প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত কাশ্মীরের মালিকানা ভারতের ৪৩, পাকিস্তানের ৩৭ ও চীনের ২০ শতাংশ

কাশ্মীরের মালিকানা ভারতের ৪৩, পাকিস্তানের ৩৭ ও চীনের ২০ শতাংশ

আবু এম ইউসুফ

150
কাশ্মীরের মালিকানা ভারতের ৪৩, পাকিস্তানের ৩৭ ও চীনের ২০ শতাংশ

*কাশ্মীর অথবা রাখাইন, এসব সমস্যার জন্য ঔপনিবেশিক শাসক বৃটিশ’কে দায়ী করাই যায়। কিন্তু, এসব সমস্যা উদ্ভব হওয়ার পেছনে এই অঞ্চলের জনমানুষের কী কোন দায়-দায়িত্ব নাই। ৭০ বছরে কী আমরা এই অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ- খ্রীষ্টান এসব জাত-পাত-বর্ণ, ধর্মের দেয়ালগুলো অপসারণ করে দিয়ে মানবিক হতে পেরেছি? পারি নাই।

*১৯৩৫ সনে ভারত শাসন আইন করার সময় যখন বার্মা ও ইন্ডিয়া ভাগ হয় তখন রাখাইন প্রদেশ বার্মার অন্তর্ভূক্ত করা হয় যেখানে ৪৫% রোহিঙ্গা মুসলমান বসবাস করতো। আর ১৯৪৭ সনে ইংরেজ শাসিত ইন্ডিয়ার প্রদেশগুলোতে নির্বাচন করে হিন্দু-মুসলমান এই বিভেদের ভিত্তিতে বাঙলা ও পাঞ্জাব বিভক্ত হয়েছে, যে বিভক্তির ফাটল ধরে কত র’ক্ত ঝরেছে তার কী কোন হিসাব শাসকশ্রেণি করেছে?

*কিন্তু তার থেকে বেশী র’ক্ত ঝরেছে ভারত বিভাজনের সময় কাশ্মীর ও সিকিমসহ যে ৬৮০টি করদ বা দেশীয় রাজ্য ছিল।
ইতিহাস অত্যন্ত করুণ আচরণ করেছে এসব করদ রাজ্যের জনগনের সাথে।তাদের ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অবশ্য চাইলে তারা স্বাধীন হিসেবেও থাকতে পারবে। বেশিরভাগ মুসলমান রাজ্য পাকিস্তানে ও হিন্দু রাজ্যগুলো ভারতে যোগ দেয়।

*বেলুচিস্তানের কালাত করদ রাজ্য ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে তাকে পাকিস্তানে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
হিন্দুপ্রধান হায়দরাবাদ দেশীয় রাজ্যের মুসলমান নিজামও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কিন্তু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ভারত তা দখল করে নেয়।

*গুজরাটের দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল জুনাগড় করদ রাজ্য। রাজ্যের শাসক নওয়াব মহবত খান ১৫ আগস্ট পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে ভারত আপত্তি জানায়। কারণ জুনাগড়ের ৮০ শতাংশ লোক হিন্দু এবং এই রাজ্যের সীমানা পাকিস্তানের সঙ্গে লাগোয়া ছিল না। পাকিস্তান একে ভারতে পাকিস্তানের একটি ছিটমহল হিসেবে গণ্য করতে বলল। কিন্তু ভারত তা গ্রাহ্য না করে জুনাগড়ে সৈন্য পাঠায়। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর নওয়াব পালিয়ে পাকিস্তানে চলে যান এবং ৭ নভেম্বর নওয়াবের দেওয়ান স্যার শাহনওয়াজ ভুট্টো ভারতের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। শাহনওয়াজ ভুট্টোর ছেলে জুলফিকার আলি ভুট্টো ও নাতনি বেনজির ভুট্টো পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ভারত শাহনওয়াজ ভুট্টোর আহ্বানে ৯ নভেম্বর (১৯৪৭) জুনাগড় দখল করে নেয়।

*ঠিক ওই সময়েই জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এই রাজ্যের অধিকাংশ লোক ছিল মুসলমান আর রাজা হিন্দু। ভাগাভাগির সময় কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তানে যোগ না দিয়ে স্বাধীন হিসেবে থাকার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু কোনো কোনো ইতিহাসবিদ বলেছেন, মহারাজা নাকি ভারতে যোগদানের জন্য নয়াদিল্লির সঙ্গে গোপনে শলাপরার্শ করছিলেন। তখন পুঞ্চ এলাকায় মুসলমানরা বিদ্রোহের পথ বেছে নিলে রাজা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও গণহ’ত্যা শুরু করলেন, তাদেরকে তাড়িয়ে দিতে লাগলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল অধিক হারে মুসলমান চলে গেলে অচিরেই কাশ্মীর হিন্দুপ্রধান হয়ে যাবে। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত বিভক্তির দুই মাস পর অক্টোবরে পাকিস্তানি মদদে উপজাতীয়রা কাশ্মীর আক্রমণ করে। ২৫ অক্টোবর তারা বড়মুলা দখল করে। সেখান থেকে গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের দূরত্ব মাত্র ৩৫ কিলোমিটার। কিন্তু তারা রাজধানী ও তার অরক্ষিত বিমান ঘাঁটি কব্জায় আনার কোনো চিন্তা না করে সেখানেই দু’দিন কাটিয়ে দেয়।

*চার্লস শেভনিক্স ট্রেঞ্চের মতে, তারা লু’টতরাজ, হ’ত্যা ও নারী ধ’র্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, লোভ-লা’লসার জন্য তারা কিছুই করতে পারেনি (দ্য ফ্রন্টিয়ার স্কাউটস)। কাশ্মীরের নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত দুর্বল ছিল এবং পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো তেমন কোনো অ’স্ত্রশস্ত্রই তাদের ছিল না। মনোবলও দৃঢ় ছিল না। মহারাজা ভাবলেন, পাকিস্তানিরা যদি কাশ্মীর দ’খল করে নেয়, তাহলে তাকে পাকিস্তানে যোগ দিতে হবে। তখন তিনি ভারতের দিকে তাকালেন। অনুরোধ করলেন কাশ্মীর রক্ষার জন্য সৈ’ন্য পাঠাতে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাৎক্ষণিক সৈন্য পাঠাতে রাজি ছিলেন; কিন্তু বিচক্ষণ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটন রাজা হরি সিংকে সৈন্য পাঠানোর আগে ভারতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। ২৬ অক্টোবর হরি সিং ভারতে সংযুক্তকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। দু’দিন পর যখন উপজাতীয়রা শ্রীনগরের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন কাশ্মীরে ভারতীয় সৈ’ন্য পৌঁছে গেছে।

*এখন কাশ্মীরের আর একক মালিক নেই, মালিকানা চলে গেছে তিন দেশের হাতে। ভারতের দ’খলে আছে ৪৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ৩৭ শতাংশ এবং চীনের ২০ শতাংশ। কাশ্মীরে ভারত ও পাকিস্তান যু’দ্ধ করেছে তিনবার-১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে। তিনবারের র’ক্তক্ষয়ী যু’দ্ধে উভয় পক্ষের ৪৭ হাজার লোক মা’রা গেছে।
সুতরাং যাই ঘটছে কি-না, সব কিছুই প্রমাণ করে যে আমরা মনে মনে এখনো হয় হিন্দু, নয় মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, দলিত, অথবা অন্যকিছু- কিন্তু কোনভাবেই মানুষ নয়।