প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য “একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার কান্না”

“একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার কান্না”

দিয়ার্ষি আরাগ

209
একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার কান্না

আমাদের পারিবারিক জমিজমা, অধিকাংশই শান্তির লোকজন অসাধারণ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নিয়েছে| ভাবিনি কখনও এসব লিখতে হবে। কিন্তু সময় বলছে, জানিয়ে রাখো, লিখে রাখো।
আমাদের বসবাস নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর থানার শিবগঞ্জ গ্রামে। আমার বাবা রাজকুমার দত্ত ছিলেন একজন সফল ও সুপরিচিত ব্যবসায়ী। আজও শিবগঞ্জ বাজারের সবচেয়ে বড় বাড়িটা আমাদেরই। ঐ এলাকার প্রথম পাকাবাড়িও আমাদের। কিন্তু আমাদের তেমন বেশি জমিজমা ছিল না। কারণ বাবা কৃষিকাজ নয়, ব্যবসাই পছন্দ করতেন। অল্প কিছু কৃষিজমি, পাঁচটা ভিটাবাড়ি, আর শিবগঞ্জ বাজারের লাগোয়া একটা বিশাল এলাকা আমাদের ছিল।

১. আমি তখন কলেজে। গুল হোসেন নামে একজন আমাদের খুজিউড়া গ্রামের এক ক্ষেতে গরু দিয়ে চাষ দিতে শুরু করেছিল। সে ঐ জমি জোর করে তার দখলে নিয়ে নিতে চেয়েছিল। তাকে আমরা তিন ভাই নিবৃত্ত করেছিলাম। তার হাতে একটা বড় দা ছিল। তবুও তাকে আমি দৌঁড়িয়ে তার বাড়িতে তুলে দিয়ে এসেছিলাম।
কিন্তু লাভ হয়নি চল্লিশ শতাংশের ঐ জমি আল কেটে কেটে তারা বিশ শতাংশ অবশিষ্ট রেখেছিল। পরে বাধ্য হয়ে বাবা ঐ জমি বিক্রি করে দিয়েছিলেন ফজল মিয়ার কাছে।

২. ঐ জমির পাশেই আছে আমাদের এক ভিটা। হ্যাঁ, ওটা এখনও কাগজপত্রে আমাদেরই। ওটায় জমির পরিমাণ ছিল নব্বই শতাংশ। ওটাও চারিদিক দিয়ে দখল হতে হতে ছোট হয়ে গিয়েছিল। বিশাল এক বাঁশ বাগান ছিল ওটা। আমরা ঐ বাড়িকে রইছউদ্দিনের ভিটা বলতাম। ঐ ভিটার পাহারাদার ছিলেন রইছ উদ্দিন আর জমিলার মা। রইছউদ্দিন চাচা খুবই নরম মনের আর ভালো মানুষ ছিলেন। একদিন বলা নেই কয়া নেই পোদ্দার নামে একজন আমাদের ঐ ভিটার প্রায় বত্রিশ শতাংশ জায়গা দখল করে নিয়ে গাছ লাগিয়ে দিলো। এটা দশ বছর আগের ঘটনা। ঐ পোদ্দারের শালা ছিল সুসং কলেজের প্রথম ভিপি। আবদুল হান্নান। এখন ছাত্রলীগের বড় নেতা। আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।
আমার মেজভাই বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে অনেক যোগাযোগ করলেন। চেষ্টা তদ্বির করলেন কোনও কাজ হলো না। তখনকার আওয়ামী লীগের এমপি মোস্তাক আহমেদ রুহির কাছে গিয়েছিলেন অসংখ্যবার। কিন্তু ফলাফল শূন্য।
শেষপর্যন্ত স্থানীয় মসজিদ (শিবগঞ্জ বাজার জামে মসজিদ) কমিটি আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিল। তারা প্রস্তাব দিল যে তারা পুরো বাহাত্তর শতাংশ জমিই কিনে নেবে, তারা ওটা কবরস্থান বানাবে। উপায় ছিল না, আমরা রাজি হলাম। খুবই সামান্য টাকায়, বাজার মূল্যের পনের শতাংশ হবে, আমরা বিক্রি করলাম। পাঁচ বছর হয়ে গেল ঐ সামান্য টাকাটাও এখনও আমরা পুরোপুরি পাইনি। জমি এখনও রেজিস্ট্রেশন হয়নি, কিন্তু কবর এবং জানাজার কাজ চলছে পুরোদমে।
আমার শৈশব কেটেছিল ঐ ভিটার গাছে গাছে। সময় পেলেই আমি ওখানে চলে যেতাম। ঐ বাগান, বাঁশ, গাছ, মাটি ছিল আমার আত্মার আত্মা। গত রোজার ঈদে বাসায় গিয়ে ওখানে গিয়েছিলাম। স্মৃতি কাতরতায় চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।

৩. শিবগঞ্জ বাজারের পশ্চিমের অংশটুকু প্রায় অর্ধেকটাই ছিল আমাদের। আমাদের মূল বাড়িটা এখনও পশ্চিমেই, কালীমন্দিরের পাশে। আমাদের বাড়ির উত্তর দিকে শামসুদ্দীন চাচার (অসাধারণ ভালো মানুষ, আমাদের আড়তের কয়াল ছিলেন।) বাড়ি পর্যন্ত বিশাল জায়গা ছিল আমাদের। প্রায় এক হাজার শতাংশ হবে ঐ জমির পরিমাণ।
ঐ জায়গা দখল করেছিল অনেকেই। এখনও তাদেরই দখলে। কেউ কেউ ভূয়া দলিল করেছে। তিনটি ভূমিহীন হিন্দু পরিবারকে অবশ্য এমনিতেই থাকতে দেয়া হয়েছিল। এরা আছে এখনও। কাউকে কাউকে অবশ্য লিখেও দেয়া হয়েছে। যারা আমাদের ঐ জমি জবর দখল করে এখনও বাস করছে তাদের তালিকা:

এক. আব্দুর রহমান। কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের একসময়ের চেয়ারম্যান ও এলাকার বিশিষ্ট মাতবর। আওয়ামী লীগের এমপি জালাল উদ্দিন তালুকদারের আত্মীয়। তিনি এখন ম়ৃত। তার পুত্র বাড়ির কর্তা।
দুই. হাছেন আলী পালোয়ান। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। শিক্ষক সমিতির সম্মানিত সভাপতি। আব্দুর রহমান চেয়ারম্যানের ভাগিনা। তিনিও এখন মৃত। তার স্ত্রী বাড়ির কর্তা।
তিন. বাবলু মোড়ল। তিনি যুবলীগের নেতা। দুর্গাপুর পৌরসভার প্রথম মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা কামাল পাশার বড়ভাই।
চার. আবদুল আজিজ সুবাস। এ্যাডভোকেট। দুর্গাপুর থানা বিএনপির নেতা।
পাঁচ. ফজলুল হক। যুবদলের নেতা। লোকজন, লাঠিসোটা, আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এক রাতেই দখল করেছিল আমাদের ঘর বাথরুম সহ একটা জায়গা। বিএনপির আমলে। বিশ বছর পর এখন রেজিস্ট্রেশন করে দেয়ার জন্য চাপ ও হুমকি দিচ্ছে।

৪. ইদ্রিস আলীর মাকে থাকতে দেয়া হয়েছিল আমাদের এক বড় ভিটায়। তার ছেলেরা বড় হয়ে দখল করে নেয় সেই জায়গা। ওটাও খুজিউড়া গ্রামের। অনেকবছর থাকলে নাকি জমি তাদের হয়ে যায়। ওখানে জমির পরিমাণ ছিল প্রায় একশ পঞ্চাশ শতাংশ। জাল দলিল করতে তাদের সহায়তা করেছে ঐ সময়ের কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এটা প্রায় পঁচিশ বছর আগের ঘটনা।

৫. দুর্গাপুর বাজারের কালীবাড়ির সঙ্গে আছে আলহাজ্ব মজনু মিয়ার (জামায়াত কর্মী) বিশাল বাড়ি। ওখানে দোকানই আছে মনে হয় দশ বারটা। ঐ বাড়িটির অর্ধেকের মালিক ছিলেন আমার বাবা। আমি প্রতিসন্ধায় শিবগঞ্জ থেকে নদী পার হয়ে ঐ বিশাল বাড়িটিতে গিয়ে থাকতাম। বলতে পারেন, পাহারা দিতাম। একদিন গিয়ে দেখি তালা ভাঙ্গা। মজনুর লোকজন দখল করে নিয়েছে। আমার সঙ্গে অনেক তর্কবিতর্ক হলো। আমাকে খুন করার হুমকি দেয়া হলো। তখন বিএনপির আমল। থানা বিএনপির সভাপতি মজনু মিয়াকে ইন্ধন দিতেন। আওয়ামী লীগের এমপি জালাল উদ্দিন তালুকদার অবশ্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাকেও ঐ সময় বোমা মেরে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছিল, তিনি সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলেন। তার দু’টো পাইই গোড়া থেকে কেটে ফেলা হয়েছিল। অবশেষে আমরা সামান্য কিছু টাকা পাওয়ার আশায় মজনু মিয়ার কাছেই জায়গাটা বিক্রি করে দিয়েছিলাম। শুনেছি, সেই টাকাও বাবা পুরোটা পাননি।

আরও অনেক ছোটখাটো ঘটনা আছে। এইতো মাসদুয়েক আগে খুজিউড়ার নুরজাহানীর মা( শিবগঞ্জ বাজারে কলসি করে পানি বিক্রয় করে) ফোন করে বলল, “বাবা দিপু, টেকাপয়সা তো নাই, তোমরার আট শতাংশ জমির উপর বাড়ি কইরা আমরা থাকছি দেড় কুড়ি বছর হইল। তোমরা যদি রেজিস্ট্রি কইরা দেও, তাইলে পোলাপান লইয়া শান্তিতে থাকতাম!”
আমি বলেছিলাম, “আমাদের জায়গা ছেড়ে দাও!” সে বলেছিল, “কী কও, বাবা! পোলাপাইন লইয়া কই যাইতাম! লেইখ্যা দিলে না দিবা, জমি জায়গা ছাড়তাম না!” আহারে শান্তি!

আরও নিশ্চয়ই অনেক ঘটনা আছে। যা আমি জানি না। বাবা জানতেন। একদিন বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম, “হিন্দুরা তো সবসময়। জমি বেচে। তুমি কেন শুধু শুধু এত জমি কিনেছিলে?”
বাবা খুব লজ্জা পেয়ে বলেছিলেন, “ভেবেছিলাম স্বাধীন দেশ!” আহারে স্বাধীনতা! হিন্দুর রক্ত, সম্পদ আর ইজ্জতের বিনিময়ে পাকিস্তানি জারজদের জন্য আমাদের আজকের এই স্বাধীনতা!

হিন্দু নির্যাতন অস্বীকার করা, প্রতিবাদীর বিরোধিতা করা- ওদের অনেকের পাপ ঢাকার কৌশল। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত সব এক। এটাই সত্যি। আমাদের মতো এমন গল্প আছে প্রতিটি হিন্দুর, প্রতিটি আদিবাসীর। ভয়ের রাজত্বে সবাই নিশ্চুপ। প্রধান ভয় তো সম্মান হারানোর। আমাদের ঘরের মেয়েরাও যে ওদের কাছে গনিমতের মাল!
ধ্রুবসত্য, বাংলার প্রায় সব জমির বুকেই কান্না হয়ে জমে আছে হিন্দু ও আদিবাসীদের চোখের জল।