প্রচ্ছদ রাজনীতি খালেদা ও জোট ছাড়াই জনসভা: নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা বিএনপির

খালেদা ও জোট ছাড়াই জনসভা: নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা বিএনপির

42
খালেদা ও জোট ছাড়াই জনসভা: নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা বিএনপির

দীর্ঘদিন পর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বর্তমানে বিপর্যস্ত সময় পার করা রাজনৈতিক দল বিএনপি। প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেশের ৮ বিভাগে ৮টি জনসভা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) বরিশাল বিভাগের জনসভা দিয়ে এ কর্মসূচি শুরু করছে দলটি। বিএনপির এ বিভাগীয় জনসমাবেশের বিশেষ দিক হচ্ছে- দীর্ঘদিন পর দলটি একদিকে জোটবিহীন এককভাবে, অপরদিকে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে ছাড়াই বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, সুচিকিৎসা এবং দেশে নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে এ আন্দোলনের মাঠে নামছে বিএনপি।

দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিএনপির সমাবেশের বিষয়ে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক জাগরণকে বলেন, আমরা দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে সমাবেশ করব। আশা করি আগামী ঈদুল আজহার আগেই এসব সমাবেশ হবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বরিশালের সমাবেশের মধ্য দিয়ে আমাদের এ কর্মসূচি শুরু হবে। এরইমধ্যে আরও কয়েকটি বিভাগে সমাবেশের তারিখও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর ১৯৮৪ সালের ৩০ মে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। সেই থেকে দীর্ঘ ৩৪ বছর খালেদা জিয়া বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন। এ দীর্ঘ সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দলটি যেসব জনসভা বা মহাসমাবেশ করেছে এর সবগুলোতেই খালেদা জিয়া উপস্থিত থেকেছেন। সঙ্গে প্রথমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দল পরে সাত দল সর্বশেষ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরাও অংশ নিয়েছেন। কিন্তু এবার বিএনপির কর্মসূচি শুরু হচ্ছে সম্পূর্ণ এককভাবে। সেখানে যেমন ২০ দলীয় জোটের কোনো শরিকদের অংশ নিতে বিএনপি আমন্ত্রণ জানায়নি, তেমনি কারাবন্দি থাকায় খালেদা জিয়াও অংশ নিতে পারছেন না। সেজন্য এ কর্মসূচিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে দলটি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, এখন থেকে সম্পূর্ণ এককভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের দিকে যাবে বিএনপি। এটা দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদেরও দীর্ঘদিনের দাবি। তৃণমূল নেতাদের মতামত, ২০ দলীয় জোট ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে জোটগত আন্দোলন বা কর্মসূচিতে বিএনপির লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাই ভারী হয়েছে। তাই আগামীতে সব কর্মসূচি এককভাবে করার দাবি তৃণমূল নেতাকর্মীদের। তাদের দাবিকে এবার গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে দলের হাইকমান্ড। এরই অংশ হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ এককভাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সেই দাবির প্রেক্ষিতেই এককভাবে রাজনৈতিক মাঠে নামার সাহস ও ঝুঁকি নিচ্ছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। আর দলীয় এ পদক্ষেপের প্রতি সম্পূর্ণ সায় রয়েছে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিএনপির কাছে এখন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) মুক্তি। সেই মুক্তির লক্ষ্যে আন্দোলনকে বেগবান করতে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিএনপি। আমাদের এবারের কর্মসূচি সম্পূর্ণ একক দলীয় কর্মসূচি। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা জোটগতভাবে আর কোনো কর্মসূচি হাতে নেব না। ভবিষ্যতে দলীয়ভাবেও যেমন আমাদের কর্মসূচি চলবে তেমনি জোটগতভাবেও চলতে পারে। কারণ দলীয় নেত্রীর মুক্তি আন্দোলন ও দেশের গণতন্ত্র ফেরানোর আন্দোলনে আমাদের জোটের বাইরেও যদি কোনো রাজনৈতিক দল আসতে চায়, তাকেও আমরা সাধুবাদ জানাবো।

খালেদা জিয়াবিহীন বিভাগীয় জনসমাবেশের কর্মসূচিকে বিএনপি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে মন্তব্য করে মোহাম্মদ শাহজাহান আরও বলেন, একথা তো সত্যি যে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি মানেই লাখ লাখ নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে একটি সফল কর্মসূচি পালন। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সরকারের রোষানলের কারণে আমাদের নেত্রী কারাগারে আছেন। জনগণ তা খুব ভালো করেই জানে। নেতাকর্মীরাও এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ। তাই চ্যালেঞ্জ মনে হলেও আমরা আশা করি আমাদের বিভাগীয় কর্মসূচি অত্যন্ত সফল হবে। এ নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

এরইমধ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) বরিশাল, ২০ জুলাই চট্টগ্রাম ও ২৫ জুলাই খুলনায় সমাবেশের তারিখ চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। এসব কর্মসূচি সফল করতে কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা নিয়মিত ওই সব বিভাগের বিভিন্ন জেলায় জেলায় পথসভা, কর্মীসভা করছেন। স্থানীয় নেতাদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এসব সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা অংশ নেবেন। সমাবেশে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর সমাগম ঘটানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে সবার পর। রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই মহাসমাবেশের টার্গেট নিয়েছে বিএনপি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির উদ্যোগে ও খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে সর্বশেষ জনসভা করে বিএনপি। বিএনপির আয়োজনে হলেও ওই জনসভায় এক পর্যায়ে যোগ দেন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা ছাড়াও বিএনপির নতুন জোটবন্ধু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনসহ ফ্রন্টের অন্য শীর্ষ নেতারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, আমরা আশা করছি এ সমাবেশের মধ্য দিয়েই ঝিমিয়ে পড়া তৃণমূল নেতাকর্মীরা আবার চাঙ্গা হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলন কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে চাপে রাখার পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলবে।

বিএনপির বরিশাল বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, আমরা আশাবাদী আমাদের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষও আগামীকাল বরিশাল ঈদগা ময়দানের জনসভাকে মহাসমাবেশে পরিণত করবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এরইমধ্যে সরকার দলীয় সন্ত্রাসী ও প্রশাসন সমাবেশে বাধা সৃষ্টি শুরু করেছে। বিশেষ করে আগৈল ঝড়া ও গৌরনদীর বিএনপি নেতাকর্মীদের তারা বলে দিয়েছে, কেউ যেন সমাবেশে যোগ না দেয়। তারপরও সব বাধা উপেক্ষা করে আমাদের নেতাকর্মীরা পালিয়ে বরিশাল আসছেন। আমাদের সমাবেশে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান অতিথি থাকবেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং কয়েকজন ভাইস চেয়ারম্যান বক্তব্য রাখবেন। সভাপতিত্ব করবেন যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সরোয়ার।

বিএনপির সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন বলেন, সিলেটের সমাবেশের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও সমাবেশের জন্য কাজ চলছে। আসন্ন ঈদুল আজহার আগেই যে সিলেটের সমাবেশ হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর দল পুনর্গঠনের কাজে মনোযোগ দেয় বিএনপি। এ কারণে গত ছয় মাসে বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি দেয়নি দলটি। কেন্দ্রীয়ভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে শুধু মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। দলীয় প্রধানের মুক্তির দাবিতে বড় ধরনের কর্মসূচি না দেয়ায় এ নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

ঢাকা বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ বলেন, সব শেষে ঢাকা বিভাগীয় শহরে মহাসমাবেশ হবে। রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আমরা এ মহাসমাবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।