প্রচ্ছদ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বজ্রপাত এড়াতে যা করণীয়

বজ্রপাত এড়াতে যা করণীয়

44
বজ্রপাত এড়াতে যা করণীয়

সারাবিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়েছে এবং বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। এখন বৃষ্টি হলেই হয় বজ্রপাত, আর বজ্রপাত মানেই মৃত্যু। বজ্রপাতের কবলে পড়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ মৃত্যুর ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। সবচেয়ে ভালো হয় কোনো একটি পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিতে পারলে। কোথাও বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকে। এসব স্থানে আশ্রয় নেবেন না। খোলা স্থানে বিচ্ছিন্ন একটি যাত্রী ছাউনি, তালগাছ বা বড় গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি থাকে। এসময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি থাকবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতর থাকুন।

বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করবেন না। এসময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও ধরবেন না। বজ্রপাতের আভাস পেলে আগেই এগুলোর সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করুন। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্লাগ আগেই খুলে রাখুন।

এসময় গাড়ির ভেতরে থাকলে সম্ভব হলে গাড়িটি নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন। গাড়ির ভেতরের ধাতব বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। গাড়ির কাঁচে হাত দেবেন না। এমন কোনো স্থানে যাবেন না, যে স্থানে আপনিই উঁচু। ধানক্ষেত বা বড় মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে যান। বাড়ির ছাদ কিংবা উঁচু কোনো স্থানে থাকলে দ্রুত সেখান থেকে নেমে যান। এসময় আপনি যদি ছোট কোনো পুকুরে সাঁতার কাটেন বা জলাবদ্ধ স্থানে থাকেন তাহলে সেখান থেকে সরে পড়ুন। পানি খুব ভালো বিদ্যুৎ পরিবাহী। কয়েকজন মিলে খোলা কোনো স্থানে থাকাকালীন যদি বজ্রপাত শুরু হয় তাহলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যান। কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যান।

বজ্রপাতের উপক্রম বুঝতে পারলে কানে আঙ্গুল দিয়ে নিচু হয়ে বসুন। চোখ বন্ধ রাখুন। কিন্তু মাটিয়ে শুয়ে পড়বেন না। মাটিতে শুয়ে পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। আপনার উপরে বা আশপাশে বজ্রপাত হওয়ার আগের মুহূর্তে কয়েকটি লক্ষণে তা বোঝা যেতে পারে। যেমন-

বিদ্যুতের প্রভাবে আপনার চুল খাড়া হয়ে যাবে, ত্বক শিরশির করবে বা বিদ্যুৎপ্রবাহ অনুভব হবে। এ সময় আশপাশের ধাতব পদার্থ কাঁপতে পারে। অনেকেই এ পরিস্থিতিতে ক্রি ক্রি শব্দ পাওয়ার কথা জানান। আপনি যদি এমন পরিস্থিতি অনুভব করেন তাহলে দ্রুত প্রস্তুত হন। কারণ বজ্রপাত হওয়ার আশঙ্কা চরমে। বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। এ সময় বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা সবচেয়ে নিরাপদ।

আপনার বাড়িকে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। এজন্য আর্থিং সংযুক্ত রড বাড়িতে স্থাপন করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নিতে হবে। ভুলভাবে স্থাপিত রড বজ্রপাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। বজ্রপাতের সময় আশপাশের মানুষের খবর রাখুন। কেউ আহত হলে দ্রুত চিকিৎসককে ডাকতে হবে বা হাসপাতালে নিতে হবে। একই সঙ্গে এসময় বজ্রাহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

এবিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা রিয়াজ আহমেদ বলেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। তিনি বলেন, বজ্রপাতের সময় আশেপাশে যদি কোন উঁচু গাছ থাকে সেখান থেকে দূরে থাকা, টিনের ছাদ এড়িয়ে চলা, উপরে ছাদ আছে এমন জায়গায় চলে আসা উচিত। বৈদ্যুতিক খুঁটি ও টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে। তাছাড়া জলাশয় ও পুকুর থেকে দূরে থাকলে উত্তম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এইচ এম আসাদুল হক বলেন, যখন দেখা যায় বৃষ্টি হতে যাচ্ছে এবং মেঘ দ্রুত চলাচল করছে তখন ইলেকট্রন সঞ্চিত হয় বেশি। প্রাথমিক পর্যায়ে ওই সময়ে বজ্রপাত বেশি হয়। এ সময় খোলা জায়গায় না থেকে যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে থাকা উচিত। বজ্রপাতে মৃত্যুর বিষয়টিকে বাংলাদেশে এতদিন তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি বজ্রপাতের ধরন ও এ ঘটনায় মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় সারাদেশে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শনিবার (১৩ জুলাই) ২৪ ঘণ্টায় বজ্রপাতে সারাদেশের ৭ জেলায় ১৫ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে পাবনার বেড়ায় ৪ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৩ জন, ময়মনসিংহে ৩ জন, সুনামগঞ্জে ২ জন এবং নেত্রকোনা, মাগুরা ও রাজশাহীতে ১ জন করে নিহত হয়েছেন।