প্রচ্ছদ স্বাস্থ্য “সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু”

“সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু”

27
সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু

ঢাকায় ভয়াবহ আকার ধারণ করা ডেঙ্গু এখন ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। গতকাল ঢাকায় মারা গেছেন এক নারী চিকিৎসক। রাজশাহীতে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন এক পুলিশ সদস্য। রাত সাড়ে ৯টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা গেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী। রাজধানীর বড় বড় হাসপাতালে স্থান সংকুলান হচ্ছে না রোগীদের। নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলোর বাইরে অন্য বেডগুলোও ভরে যাচ্ছে ডেঙ্গুরোগীতে। চাপ বেড়েছে ব্লাড ব্যাংকগুলোতে। রক্ত চেয়ে একের পর এক পোস্ট আসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

পরিস্থিতি উত্তরণে বিশেষ মোনাজাত হয়েছে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে। সব মিলিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে ডেঙ্গু রোগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ গতকাল বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তবে একে এখনো মহামারী বলা যাবে না। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ডেঙ্গুর প্রকোপ থামানো যাচ্ছে না। তবে মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে জ্বর হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। আর মশার কামড় থেকে বাঁচতে দিনের বেলাও প্রয়োজনে মশারি লাগাতে এবং ফুল হাতার কাপড় পরিধানের পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ফিরোজ কবির নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্কয়ার হাসপাতালে মারা গেছেন। তিনি ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও। ফিরোজ কবির বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন। হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মফিজুর রহমান তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছন। ফিরোজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তরিকুল ইসলাম জানান, ফিরোজ এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। গতকাল তাকে স্থানান্তর করা হয় স্কয়ার হাসপাতালে। এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় ধানমন্ডিতে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় চিকিৎসক তানিয়া সুলতানার (২৮)। তানিয়ার স্বামী আমিনুল বাহার হিমন জানান, ২২ জুলাই থেকে তানিয়া জ্বরে ভুগছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। ২৪ জুলাই মগবাজার কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এরপর তানিয়াকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল রাত ১০টায় তার মৃত্যু হয়। তানিয়া সুলতানা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের ৪৭তম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনারারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তানিয়া-হিমন দম্পতির তিন বছরের পুত্র সন্তান আছে।

এ নিয়ে ডেঙ্গুতে মোট তিন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৩৪-এ, যদিও সরকারিভাবে আটজনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে প্রতি মিনিটে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তিনজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে সাড়ে ৯ হাজার রোগী ডেঙ্গুতে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের হিসাব অনুসারে, গতকাল ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৯০ জন ডেঙ্গু রোগী। আক্রান্ত হচ্ছে বয়স্ক-শিশুও। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বগুড়া ও রাজশাহীতেও। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, জায়গা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝে, বারান্দাতেও রোগীরা বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীর ঢল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর ছড়াছড়ি। শুধু ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৫০০ রোগী। আর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২০০। তবে বড়দের চেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশু রোগীর সংখ্যা বেশি।

আগামী শীত মৌসুম পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের রোগীর স্বজনরা ছুটছেন রোগীর রক্ত সংগ্রহের জন্য। চাপ বাড়ছে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা সংস্থা ও ব্লাড ব্যাংকগুলোর ওপর। রক্তদাতা সংস্থা কোয়ান্টাম রক্তদান কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ জন ডেঙ্গু রোগীর রক্তের জোগান দিতে হচ্ছে। আর এত মানুষের রক্তের জোগান দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। রাজধানীসহ সারা দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় ওয়ান স্টপ সেন্টার চালুর কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক চিকিৎসক আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, এ সেন্টার থেকে ডেঙ্গু রোগীদের প্রাথমিক সেবা প্রদান, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জটিল রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এ ছাড়াও দেশের সব সরকারি হাসপাতালে রোগীদের বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। রোগীরা কোনো ধরনের ইউজার ফি ছাড়াই বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ পাবেন। তবে কোন ধরনের রোগীকে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হবে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসক। এক্ষেত্রে রোগী বা তার পরিবার চাইলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করার সুযোগ পাবেন না।

উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা: রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শরীরের উন্মুক্ত অংশ ঢেকে এবং মশা প্রতিরোধী তরল পদার্থ মেখে সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন অভিভাবকরা। কিছু অভিভাবক সন্তানদের কয়েক দিন স্কুলে পাঠাবেন না বলেও ভাবছেন। রামপুরার ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, যেভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে তাতে মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে খুব আতঙ্কে থাকি। যদিও ওর মা স্কুলে যাওয়ার সময় গায়ে ওডোমস মেখে দেয় তারপরও ভয়ে থাকি। ভাবছি এক সপ্তাহ স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলে ছুটি নেব। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান জানান, মশা নিধনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, মশা নিধনে প্রতিটি বিদ্যালয় পরিচ্ছন্ন রাখতে শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে মশা নিধনের কাজ সিটি করপোরেশনের।

রাজশাহীতে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে ২৬: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বুধবার পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা ১০ জন থাকলেও শুক্রবার বৃদ্ধি পেয়ে ২৬ জন হয়েছে। তাদের মধ্যে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন এক পুলিশ কনস্টেবল। তার নাম আতিক হাসান (২৫)। আতিকের বাড়ি জয়পুরহাট জেলার তিলেবপুর ইউনিয়নের কয়াসসোবলা গ্রামে। বুধবার দুপুর ১২টা থেকে তাকে রামেকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, আতিক বগুড়া পুলিশ লাইনে কনস্টেবল পদে কর্মরত আছেন। তবে দুই মাসের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণে পাবনায় কর্মরত আছেন।

বগুড়ায় ২৮ রোগী ভর্তি: বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ২৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন। গত তিন-চার দিনে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু রোগী ভর্তি হন। এদের মধ্যে ১৬ জনের শরীরে ডেঙ্গুর জীবাণু মিলেছে। তারা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন।

শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ১২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। মোট ২৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। তিনি ঢাকায় আক্রান্ত হয়ে বগুড়ায় এসেছেন। আক্রান্ত রোগীদের মশারি দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় রাখা হয়েছে। যাতে অন্য রোগীরা আক্রান্ত না হয়।