প্রচ্ছদ স্পটলাইট “স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে তোলপাড়”

“স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে তোলপাড়”

17
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে তোলপাড়

*স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মালয়েশিয়া সফর নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে দেশময়। তার বিদেশ যাওয়া নিয়ে গতকালও বিভিন্ন মহলে তুমুল আলোচনা চলে। তীব্র সমালোচনার মুখে বুধবার রাত ১২টার পর মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে তার ফেরার কথা। তবে তিনি দেশে ফিরলেও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন- হঠাৎ করে তার এই মালয়েশিয়া সফর কেন? দেশজুড়ে যখন ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, রোজ নতুন নতুন ডেঙ্গু রোগীর ভিড়ে হাসপাতালগুলোতে যখন ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই অবস্থা, ঠিক তখন তিনি বিদেশ গেলেন। তাই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে। কেউ কেউ তো প্রশ্ন তুলেছেন তার মন্ত্রিত্ব নিয়েও।

*এদিকে এ সময়ে কেন মন্ত্রী বিদেশ সফরে গেছেন- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় মন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কমিটির সভাপতি আলী আশরাফ ও সদস্য মঈন উদ্দীন খান বাদল। জানা গেছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত ২৮ জুলাই সপরিবারে মালয়েশিয়া যান। তার সফর সম্পর্কে তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কিছুই জানতেন না। গত ২৫ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. মিলন অডিটোরিয়ামে ‘বর্তমান সামগ্রিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও গৃহীত কার্যক্রম’ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। সেখানে মন্ত্রী বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের যেভাবে বংশবিস্তার হচ্ছে ঠিক একইভাবে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। এ নিয়ে তিনি উদ্বেগও প্রকাশ করেন। তার এ বক্তব্য বিভিন্ন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। সংবাদ সম্মেলনের তিন দিনের মাথায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হঠাৎ সপরিবারে মালয়েশিয়া চলে যান। অমনি শুরু হয় নাগরিক সমাজের তীর্যক মন্তব্য বর্ষণ যা এখনো চলছে।

*সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারের কারণে প্রতিদিনই রাজধানী ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা। অনেকে যাচ্ছেন ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে। গত কয়েক দিনে সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা শহরের সরকারি হাসপাতালগুলোতেও রোগীদের ভিড় বাড়ছে। এ মুহূর্তে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি ও কঠোর পর্যবেক্ষণ যখন অপরিহার্য ঠিক তখন তিনি অনেকটা কাউকে না জানিয়েই বিদেশ গেলেন। এর প্রভাবে ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থা হয়ে পড়ে হ-য-ব-র-ল। সম্ভবত সে কারণেই ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত এক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়।

*এদিকে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীরা ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব হাসপাতালে শুরু থেকেই নানা পরীক্ষার নামে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হচ্ছে রোগীদের কাছ থেকে। সরকার ফি নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়তি টাকা আদায় করা হচ্ছে। এসব বিষয়ও মনিটরিং হচ্ছে না। মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সবকিছুতেই সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। মন্ত্রীর অনুপস্থিতি সমালোচনার যে ঝড় তৈরি করেছে তা থেকে বাদ যায়নি সরকারও।

*অথচ গত মঙ্গলবার এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, ডেঙ্গুর কারণে যে ভোগান্তি দেখা দিয়েছে তা নিরসনে ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম তদারক করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার নিজ দফতরে ডেঙ্গু সংক্রান্ত ‘মিনিস্টার মনিটরিং সেল’ করেছেন। এই সেল ডেঙ্গু রোগ পরীক্ষার ফি-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনার কোনো ধরনের লঙ্ঘন হলে অভিযোগ গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। ‘মিনিস্টার মনিটরিং সেল’ হলো, খোদ মিনিস্টারই গরহাজির।

*উদ্বেগজনক ডেঙ্গু পরিস্থিতির মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিদেশ সফর কতটা যুক্তিযুক্ত- জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, এ সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেশের বাইরে যাওয়া ঠিক হয়নি। তার উচিত ছিল এখানে থেকে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া।

*তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রাকৃতিকভাবেই এসেছে। এটি কেউ নিয়ে আসেনি। আর এটা মোকাবিলা শুধু সিটি করপোরেশনের বিষয় নয়, এখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের হাসপাতালগুলো তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এগুলো মনিটরিংয়ের কাজও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। এ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি উপস্থিত থেকে সমন্বিতভাবে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করা জরুরি।

*বিএফইউজের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক নেতা মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, এ রকম একটা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিদেশ যাওয়া ঠিক হয়নি। তিনি হয়তো জরুরি কোনো প্রয়োজনেই গেছেন। হয়তোবা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও গেছেন। বিষয়টি যদি তার দফতর বা মন্ত্রণালয়ের লোকজনের জানা থাকত তাহলে হয়তো এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো না। তিনি দেশে থাকলেও হয়তো ডেঙ্গু মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না। তবে এমন একটা স্পর্শকাতর সময়ে তার বিদেশ যাওয়াটাকে মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। মানুষ আশা করে দায়িত্বশীল পদে যারা আছেন তারা জরুরি সময়ে মানুষের পাশেই থাকবেন।

*এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী বলেন, দেশের এ পরিস্থিতিতে তার (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) বিদেশ যাওয়া কোনোভাবেই সঠিক মনে করি না। তিনি উপস্থিত থেকে পুরো পরিস্থিতি মনিটরিং করলে, তার তত্ত্বাবধানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিলে ভালো হতো।