প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “কতজন মুসলমান পালিয়েছে ভারত ছেড়ে?”

“কতজন মুসলমান পালিয়েছে ভারত ছেড়ে?”

সুষুপ্ত পাঠক

71

*বছর দুই-তিন আগে দেশের ভেতর আমার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য যখন কয়েকজন সাংবাদিক ও এক্টিভিস্ট কথা বলছিলেন, তখন বেশ মজার একটি ব্যাপার ঘটল। যেমন অমুক ব্যক্তি প্রগতিশীল সাংবাদিক, একটি বিদেশী নিউজ পোর্টালের বাংলাদেশ বিভাগের চিফ, তিনি আমাকে নিরাপত্তা দিবেন এবং তার পোর্টালে মাসে চারটি লেখা দিলে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তাতে আমার তখনকার আর্থিক দুর্বস্থাও দূর হবে।

*কারণ ততদিনে আ’ততায়ীদের ভ’য়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। রেগুলার রুটিন যাতায়াত ছিলো ব্লগারদের জন্য মরণফাঁ’দ। এই রুটিনকে রেকি করেই জ’ঙ্গিদের স্লি’পার সে’ল হা’মলার ছক কষত। যাই হোক, আমার সুহৃদরা আমার জন্য চেষ্টা করছেন। আমি কিছু বলি না। তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু শেষতক বাতিল করে দেন নিজেরাই! তারা নিজেরাই মত দেন, প্রগতিশীল ঠিক আছে, কিন্তু নাস্তিক তো নন, একজন ইসলামের ক’ঠোর সমালোচনাকারী ব্লগারকে জানার পর যদি তিনি ভেতরে ভেতরে… মানে পরিচয় ফাঁ’স করে দেয়? ঘটনাগুলোকে মজার বলছি কারণ, এরকম যতজন ব্যক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছিলো তারা সকলেই আরবী নামের প্রগতিশীল ছিলেন! এরমধ্যে একজন নাস্তিক বলেও জানা গিয়েছিলো, কিন্তু পরে জানা গেলো, তিনি নাস্তিক হলেও মুসলিম ব্রাদারহুডে বিশ্বাসী- মানে প্যান ইসলামিজমে, অর্থ্যাৎ সহজ ভাষায় মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী।

*জীবনে কতবার ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ কথাটা নিজের জন্য শুনেছি তার কোন হিসেব নেই। অথচ বাস্তবতা দেখেন, লোকটি প্রগতিশীল, তবু মুসলিম বলে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না! এরকম অভিজ্ঞতা আমার কাছে বিস্ময়কর ছিলো না। ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ এমন একটি অবস্থান- যার জন্য আপনাকে ইসলাম বিশ্বাসী মুমিন হতে হবে না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন নাস্তিক। জীবনে পশ্চিম দিকে নামাজ পড়তে দাঁড়াননি। কিন্তু তিনি এদেশের মুসলিম জাতীয়তাবাদের জাতির পিতা!

*অপরদিকে নেহরুও পাড় নাস্তিক ছিলেন। তিনি করলেন সেক্যুলার ভারত আর হিন্দুদের ধর্মীয় শিক্ষা টোল উঠিয়ে দিলেন…। নেহরুর বন্ধু মৌলনা আবুল কালাম আজাদ কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন, তিনি কেন মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা বাতিল করার সুপারিশ না করে সেটা ধর্মীয় নেতাদের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন! -এখানেই তফাতটা। বাংলাদেশকে আফগানিস্থান-পাকিস্তানের কাছাকাছি যারা নিয়ে এসেছে, তারা কেউ মোল্লা মৌলবী নয়। মুসলিম ব্রাদারহুডে বিশ্বাসী আমাদের সব মহান নেতানেত্রীরা এই কর্মটিকে সফল করে তুলেছেন।

*রঙ্গিলা রসূল বইয়ের প্রকাশককে খু’ন করা জ’ঙ্গির হয়ে আইনী লড়াই করতে লাহোর ছুটে গিয়েছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক বিনা পারিশ্রমিকে। অপরদিকে কোলকাতার প্রকাশক ভোলানাথ সেনের খু’নি মুমিনের জন্য ফ্রি আইনী লড়াই করতে এসেছিলেন সোহরওয়ার্দী স্বয়ং। এগুলো ঘটেছিলো মুসলিম ব্রাদারহুডে বিশ্বাসের কারণে। আমরা অনেক সময় মনে করি আহমদ শফি বা চরমোনাই পীরদের জন্মের ফ্যাক্টরি বন্ধ করতে পারলেই বুঝি মুক্তি, এটা একদম বাজে ধারণা। মোল্লা মুফতিরা নয়, মুসলিম ব্রাদারহুডে বিশ্বাসী সুটেড বুটেড লোকগুলোই অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলার সমাজ রাষ্ট্রের শত্রু। এদের চেনাও বেশ কঠিন। বাংলাদেশে প্রগতিশীর বলে স্বীকৃত বুদ্ধিজীবীদের ৮০ ভাগই মুসলিম ব্রাদারহুড বা প্যান ইসলামিজমে বিশ্বাস করেন- সেটা তাদের লেখায়-চিন্তায়-ধারণায় প্রকাশ হয়ে পড়ে।

*পাকিস্তানের মালালার কথাই চিন্তা করুন। তালেবানদের সঙ্গে লড়াই করল মেয়েটা। তালেবানরা মেয়েদের স্কুলে পড়তে দিবে না। সে জোর করে পড়তে গেলো। এর মানে হচ্ছে ফান্ডামেন্টালিস্ট মুসলিমদের সঙ্গে মালালার লড়াই এখানে প্রগতির পক্ষে। মুসলিম নারীদের এগিয়ে যাবার লড়াই। কিন্তু মালালা বার বার নিজের মুসলিম ব্রাদারহুডের পরিচয় দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মির নিয়ে তার উ’দ্বিগ্নতা প্রকাশ ও ব্যথিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, কেন সে কোনদিন বেলুচদের পক্ষে একটি কথাও বলেনি? কেন সে নিজ দেশ পাকিস্তানে হিন্দু ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের পক্ষে একটি শব্দ উচ্চারণ করেনি?

*আমাদের প্রগতিশীল ব্রাদারহুডদেরও কিন্তু একই অবস্থা। ফিলিস্তিনের উপর অবৈধ বসতি নিয়ে তারা লাল নিশান নিয়ে প্রেসক্লাবে মানববন্ধন করেন কিন্তু পাহাড়ে সেটেলার ও সে’নাশাসন নিয়ে কোন কথা বলেন না। দেশের ভেতর হিন্দু নি’র্যাতনকে নানা রকম তত্ত্ব দিয়ে লঘু করে ফেলেন। কিন্তু কাশ্মির, রোহিঙ্গা, ফিলিস্তিন বিষয়ে কেঁদে বুক ভাসান। এমনকি আমাদের ব্লগারদের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন ইসলামিক গোষ্ঠিদের ভয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে, যেখানে তারা প্রকাশ্যে মিশতেন, ঘুরতেন, তাদের কেউ কেউ ক্রিকেটে ভারতকে বাংলাদেশ হারাতে পারলে ‘দাদাবাবুদের ধুতি খুলে ফেলার’ আনন্দ লাভ করেন!

*‘ধুতি’ ‘দাদাবাবু’ নিয়ে এলার্জী কাদের থাকে বলে মনে করেন? গোরক্ষকদের ঝামেলা, উত্তর ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের আ’স্ফলন নেই কেউ অস্বীকার করছে না। কিন্তু ভারতে বাংলাভাষী এক্টিভিস্টদের কতজন এই মোদি জমানায় নিজেদের বাঁচাতে বাংলাদেশে আ’শ্রয় নিয়েছে? ভারতে মুসলিমদের জীবন নিয়ে যত গল্প শুনি, ধরে ধরে সবাইকে জয় শ্রীরাম বলাচ্ছে বা না বললে পি’টিয়ে মে’রে ফেলছে- কতজন মুসলমান পা’লিয়েছে ভারত ছেড়ে? বার্মা যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর সেনাবাহিনী লে’লিয়ে দিয়েছে সেটা তাদের দেশছাড়ার ঢল দেখেই প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশে প্রগতিশীল সেক্যুলারিজমের পক্ষে কথা বলা যে বিপদের, ইসলামিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বললে যে জান চলে যায়- তা ব্লগারদের আত্মত্যা’গ থেকেই তো প্রমাণিত হয়। তবু একচোখা হয়ে বিশ্লেষণ বা একই বাটখারা দিয়ে মাপজোক করার চেষ্টা থেকে স’ন্দেহ চলে আসে। আর সেক্ষেত্রে মানুষটি যদি আরবী নামের কেউ হয়ে থাকে. তাহলে ভ্রু কুচকে গিয়ে থাকলে দোষ দেবার কি আছে?