প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “হিন্দু বাড়িতে গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন না হলে নিন্দা হতো বাড়ির কর্তার”

“হিন্দু বাড়িতে গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন না হলে নিন্দা হতো বাড়ির কর্তার”

সুষুপ্ত পাঠক

115

*একবন্ধু একবার দুঃখ করে বলেছিলো, বাড়ির ভাড়াটিয়াদের কথা চিন্তা করে একটা গরুর পাশাপাশি খাসি কিনেছিলো কুরবানীর সময়। উদ্দেশ্য তার, হিন্দু ভাড়াটিয়াদের খাসি মাংস দিবেন। বন্ধুটি দুঃখ করে বলল, পরে জেনেছি তারা খাসির মাংসগুলো গোপনে ফেলে দিয়েছিলো।… এতখানি গোড়া থাকলে কি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হবে?

*না, হবে না। ভারতীয় উপমহাদেশে এতগুলো শতাব্দী পাশাপাশি থেকেও হিন্দু মুসলমান কেউ কারোর হলো না- তার দায় কেবল মুসলমানদের, এমনটি দাবী করলে সত্যের বরখেলাপ হবে। কুরবানী-বলীর মত প্রথা উঠিয়ে দেয়া উচিত, কিন্তু যতদিন সেটা থাকছে, তার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়তে সমস্যা কোথায়?

*আমি এমন মুসলমানের কথা জানি, যারা এক সময় গরু কোরবানী দিতেন না কেবলমাত্র হিন্দুদের কথা ভেবে। আবার শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য খাসি দিতেন আলাদা করে। হিন্দুরা খাসির মাংস নিত প্রতিবেশীর সামাজিকতাকে গ্রহণ করে। একই রকমভাবে, পূজার নাড়ু সন্দেস পাঠানো হত মুসলিমদের বাড়িতে। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসে এরকম গল্প থাকার পরও আজ কুরবানী হচ্ছে হিন্দুদের কাছে বুকে ছুরি চালানোর মত বেদনার। অপরদিকে হিন্দুপাড়ায় জ্বালা ধরাতে মন্দিরের বাইরের দেয়াল ঘেষে কিংবা হিন্দু বাড়ির সদর দরজা আটকিয়ে গরু কুরবানী দেয়া চল শুরু হয়েছে। আমরা তাহলে এগিয়ে গেলাম নাকি পিছিয়ে গেলাম? সভ্যতা এগুলো না পিছলো?

*হিন্দুদের পূজার প্রসাদ খাওয়া যাবে না- ইসলামে এই বিধান থাকার পরও বাংলাদেশের মানুষ পূজার প্রসাদ খেয়েছে। খেয়েছে কারণ ধর্মের চাইতে মানবিক সম্পর্ক অনেক বড়। কিন্তু মানবতার উপরে যখন ধর্ম স্থান পায়, সে সমাজে মানবিক সম্পর্কগুলো ভে’ঙ্গে পড়ে। তাই চিরন্তর হিন্দু-মুসলমানের দূরত্বে আজ পাগলা হাওয়া বইছে।

*আমরা কিছুতে অন্যের খাদ্য রুচিকে ঘৃ’ণা করতে পারি না। এটা ভয়াবহ রকমের রেসিজম। মুসলমানদের ‘হালাল শপ’ বড় রকমের ধর্মীয় ঘৃ’ণাবাদ থেকে সৃষ্টি। তেমনি হিন্দুদের মাত্রারিক্ত গরুর মাংস নিয়ে এলার্জি ধর্মীয় ঘৃ’ণা থেকে উৎসারিত। মুসলমানদের শুকোর ঘৃ’ণার মত হিন্দুদের গরুর মাংস নিয়ে ক্রো’ধ আজকের বিশ্বে দুটি ধর্মের মানুষকে ব’র্বর করে রেখেছে। যা আমি খাই না, তা যদি অন্যের খাদ্য হয়, তাহলে তাকে নিন্দা ঘৃ’ণা জানানো যে অসভ্যতা, সেটি যখন কোন সমাজ সম্প্রদায়ের মানুষ ভুলে যায়, তখন সেখানে বর্ব’রতা বৃদ্ধি পায়। এই উপমহাদেশে হিন্দুদের কাছে নি’ষিদ্ধ মাংস ও গরুকে পূজা করার কথা জেনে মুসলিম সুফি দরবেশ ও প্রশাসকরা জো’র করে, ব্লাকমেইল করে গরুর মাংস খাইয়ে জাত মেরে হিন্দুদের মুসলমান করার ইতিহাস অনেক পুরোনো। মুঘল ও সুলতানী যুগে হিন্দুদের গরুর মাংস খাইয়ে জাত মেরে ধর্মান্তরিত করার জন্য ‘শান্তিবাদী’ সুফিদের বেশ সুনাম ছিলো! তবে হিন্দুদের অজ্ঞতা আর কুসংস্কার এই ধর্মান্তরিত হবার পিছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। নইলে হিন্দু ধর্মীয় সোর্স বলছে, গরুর মাংস খেলে হিন্দুত্ব তো যাচ্ছেই না বরং মাংসটি হিন্দুদের খাদ্য তালিকাতেই এক সময় ছিলো।

*‘গোঘ্ন’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে অতিথি বাড়ি আসলে তাকে গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করা। বৌদ্ধযুগের আগে অতিথি বাড়ি এলে তাকে মধু ও গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করা না হলে খুব নি’ন্দা হতো বাড়ির কর্তার। ইতিহাস বলছে ভারতবর্ষের আর্য অনার্য সমাজ গরুর মাংস খেতো। সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে জীব হ’ত্যা তার সাম্রাজ্যে নি’ষিদ্ধ করলে গো-হ’ত্যাও নি’ষিদ্ধ হয়ে যায়। বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক বিস্তারে দিশেহারা ব্রাহ্মণ সমাজ দ্রুত নিজেদের রক্ষা করতে তার সঙ্গে তাল মেলায়। মুনস্মৃতি সম্ভবত সে সময় প্রয়োগ করে গো-হ’ত্যা নিষেধ ব্রাহ্মণ সমাজও প্রচার করে। এ কারণেই বাল্মিকি রামায়নে আমরা রামচন্দ্রকে গরুর মাংস খেতে দেখি। রামায়ন খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে লেখা শুরু হয়। সেখানে দেখা যায় ঋষিরা রাম-লক্ষণ-সীতাকে গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করছে। রামচন্দ্রের খাবারের মধ্যে ছিল তিন প্রকারের মদ যেমন গুড় থেকে তৈরি গৌড়ী, পিঠা থেকে তৈরি পৌষ্টি আর মধু থেকে তৈরি মাধ্বী। সঙ্গে প্রিয় গরুর মাংস!(সূত্র: বাল্মিকি রামায়নে রাম আদিবাসী রামায়নে রাম, লেখক: বিপ্লব মাঝি/ রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য।

*ভারত-বাংলাদেশের মুসলিমদের ভাবসাব দেখলে মনে হতেই পারে গরুর মাংস খাওয়া তাদের জন্য হিন্দুদের মতই গোমাতার প্রতি সন্মান জানানোর মত ধর্মীয় নির্দেশনা রয়েছে। হযরত মুহাম্মদ জীবনে গরুর মাংস খেয়েছেন বলে জানা যায় না। আরবের মরুভূমির তাপমাত্রা গরুর বেঁচে থাকার জন্য অনুপযোগী। হাদিস থেকে জানা যায় মুহাম্মদ বকরির রানের মাংস পছন্দ করতেন। সেক্ষেত্রে মুসলমানদের কাছে বকরির মাংস সুন্নত হতে পারে। এককালে বাংলাদেশে কুরবাণীর ঈদকে ‘বকরির ঈদ’ নামে ডাকা হতো।

*হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে বা পাড়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে গরুকে কুরবাণী দেয়ার মধ্যে মুসলমানদের ঐতিহাসিক ধর্মীয় বিদ্বে’ষের ইতিহাস আছে। সুফিদের দরগা থেকে গরু জ’বাই করে তার রক্ত মন্দিরে ছিটিয়ে দেয়া, গরু খেয়ে তার হাড়গোড় হিন্দুদের বাড়িতে নিক্ষেপ ছিল মুসলিম শাসনের শুরুর দিকে ঘটনা। ভারতে এসে মুসলমানরা দেখতে পেয়েছিল হিন্দুরা গরুর মত একটা চতুষ্পদ জন্তুকে দেবতার মত পূজা করে। সেই জন্তুকে মুসলমানরা খেয়ে ফেলে তাদের ধর্মের উপর নিজেদের ধর্মীয় আধিপত্যতা দেখানোই এখানে উদ্দেশ্য ছিলো।

*মানুষে মানুষে যে উৎসব ঘৃ’ণা আর দূরত্ব হতে দেয়- তা কিছুতে মহৎ বা সর্বজননী হতে পারে না। ধর্মীয় উৎসবগুলোকে তাই আমাদের যথাসম্ভব অনাড়ম্বর করা উচিত। সম্ভব হলে পুরোপুরি ত্যাগ করা উচিত।