প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত আহমদ শফী বনাম প্রিয়া সাহা, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী বনাম ভারতের বুদ্ধিজীবী

আহমদ শফী বনাম প্রিয়া সাহা, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী বনাম ভারতের বুদ্ধিজীবী

সুষুপ্ত পাঠক

202
আহমদ শফী বনাম প্রিয়া সাহা, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী বনাম ভারতের বুদ্ধিজীবী

আল্লামা আহমদ শফী স্পষ্ট করে বলেছেন, হিন্দুরা হচ্ছে চোর! …অতি শীঘ্রই ভারতের বিরুদ্ধে মুসলমানরা যুদ্ধ করবে এবং সেখানে মুসলমানরা বিজয়ী হবে কারণ এটা হাদিসে বলা আছে।
আহমদ শফী বছর খানেক আগে ভারতে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলো। ভারতের হিন্দু ডাক্তার নার্সাদের সেবায় সুস্থ হয়ে ফিরেছিলো। জিহাদের ময়দানে পরাজিত কাফেরদের নারী ও সম্পত্তি হচ্ছে মুসলমানদের জন্য আল্লার তরফ থেকে গণিমতের মাল যা খাওয়া হালাল। ইসলামে বিবাহ বহির্ভূত সেক্স হারাম হলেও কাফের যুদ্ধবন্দি নারীকে দাসী বানিয়ে অবাধে সেক্স করা হালাল। এর মানে হচ্ছে, শফীর মুখে ঔষধ তুলে দেয়া হিন্দু নার্সাটি জিহাদের ময়দানে যৌনদাসী হিসেবে মুসলমানদের ভাগে পড়বে। হাটহাজারীর শফীর কোন ছাত্রই গণিমত হিসেবে তাকে গ্রহণ করবে। শফী জানে ভারত কিংবা যে কোন প্রান্তে ইসলামিক জিহাদে জিতলে সেখানকার কাফেরদের নারীরা হবে মুসলমানদের সম্পত্তি। সেখানকার সক্ষম পুরুষদের গর্দান কাটতে হবে। শিশুদের দাস বানিয়ে বিক্রি করে দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা ছিলো ১৪০০ বছর আগে নবী ও তার সাহাবীদের তরিকা। তাত্ত্বিকভাবে এটাই ভারত দখলের ইসলামিক ফয়সালা।

এটি কষ্ট কল্পনা বা হাস্যকর অবাস্তব অসার চিন্তা কিনা তার চাইতে বড় কথা- এরকম কথা ভারতের ২০ কোটি মুসলমানকে নিজ দেশে বর্হিশত্রু আর বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অন্যরা বিশ্বাস করতে শুরু করবে। বুখারীর এই হাদিস সম্পর্কে বিশ্বাসী যে কোন মুসলমান ভারত দখলের পক্ষে থাকবে। ভারতে ইসলামিক আঘাত আসলে তার ভূমিকা কি হবে, সেটা চিন্তা করে একজন ভারতীয় হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন তাকে কি ভাববে সেটাই বড় চিন্তা।

বুখারীর এই হাদিস যে কোন মুসলমানকে নিজ দেশে মির জাফরের মত গাদ্দারে পরিণত করে তুলবে। কাজেই এই হাদিস যিনি প্রকাশ্যে বর্ণনা করে ভারত দখলের খোয়াব ছড়িয়ে দিচ্ছে তাকেই প্রথম ভারতে নিষিদ্ধ করা উচিত। প্রিয়া সাহার বক্তব্য যদি বাংলাদেশকে বর্হিবিশ্বে হেয় করা হয়েছে বলে মনে করে থাকেন, তাহলে আপনারা আহমদ শফীর বক্তব্যের পর চুপ করে আছেন কেন? একটা সম্প্রদায়কে ‘চোর’ বলার পর দেশের বুদ্ধিজীবীরা নিরব কেন? প্রতিবেশী দেশের প্রতি উশকানিমূলক কথা বলার পরও দেশের সুশীলরা গর্তে লুকিয়েছেন কেন?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদীকে ৪৯ জন ভারতীয় বুদ্ধিজীবী চিঠি লিখে পাঠিয়েছেন সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির অবণতির কথা জানিয়ে। তারা ‘জয় শ্রীরাম’ ধর্মীয় শ্লোগানটি সন্ত্রাসের হুংকার হিসেবে কেন ব্যবহার করা হচ্ছে জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। ৪৯ জন বুদ্ধিজীবীর মধ্যে চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগাল, আদুর গোপালকৃষ্ণন, গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন, ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ, সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দী, ধ্রুপদী সঙ্গীত গায়িকা শুভা মুদগল, লেখক অমিত চৌধুরি, অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক সেন ও গায়ক অনুপম রায় অন্যতম।

উল্টো দিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রসঙ্গে এখনকার বুদ্ধিজীবীরা সবাই ক্ষেপে গেছেন। তারা মনে করছেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের দাবী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র! সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। বাংলাদেশ ওআইসি’র সদস্য। বাংলাদেশের লেখকরা নিজেদের আইডেন্টি হিসেবে দাবী করেন ইনারা ‘বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক’- তবু তারা বাংলাদেশ ও নিজেদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ হিসেবে গলা চড়িয়ে ঘোষণা করেন! এখানেই ভারত আর বাংলাদেশের মাঝে পার্থক্য। এখানেই দুই দেশের বুদ্ধিজীবীদের মাঝে বিস্তর ফারাক।

ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীদের কথা একবার চিন্তা করে দেখুন। নতুন প্রজন্মের পরিচালক মুস্তফা সরওয়ার ফারুকী একবার বললেন, এদেশের প্রগতিশীলরা পুজায় নিজেদের জন্য প্রোগ্রাম রাখেন কিন্তু শবে বরাতের সময় তাদের কোন প্রোগ্রাম থাকে না। এখানে পুজা আর শবে বরাতকে টেনে এনে সংঘাত তৈরি করে প্রগতিশীলদের প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। তারপর ইসলামিক জঙ্গিদের হাতে ব্লগাররা সিরিয়াল খুন হবার সময় ব্লগারদের ধর্ম নিয়ে না লিখে ঢেড়ষ চাষ করতে বলে উপহাস করেছিলো এই লোকটা! সেখানে ভারতের চলচ্চিত্র পরিচালকরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানের রণহুংকারে পরিণত হওয়ার কারণ জানতে চেয়ে চিঠি লিখেছেন।

যদি স্মরণ করি বাম সাহিত্যিক জাকির তালুকদারের কথা, ভারতের আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া এই লেখক ২০১৮ সালে লিখলেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দুরা নির্যাতনের বানানো মিথ্যা গল্প ফেঁদে ভারতে চলে যায়। এটা তাদের অসৎ উদ্দেশ্য…’। তারপর কমরেড বদরুদ্দিন উমার এই সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সাধারণ হিন্দুরা নয়, দুর্নীতিবাজ হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত লোকই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে নানা ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা, ইতিহাসবিদরা, প্রগতিশীল দাবীদাররা সবাই সম্প্রতি সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের পর রণহুংকার দিয়ে বলছেন- এসব বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘোরতর ষড়যন্ত্র! ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের মুসলিম ও দলিতদের পক্ষে দাঁড়ানো নিয়েও কিন্তু বিতর্ক আছে, কারণ যখনই মুসলিম ফান্ডামেন্টালিস্টরা হিন্দুদের উপর চড়াও হয়, কিংবা ভারতকে ইসলামিকরণের প্রচ্ছন্ন চেষ্টা করে তখন তারা চুপ করে থাকেন। তবু ভারতের অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীলতার চাকা যাতে মরচে পড়ে না যায়, তারজন্য এই ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা হিন্দুদের উপর নির্যাতনকে অস্বীকার করে কেন? আদিবাসী পাহাড়ীদের উপর নির্যাতন বিষয়ে চুপ করে থাকে কেন? কেন তারা কাস্মিরের সেনা শাসন নিয়ে হাহাকার করে, ফিলিস্তিনীদের উপর ইজরাইলের দখলদারীর জন্য বুক চাপড়ে কাঁদলেও বাংলাদেশের পাহাড়ে বছরের পর বছর কারফিউ, সেনাশাসন ও ভূমি দখলের বিষয়ে মুখে আঙ্গুলি দিয়ে বসে থাকে? কেন আহমদ শফীর সাম্প্রদায়িক বক্তব্যের পর কারোর মুখে কোন কথা নেই?

যারা নিজেদের লেখক, পরিচালক, গায়ক, অভিনেতার আগে ‘মুসলমান’ শব্দটি বসিয়ে নিজেদের আইডেন্টি তৈরি করেন, তাদের কাছ থেকে আমাদের অসাম্প্রদায়িকতা আশা করা বোকামী ছাড়া আর কি?

সুষুপ্ত পাঠক: ব্লগার।