লি করার পর ডাক্তার দেখানো হলো বটে, ওঁদের তিন ওষুধের একটি খেয়েই অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলাম। এইমসের সিসিউতে একজন নিয়ে এলেন। তাঁর কিন্তু আমাকে সাহায্য করার কথা ছিল না।

*কর্তাদের আ’দেশ অমা’ন্য করেই নিয়ে এলেন। ওখানে জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা চললো, ডাক্তার বেহাল বললেন, ওষুধের ‘পয়জনাস রিয়েকশান’ হয়েছে, সপ্তাহ দুই লাগবে ব্লাড প্রেসার স্টেবল হতে। কিন্তু বাম রাজনীতিকদের সেই শুভাকাংখী আমাকে পরদিনই বের করে নিলেন হাস্পাতাল থেকে। প্রচণ্ড ফ্লাকচুয়েট করা ব্লাড প্রেসার নিয়ে ঘরে বসে থাকতে হলো। এইমসের কোনও ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। কষ্টে সৃষ্টে অন্য এক ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। সেই ডাক্তারও দুদিন পর হাওয়া। পরে শুনলাম সেই ডাক্তারের কাছে পুলিশ গিয়ে হু’মকি দিয়ে এসেছে, আমার সঙ্গে যেন ফোনে কথা না বলে। গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল আমার। আমি যদি দেশ না ছাড়ি, আমাকে তো মে’রে ফে’লবে এরা।

*স্টালিনের গুলাগের কথা মনে পড়লো। আমি জীবন বাঁ’চাতে ভারত ছা’ড়লাম ২০০৮ সালে। তারপরও আমি কিন্তু বাম পন্থী। আমি সমতায় সাম্যে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমি ধর্ম মানি না, কাস্ট মানি না, গরিব ধনী মানি না, বৈষম্য মানি না, সমতার সমাজে বিশ্বাস করি, এই বিশ্বাসের কথা লিখি আমি, আমি বাম না তো ওঁরা বাম?

*মাঝে মাঝে আমার জানতে ইচ্ছে হয় পশ্চিমবংগের বামফ্রন্ট সরকার কেন আমাকে দেশ থেকে তা’ড়ানোর জন্য অমন মরি’য়া হয়ে উঠেছিল?
১। পঞ্চায়েত নির্বাচনে মুসলমানের ভোট পাওয়ার জন্য? ইসলাম বিরো’ধীকে তাড়ি’য়েছি, আমাদের ভোট দে এইবার? কিন্তু আমি কোন ছার? মুসলমানদের ক’জন চেনে আমাকে?
২। দ্বিখণ্ডিত নি’ষিদ্ধ করেছিলেন, কিন্তু দুবছর পর হাইকোর্ট বাতিল করেছিল বলে নিষে’ধাজ্ঞা? কিন্তু নি’ষেধাজ্ঞার বি’রুদ্ধে মামলা তো আমি করিনি। করেছে এপিডিআর।

*৩। সুনীল গংগো বন্ধু বুদ্ধ’র কাছে বায়না ধরেছিলেন যে করেই হোক আমাকে রাজ্যছা’ড়া অথবা দেশ্ছা’ড়া করতে হবে, যেহেতু দ্বিখণ্ডিততে যেভাবে বাংলাদেশের মহাপুরুষদের মুখো’শ উন্মো’চন হয়েছে, পরের খণ্ডে পশ্চিম্বংগের মহাপুরুষদের মুখো’শ সেভাবে উন্মো’চন হওয়ার আশংকা আছে বলে? তাই আপ’দটাকে পগার’পার করতে হবে? কিন্তু তিনি কি এত নিচে নামবেন?

*কোন কারণটি আসল কারণ জানি না। দ্বিখণ্ডিততে ইসলাম নিয়ে মন্তব্য আছে, কিন্তু ওই নাস্তিক বামেরা কি ইসলাম বিশ্বাসী যে স’হ্য করতে পারেননি? মুসলমানের মনে আঘাত লাগবে বইটি পড়লে- এটি ফালতু কথা। কোনও মুসলমানই মিছিল করেনি, দাবি করেনি বইটি নি’ষিদ্ধ করার জন্য। দ্বিখণ্ডিততে সবচেয়ে বেশি আছে মৌলবাদের বিরুদ্ধে ল’ড়াইয়ের কথা। দ্বিখণ্ডিত সেকুলারিজমের পক্ষে, মানবতার পক্ষে, নারীর সমান অধিকারের পক্ষের একটি বই। এগুলোতে তো বামপন্থীদের বিশ্বাস করার কথা!

*আমি আসলে পশ্চিমবংগের বাম রাজনীতিকদের চেয়ে বাম পন্থায় বেশি বিশ্বাস করি। আমার ভিতরে ভ’ণ্ডামো হিপো’ক্রেসি এসব নেই। এখনও বামের পক্ষে লিখি। যাঁরা বৈষম্যহীন সমতার সমাজের পক্ষে ল’ড়াই করা আমাকে বাংলা থেকে বি’তাড়িত করেছেন তাঁরা সত্যিকার বাম পক্ষের লোক নন। লোক নন বলেই দলে দলে শুনি অনেকে বিজেপিতে ভিড়েছেন। কই, আমি তো আমার আদর্শ থেকে এক চুল সরিনি! আমি কে? সাধারণ একজন মানুষ। অসহায়, নিরীহ। কেউ নেই পাশে আমার মতোই সাধারণ কিছু মানুষ ছাড়া। আমার কাছে কত ছোট হয়ে গেলেন না ওঁরা? মস্ত মস্ত ওঁরা?