প্রচ্ছদ রাজনীতি “খু’নি ফারুক-রশীদের শিষ্য আ’লীগের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী”

“খু’নি ফারুক-রশীদের শিষ্য আ’লীগের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী”

1837

*খু’নি ফারুক-রশীদের সেই শিষ্যরা এখনো বহাল-তবিয়তে। কোথাও কোথাও বেশ দা’পটের সঙ্গে তাদের জীবন কাটছে। কেউ হয়েছেন শাসক দল আওয়ামী লীগের এমপি বা নেতা। কেউ ব্যবসা নিয়ে আছেন ভালোই। মানবাধিকার কর্মী হয়ে সভা-সেমিনারে আলোচক হয়ে বেশ পরিচিত মুখের অধিকারী হয়েছেন। আবার কেউ কেউ বিএনপি-জামায়াত ও জাসদের নেতা হয়ে রাজনীতিতে বেশ সক্রিয়। বিদেশে পাড়ি দিয়ে সেখানেও তারা ফ্রীডম পার্টির হয়ে কাজ করছেন। পার্টির অ’স্ত্রধারীরাও এখন ভো’ল পা’ল্টে ফেলেছেন প্র’ভাবশালী নেতাদের ছ’ত্রচ্ছায়ায়। তারা বিভিন্ন এলাকায় ডিশ, জুট ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। ফ্রীডম পার্টির সামনের সারির নেতা-কর্মীদের বিষয়ে ব্যাপক অনুসন্ধানকালে মিলেছে তাদের জীবনযাপনের নানা তথ্য। ফ্রীডম পার্টির নেতা ছিলেন, সে কথা তাদের অনেকেই স্বীকার করতে চাননি। অনুসন্ধানে জানা যায়, এদের অধিকাংশ এখনো বহাল।

*একসময় রাজশাহীজুড়ে দা’পট ছিল ফ্রীডম পার্টির। রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রাজশাহী-১ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী একসময় ফ্রীডম পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তিনি ফ্রীডম পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। রাজশাহী সদর আসনের এমপি ও ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা জানান, তিনিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সে সময় ফ্রীডম পার্টির যে মিছিলটি বের হয়েছিল, তাতে সামনের সারিতে ছিলেন এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী। তারা সে সময় লা’ঠি নিয়ে ফ্রীডম পার্টির মিছিলকে ধা’ওয়া করেছিলেন। কয়েকবার ফারুক চৌধুরীকে তারা ধা’ওয়া করেছেন বলেও জানান।

*তিনি আরও বলেন, প্রথমে ফ্রীডম পার্টি, এরপর ছাত্রদলের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (রাকসু) ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন ফারুক চৌধুরী। এরপর বিএনপি হয়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে গতকাল বিকাল ৫টা ৫৭ মিনিট থেকে রাত ৮টা ২৯ মিনিট পর্যন্ত পাঁচবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এসএমএস দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।

*রাজশাহীর প্রবীণ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজশাহী জেলা ফ্রীডম পার্টির সভাপতি ছিলেন অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান। ১৯৯১ সালে কুড়াল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে। তিনি মা’রা যাওয়ার পর পরিবারের অনেকেই জড়িয়েছেন আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে। ছেলে ইয়াসিন আরাফাত সৈকত জেলা যুবলীগের বর্তমান যুগ্মসাধারণ সম্পাদক। রাজশাহীর পবা উপজেলার আলীগঞ্জে বাস করেন আহসান। একসময় লিবিয়া ছিলেন। সেখান থেকে ফিরে ফ্রীডম পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

*১৯৯৬ পর্যন্ত রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন। এরপর আহসানকে কমই দেখা যায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন বসবাস করেন আলীগঞ্জে। জেলা ফ্রীডম পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবুল হাসনাত শামসুল হক। রাজশাহী শহরে তিনি সম্রাট হিসেবেই পরিচিত। ১৯৯১ সালে কুড়াল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন রাজশাহী-২ (তৎকালীন পবা-বোয়ালিয়া) আসনে। ২০০৬ সালের ১২ জুন তিনি মা’রা যান। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। নগরীর হড়গ্রামের বাদল, দরগাপাড়ার আলাল ছিলেন ফ্রীডম পার্টির দা’পুটে নেতা। এর মধ্যে আলাল পরে ফ্রীডম পার্টি ছেড়ে শ্রমিক লীগের রাজনীতিতে স’ক্রিয় হন। নির্বাচিত হয়েছিলেন ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। তারা দুজনই মা’রা গেছেন। তবে এখনো আছেন হড়গ্রাম এলাকার আরেক নেতা অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। আইন পেশায় জড়িত আবদুল হামিদ বসেন ২ নম্বর বার ভবনের নিচতলায়।

*রাজধানী ঢাকায় কলাবাগান থানা আওয়ামী লীগের কমিটিতেও রয়েছেন ফ্রীডম পার্টির একজন নেতা। তার নামের আগের ফ্রীডম নামটিও টাইটেল হিসেবে যুক্ত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে তাকে রাখা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪-এর কামাল আহমেদ এখন কানাডায় অবস্থান করছেন। তিনি সেখানে ফ্রীডম পার্টির হয়ে কাজ করছেন। ফরিদপুর-৩-এর মো. এ বি কে হামিদ পাকিস্তান কিংবা ফিলিস্তিনে অবস্থান করছেন, মাদারীপুর-৩-এর মহিউদ্দিন হাওলাদার ঢাকায় ব্যবসা করেন।

*দিনাজপুর-৬ আসনে ফ্রীডম পার্টির প্রার্থী মো. কামরুজ্জামান এখন জাসদ-ইনুর নবাবগঞ্জ উপজেলা সভাপতি। বাগেরহাট ফ্রীডম পার্টির নেতা অছিফুর রহমান জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। এখন তিনি নিষ্ক্রিয়। সাতক্ষীরা-৩ আসনে ফ্রীডম পার্টির প্রার্থী এস এম হায়দার জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।

*জামালপুর-৫ আসনে ফ্রীডম পার্টির প্রার্থী নজরুল ইসলাম এখন জাতীয় পার্টিতে। কুমিল্লা-৬-এর খন্দকার আবদুল মান্নান এলাকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কুষ্টিয়া-১-এর জাহিদুল ইসলাম যুবলীগে যোগদান করেন, এখন নিষ্ক্রিয়।

*১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্টির ডেপুটি জোনাল স্টাফ কো-অর্ডিনেটর পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নাজিরপাড়া গ্রামের আবদাল আদীল আলভী পঞ্চগড়-২ আসনে ফ্রীডম পার্টির প্রার্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনি সিগমা হুদার বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা-মানবাধিকার সংগঠনের মূল কমিটির একজন মেম্বার। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা-মানবাধিকারের জাতীয় কমিটির সদস্য। যোগাযোগ করা হলে গতকাল তিনি বলেন, ‘ওই সময় একটি গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনায় আমি ফ্রীডম পার্টির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। এরপর আর কোনো নির্বাচন করিনি। আমি আগেও রাজনীতি করতাম না। এখনো কোনো রাজনীতি করি না। বর্তমানে মানবাধিকারের জাতীয় কমিটির সদস্য।’

*১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে ফ্রীডম পার্টির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন মোহাম্মদ ছালাউদ্দিন তালুকদার। বর্তমানে তিনি আইন পেশা নিয়ে ব্যস্ত। ঢাকায় থাকেন। তিনি আওয়ামী লীগের একজন নেতার ঘনিষ্ঠজন বলে এলাকায় চাউর রয়েছে। তিনি গতকাল বলেন, ‘আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রীডম পার্টি ছেড়ে দিয়েছি। এরপর আর রাজনীতি করিনি। বর্তমানে পেশা নিয়ে আছি।’

*পঞ্চগড়ে বিভিন্ন দলে যোগ দিয়েছেন ফ্রীডম পার্টির সাবেক নেতা-কর্মীরা। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন আধাসরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক প্রফেসর গাজীম উদ্দিনের নেতৃত্বে ফ্রীডম পার্টি কাজ শুরু করে। ১৯৮৭ থেকে ’৮৮ সালের দিকে আবদুস সাত্তার, বগুড়া শহরের রহমাননগরের জওহর মল্লিক, আলম, সূত্রাপুর এলাকার মতিন সওদাগর, উত্তর চেলোপাড়ার জগলুল, শিববাটির বাবলু ফ্রীডম পার্টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বগুড়া শহরের রহমাননগরের জওহর মল্লিক ১৯৮৯ সালের দিকে সাংবাদিকতা পেশায় আসেন। বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে কুড়াল মার্কা নিয়ে প্রতি’দ্বন্দ্বিতা করেন সৈয়দ মাশুকুরুল আলম চৌধুরী। তিনি এলাকায় আলফ্রেড চৌধুরী নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন যাবৎ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

*পার্টির মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিক মিল্লাতে যশোর প্রতিনিধি ছিলেন আকতারুজ্জামান মানু। তিনি এ জেলায় দলটির সংগঠক হিসেবে কাজ করতেন। আট-নয় বছর আগে হৃদরোগে আ’ক্রান্ত হয়ে মা’রা যান। তৎকালীন ফ্রীডম পার্টিতে দিনাজপুর জেলা সভাপতি ছিলেন ফারুক হোসেন। তিনি মা’রা গেছেন। জেলার সমন্বয়কারী ছিলেন জাকির হোসেন বাবু। ফ্রীডম পার্টির পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর দিনাজপুর পৌর বিএনপির আহ্বায়ক হন। কিছুদিন আগে পদত্যাগ করে বর্তমানে রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছেন। পিরোজপুরের আরেক নেতা অধ্যাপিকা আজরা আলী ছিলেন স্বরূপকাঠি-বানারীপাড়া এলাকার এমপি প্রার্থী। বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক কে. আলীর স্ত্রী আজরা আলী। হিন্দুধর্মাবলম্বী আজরা আলী মুসলামান হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন। পটুয়াখালীতে কুদ্দুসুর রহমান ফ্রীডম পার্টি থেকে পদ’ত্যাগ করে জনতা পার্টিতে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচনও করেছিলেন জাহাজ মার্কায়। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন।

*ফ্রীডম পার্টির নেতা ছিলেন সিলেটের মাওলানা আবদাল চৌধুরী। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করে নানা বি’তর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জ’ড়িত বলে জানা গেছে। মাওলানা আবদাল চৌধুরীর বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গায়। তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর আপন বড় ভাই। গত জাতীয় নির্বাচনে আনোয়ারুজ্জামান সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। বাংলাদেশে যু’দ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত জামায়াত ঘরানার নেতারা ‘সেভ বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠনের জন্ম দেন। এ সংগঠন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষে নানা তৎপরতা চালায়। আবদাল চৌধুরী এ সংগঠনের অন্যতম কর্ণধার বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

*১৯৮৬, ’৮৭ ও ’৮৮ সালে কিশোরগঞ্জের খড়মপট্টি এলাকার রুহুল হোসাইন, শোলাকিয়ার আবদুল গনি, সিদ্ধেশ্বরী বাড়ি এলাকার অ্যাডভোকেট আবদুল মালেকসহ আরও অনেকেই ফ্রীডম পার্টির নামে যা খুশি তাই করতেন। রুহুল হোসাইন বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সহসভাপতি। আর আবদুল গনি কিশোরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্মসাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। নিউটাউন এলাকার অ্যাডভোকেট শাহ শামসুল হুদা বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। সিদ্ধেশ্বরী বাড়ি এলাকার অ্যাডভোকেট আবদুল মালেক বর্তমানে বিএনপিতে। ঝালকাঠিতে ফ্রীডম পার্টির সাবেক জেলা সভাপতি মো. সোহরাফ হোসেন বর্তমানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও জেলা সভাপতি পদে দীর্ঘদিন দায়িত্বে রয়েছেন। সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ বর্তমানে আওয়ামী লীগের কর্মী।