প্রচ্ছদ রাজনীতি আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে চায় গণফোরাম

আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে চায় গণফোরাম

29
আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে চায় গণফোরাম

একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় নীতি ও আদর্শে বিস্তর ব্যবধান নিয়েই গঠিত হয়েছিল বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপিকে নিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ ছড়ালেও ভোটে এই জোটের ভরাডুবি ঘটে। অভাবনীয় এই বিপর্যয়ের পর জোটভুক্ত দল থেকে নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যোগ দেওয়া নিয়ে নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব তৈরি হয়। ঐক্যজোটের প্রধান উদ্যোক্তা ড. কামাল একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও নেতাদের মধ্যকার সেই দূরত্ব কমাতে পারেননি। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে গণফোরামকেই আরও প্লাটফর্মে দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করছেন তিনি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার প্রধান কারণ জোটের নেতাদের পারস্পরিক আস্থাহীনতা। ফ্রন্টের অন্যতম শরিক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর জোট ছাড়ার ঘোষণায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঐক্যফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে যে জোট গঠন করা হয়েছিল, জালিয়াতির নির্বাচনের পর গত সাত মাসে এর প্রতিবাদে কোনো কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। এই জোটের অস্তিত্বই এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় কোনো সমস্যাকে তারা তুলে ধরতে পারছে না। এরকম একটি জোট যে আছে, তা দেশের মানুষ ভুলে গেছে। তাই এই জোটে যুক্ত থাকার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

কাদের সিদ্দিকীর বক্তব্যের প্রমাণ মিলে সাম্প্রতিক সময়ে ঝড় তোলা একাধিক নাগরিক ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যফ্রেন্টের গা-ঝাড়া দিয়ে না ওঠার মধ্য দিয়ে। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান হত্যা, প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত হত্যা এবং ছেলেধরা গুজবে পিটিয়ে মানুষ মারার মতো ঘটনাগুলোতে নিরব ভূমিকায় রয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এসব ঘটনার প্রতিবাদে কর্মসুচি দূরে থাক, ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে একটা বিবৃতিও দেওয়া হয়নি। এতে জোটের অস্তিত্ব আছে কিনা তাই নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে রাজনীতির মাঠে। এসব ইস্যুতে বিএনপি ও গণফোরামসহ জোটের শরিক দলগুলো আলাদাভাবে কর্মসুচি পালন করলেও ঐক্যফ্রন্টের সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, এতে জোটের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে জনগণের মাঝেও।

ঐক্যফ্রন্টের প্রধান উদ্যোক্তা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন নিজেও জোটের ভবিষ্যত নিয়ে সন্দিহান। এর আভাস মিলে গত সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তব্যে। তিনি বলেন, আমি মনে করি ঐক্যফ্রন্টের ঐক্য নয়, এখন প্রয়োজন আসলে জনগণের ঐক্য। সারা দেশের ঐক্যকে আমি বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। এছাড়া বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় একে অন্যকে দোষারোপ না করে সমস্যা চিহ্নিত করার কথা বলেন এই বর্ষীয়ান আইনজীবী।

একের পর এক সামনে আসা নাগরিক ইস্যু ও বন্যা পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো কর্মসূচি না থাকা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ওই লক্ষ্য নিয়ে আমাদের মধ্যে ঐক্য তো থাকছেই। এখন জনগণের ঐক্য গড়ে তুলতেই আমরা কাজ করছি।

ফ্রন্টের প্রধান দল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে বিভিন্ন নাগরিক ইস্যুতে ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দলীয়ভাবে কর্মসুচি দিচ্ছি। তাই জোটগত কর্মসুচি দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না। আগামীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মসুচি কি হবে বা জোটের লক্ষ্য কি হবে তা আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে।

জোটগত কর্মসূচি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা অতীতে বিএনপি, ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি। এখনও আমরা উভয় জোটেই আছি। আমরা দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি। সময়-সুযোগ ও পরিস্থিতি বুঝে ২০ দলীয় জোট ও ফ্রন্টের কর্মসূচিও করব।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের অন্যতম দুই উদ্যোক্তা জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ব্যক্তিগত কাজে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। তাদের অবর্তমানে ঐক্যফ্রন্টের কর্মসুচি নিয়ে ভাবছে না জোটের কোনো নেতাই।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঐক্যফ্রন্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার প্রধান কারণ ড. কামাল হোসেনের প্রতি জোটের প্রধান দল বিএনপির শীর্ষনেতাদের আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের দাবিকে বিএনপি নেতারা ঐক্যফ্রন্টের কর্মসুচির অন্তর্ভুক্ত করতে চান। কিন্তু বিএনপির দলীয় দাবিকে সরাসরি জোটের দাবির মধ্যে আনতে রাজি নন ড. কামাল হোসন। পাশাপাশি তিনি সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থানেরও বিরুদ্ধে। তার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে গণফোরামকে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই কাজটি হয়ে গেছে বলে এখন তিনি ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে তত আগ্রহী নন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কামাল হোসেন এখন নিজ দল গণফোরাম নিয়েই এগোতে চান। তার কাছে বর্তমানে দলীয় কর্মসূচিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এরই মধ্যে আগামী ১ আগস্ট থেকে গণফোরমের সদস্য সংগ্রহ অভিযান এবং জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সফর কর্মসুচির ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। গণফোরামের ঘরোয়া সভায় কেন্দ্রীয় নেতাদের তিনি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করে তোলার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

দলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা ও ড. কামালের ঘনিষ্ঠ সহচর নামপ্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকারের রোষানলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় এবং এরশাদের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব-সংকটে আগামী নির্বাচনে সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে গণফোরামকে বসানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে চান বর্ষীয়ান এই আইনজীবী।