প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “একটি চাকরির জন্য নেতাদের হাতে জীবন দিতে হয়”

“একটি চাকরির জন্য নেতাদের হাতে জীবন দিতে হয়”

তসলিমা নাসরিন

125

*একটি চাকরির জন্য ভারতের উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলার ১৭ বছর বয়সী একটি মেয়ে গিয়েছিল স্থানীয় বিধায়কের কাছে। না, মেয়েটির চাকরি জো’টেনি সেদিন। জু’টেছিল গণধ’র্ষণ। সেদিন ২০১৭ সালের ৪ জুন। উত্তরপ্রদেশের বিধায়ক কুলদীপ সিং সেঙ্গার তার বাড়িতেই তার ভাই অতুল সেঙ্গার এবং তার সা’ঙ্গোপা’ঙ্গসহ মেয়েটিকে ধর্ষ’ণ করেছিল।

*এই ঘটনার পর মেয়েটির আত্মীয়রা স্থানীয় থানায় গিয়েছিল অভি’যোগ করতে। কিন্তু বিধায়কের বি’রুদ্ধে কোনও পুলিশই অভি’যোগ নেয়নি। পুলিশের ঘা’ড়ে ক’টা মা’থা যে ক্ষম’তাসীন রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বি’রুদ্ধে কোনওরকম অভি’যোগ নথিভুক্ত করবে! একটিরও তো চাকরি থাকবে না। আত্মীয়রা বারবার থানায় গিয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। কুলদীপ সিং সেঙ্গার এবং তার সা’ঙ্গোপা’ঙ্গর বি’রুদ্ধে কোনও অভি’যোগ গ্রহণ করতে পুলিশ অ’স্বীকার করে।

*তারপর কী হলো? তারপর মেয়েটি নি’খোঁজ হয়ে গেল। সেদিন ১১ জুন, ২০১৭। মেয়েটির পরিবার থানায় নিখোঁ’জের অভি’যোগ দা’য়ের করে। ২০ জুন তারিখে মেয়েটিকে উ’দ্ধার করা হয় আওরিয়া গ্রাম থেকে। আওরিয়া গ্রামে কী করে গেল মেয়েটি? সেও একটি চাকরির জন্য। একটি চাকরি দেওয়ার আ’শ্বাস দিয়ে শশী সিং নামের এক মহিলা তাকে তার পুত্র শুভম সিংয়ের সংগে কানপুর পাঠায়। কানপুরে তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সত্যিই কি কানপুরে কোনও চাকরি ছিল? না। সবই ছিল ফাঁ’দ। পথের মধ্যে গাড়িতে শুভম সিং আর ড্রাইভার অধেশ তিউয়ারি মেয়েটিকে ধর্ষ’ণ করে। একবার নয়, বহুবার। শুধু তারাই নয়, অপরিচিত অনেক পুরুষ তাকে ধর্ষ’ণ করে। গণধর্ষ’ণের পালা শেষ হলে মেয়েটিকে ৬০ হাজার টাকায় বি’ক্রি করে দেওয়া হয়।

*মেয়েটিকে উ’দ্ধার করার দু’দিন পর আদালতে তোলা হয়। আদালতে ভ’য়-ড’র ছু’ড়ে ফে’লে মেয়েটি সব খুলে বলে। বলে, কুলদীপ সিং সেঙ্গার, তার ভাই অতুল সেঙ্গার আর তার সা’ঙ্গোপা’ঙ্গদের বিরুদ্ধে ধর্ষ’ণের অভিযোগ থানায় নিচ্ছে না। বলে, শুভম সিং, অধেশ তিউয়ারি আর একপা’ল অচেনা লোক তাকে গণধর্ষ’ণ করেছে। বলে, গণধর্ষ’ণের পর শুভম সিং তাকে বি’ক্রি করে দিয়েছে। মেয়েটির ভাষ্য শোনার পর শুভম সিংদের গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু কুলদীপ সিং সেঙ্গারের টি’কিটি কেউ স্প’র্শ করতে পারে না। আদালত মেয়েটিকে তার পরিবারের হাতে ফেরত দেয় ৩ জুলাই। এরপর থেকে বিচারের আশায় মেয়েটির পরিবার প্রশাসনের দরজায় বারবার ধ’র্ণা দেয়। কিন্তু গরিবের কথা শোনার সময় কারোরই নেই। হ’তাশায় ডু’বে থেকেও হা’ল ছা’ড়েননি পরিবারের কেউ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তারা ছু’টে যান কুলদীপ এবং তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে অভি’যোগ দা’য়ের করতে। না, মুখ্যমন্ত্রীর সময় নেই, তিনিও ব্যস্ত।

*এত বড় একটা অন্যায় ঘটে যাওয়ার পর প্রশাসনের কাছ থেকে কোনও ন্যায়বিচারের আশ্বাস না পেয়ে, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে মেয়েটির মা উন্নাওয়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে কুলদীপ এবং তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে মা’মলা দা’য়ের করেন। ৩ এপ্রিল এই মামলার শুনানি শেষে বাড়ি ফেরার পথে মেয়েটির বাবার ওপর হা’মলা চা’লায় কুলদীপ এবং অতুল সেঙ্গার। মেয়েটির বাবার বি’রুদ্ধে মি’থ্যা অভি’যোগ দা’য়ের করে। কুলদীপের নির্দেশে মেয়েটির বাবাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কোথাও কোনও সুবিচার না পেয়ে এবং উল্টো মিথ্যা অভি’যোগে তাদের পরিবারকে ফাঁ’সানোর ঘট’নার প্রতি’বাদে ৮ এপ্রিল, ২০১৮ তারিখে মেয়েটি তার পরিবারের লোকদের সঙ্গে নিয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে প্রতি’বাদ করে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কোনওরকম সমর্থন না পেয়ে সেখানেই মেয়েটি গা’য়ে আ’গুন দিয়ে আত্মহ’ত্যার চেষ্টা করে।

*তার পর দিন তার পিতার মৃ’ত্যু হয় পুলিশি হেফা’জতে। পিতা তো সুস্থই ছিলেন। তাঁর মৃ’ত্যুর কারণ আমাদের অনুমান করতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয় না। ১০ এপ্রিলে ময়না’তদন্ত রিপোর্টে মেয়েটির পিতার শরীরে ১৪টি ক্ষ’তচিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এই ঘটনা প্রচার হওয়ার পর ৬ জন পুলিশকে সাময়িকভাবে বর’খাস্ত করা হয় এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। ১২ এপ্রিল উন্নাওয়ের তদ’ন্তভার সিবিআই-এর ওপর দেওয়ার পর ঠিক পরের দিনই সিবিআই ধর্ষ’ণের অভিযোগে কুলদীপকে গ্রেফতার করে।

*২০১৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে মেয়েটির পরিবারের লোকেরা প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে মোট ৩৬টি চিঠি লিখে পর্যাপ্ত নিরা’পত্তা প্রদানের জন্য আবেদন জানান। কিন্তু তাদের আবেদনে প্রশাসনের কোনও মহল থেকেই কেউ সা’ড়া দেন না। উপায় না দেখে ১২ জুলাই তারা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মহামান্য প্রধান বিচারপতিকে দীর্ঘ ১২ পাতার চিঠি লিখে গোটা ঘট’নার কথা বি’শদে জানান। সেই চিঠিটিও প্রধান বিচারপতির হাতে পৌঁছায় না।

*তারপর? তারপর জুলাই ২৮, ২০১৯ তারিখে মেয়েটি, তার মা, দুই কাকিমা এবং তার আইনজীবীকে নিয়ে গাড়িতে চেপে রায়বেরেলির জে’লে যাচ্ছিল তার জে’লবন্দি কাকার সঙ্গে দেখা করতে। কাকাকে ধ’র্ণার সময় ১৮ বছর পুরনো একটি মা’মলার সূত্র ধরে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এমন সময় রাস্তার উল্টোদিক থেকে ছু’টে আসে নম্বর প্লেটে কালি লাগানো ট্রা’ক। পি’ষে দিয়ে চলে যায় মেয়েটির গাড়ি। সংগে সংগেই মৃ’ত্যু হয় মেয়েটির মা’র ও দুই কাকিমা’র। মেয়েটিকে এবং তার আইনজীবীকে আশ’ঙ্কাজনক অব’স্থায় ভ’র্তি করা হয় লখনউ-এর এক হাসপাতালে।

*মেয়েটি এখনও মৃ’ত্যুর সঙ্গে ল’ড়ে যাচ্ছে দিল্লির এক হাসপাতালে। সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট মেয়েটিকে উত্তরপ্রদেশ থেকে দিল্লি আনিয়ে নিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত নিশ্চয়ই অনুমান করতে পেরেছে, মা আর কাকিমাদের মে’রে ফে’লা হয়েছে, যে কোনও মুহূর্তে মেয়েটিকেও মে’রে ফে’লবে ওরা। ওরা আর কারা? কুলদীপ এবং তার সংগীরা। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চ সাত দিনের মধ্যে এই জ’ঘন্য ঘ’টনার ত’দন্ত সম্পন্ন করে আদালতের কাছে রি’পোর্ট পে’শ করতে সিবিআইকে নি’র্দেশ দিয়েছিল। জানি না কতদূর এগিয়েছে ত’দন্ত।

*কুলদীপ সিংকে বিজেপি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনা জানাজানি না হলে কি কেউ লোকটিকে দল থেকে বে’র করতো? এদেরকে যেমন লোক দেখিয়ে বে’র করে দেওয়া হয়, আবার চুপচাপ ঢু’কিয়েও নেওয়া হয়। কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে মেয়েটির, মেয়েটি অ’জ্ঞান, অ’চেতন। সবই শুধু একটি চাকরির জন্য।

*একটি চাকরি চেয়েছিল মেয়েটি। বিনিময়ে জী’বন দিতে হচ্ছে। মেয়েদের চাকরি পাওয়া কখনই সহজ নয়। মেয়েটি পরিবারসুদ্ধ সবাইকে নিয়ে প্রতি’বাদ করেছিল বলে, কারও ধ’মকে, গ্রেফতারে, নি’র্যাতনে, হু’মকিতে, হা’মলায় চুপ হয়ে যায়নি বলেই জনগণ জানতে পেরেছে কী ঘটেছে। এরকম কত মৃ’ত্যুর কথা আমরা জানতে পারি না। এরকম কত শত অ’ন্যায়ের কথা পত্রিকায় লেখা হয় না। বিশেষ করে ক্ষমতাবান লোকেরা অ’ন্যায় করলে সেই অ’ন্যায়কে ধা’মাচাপা দেওয়ার সবরকম ব্যবস্থা নেয় প্রশাসন। মেয়েটির পরিবারের লোকেরা মেয়েটির পাশে ছিল, এটিও একটি কারণ প্রতি’বাদ, ধ’র্ণা, মা’মলা ইত্যাদি চালিয়ে যাওয়ার। বেশির ভাগ মেয়েদের পাশে পরিবারের লোকেরা থাকে না। মেয়ে অন্যায়ের শি’কার হলে মেয়েকেই দোষ দেয় তারা। মেয়েকে মুখ বু’জে থাকতে হয়, যারা মুখ বু’জে থাকতে পারে না, তারা আত্মহ’ত্যা করে। উন্নাওয়ের এই মেয়েটি চাকরি চাইতে গিয়ে বারবার গণধ’র্ষণের শি’কার হয়েছে। কিন্তু ল’ড়াই থামায়নি। তার বাবাকে মে’রে ফেলা হলো, কাকাকে জে’লে ভ’রা হলো, তারপরও ল’ড়াই থামায়নি মেয়ে। শেষ অবধি তাকেই মে’রে ফে’লার ব্যবস্থা নিল ধ’র্ষকের দল। মৃ’ত্যু অবধি মেয়ে ল’ড়াই করে গেছে। মেয়েটির কাছে মৃ’ত্যু আসছে, কিন্তু একটি চাকরি আসছে না।

*জানি না কতদিন কুলদীপ সিং এবং খুনির দল জেলে থাকবে। মানুষ ওদের কী’র্তিকাহি’নীর কথা একদিন ভুলে যাবে, ওরাও হয়তো তখন চুপচাপ বেরিয়ে পড়বে জেল থেকে। প্রচার মাধ্যম স’রব হয়েছিল বলেই রাজনৈতিক দল থেকে ধ’র্ষকগুরু কুলদীপকে বের করে দেওয়া হয়েছে। প্রচার মাধ্যম চুপ থাকলে কুলদীপ এবং তার সা’ঙ্গোপা’ঙ্গ সেভাবেই থেকে যেত, যেভাবে ছিল। আর মেয়েটি তার পরিবারসহ ওভাবেই অ’ন্যায় আর নি’র্যাতনের শি’কার হয়ে জীবন কা’টাতো। অথবা তাদের সবাইকে মে’রে ফেলা হতো, কেউ জানতোও না। অথবা জানলেই বা কী? কার কী করার ক্ষমতা আছে?

*কী ভ’য়ংকর নি’র্যাতন করা হয়েছে একটি মেয়েকে! একটি চাকরি চেয়েছিল বলে গণধর্ষ’ণ, যৌ’ন পা’চার, হ’ত্যাযজ্ঞ- কিছুই বাদ যায়নি। যদি বেঁচে যায় মেয়েটি, তাহলে কী রকম হবে সেই বেঁচে থাকা। কাছের মানুষগুলোকে তো মে’রেই ফে’লেছে ক্ষমতাসীনরা, চাকরি দেবার মালিকেরা।

*মেয়েরা বাস করে তাদের ধর্ষ’ক আর খু’নির সঙ্গে। চাকরি চাইতে গিয়ে যারা গণধ’র্ষণের বা হ’ত্যার শি’কার হয় না, তারা নিশ্চয়ই ভাগ্যবতী।

লেখক: নির্বাসিত লেখিকা।