প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত অন্ধ ভারতবিদ্বেষ ও বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থান

অন্ধ ভারতবিদ্বেষ ও বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থান

সুষুপ্ত পাঠক

602
অন্ধ ভারতবিদ্বেষ ও বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থান

অন্ধ ভারতবিদ্বেষ আর ঘৃণায় যখন আওয়ামী লীগার ও কমিউনিস্টরা এসে যায় তখন সেখানে বেশ একটা ‘অসাম্প্রদায়িক ভারত বিরোধীতা’ জাহির করা যায়! আওয়ামী লীগ পাকিস্তান বিরোধী, যুদ্ধাপরাধ বিরোধী- কাজেই তাদের ভারত বিরোধীতা বা ভারতকে রেন্ডিয়া বলা, ভারতীয় টিমকে চোর বলাটাকে জামাত বিএনপির মত সাম্প্রদায়িক বলা যাবে না। যেমন কমিউনিস্টরা যখন একই রকম ভারত ঘৃণা দেখায়, তখন সেটাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হিসেবে দেখানো যায়। এই চালাকীটা আপনার সঙ্গে সহজেই করা যাবে, যদি না আপনি বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন সম্পর্কে কিছুই না জানেন।

পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও পূর্ববঙ্গ নিয়ে মুসলমানদের জন্য পৃথক একটি রাষ্ট্র করার দাবী করা হয়েছিলো লাহোর প্রস্তাবে। লাহোর প্রস্তাবে শেরেবাংলা প্রস্তাব করেন, যে সব এলাকা একান্তভাবেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ যেমন, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এলাকা এবং ভারতের পূর্বাঞ্চল; প্রয়োজন অনুযায়ী সীমানার রদবদল করে ঐ সকল এলাকাকে ভৌগোলিক দিক দিয়ে এককভাবে পুনর্গঠন করা হোক, যাতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র স্টেটস হিসেবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলদ্বয় সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌমত্ব লাভ করতে পারে। কিন্তু দেশভাগ মুসলমানদের পূর্ণ চাওয়া অনুযায়ী হয়নি। হলে আসাম ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে হিন্দুরা নিজ দেশ থেকে উচ্ছেদ হত। কেবলমাত্র পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ও পাঞ্জাব ভাগ হয়ে মুসলমানদের নিজস্ব দেশ “পাকিস্তানে” যোগ দেয়। পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বি হিন্দু রাখা যাবে না- এটাই ছিলো পরিকল্পনা।

মুসলমানদের জন্য পৃথক দেশের ভাবনা এসেছে এখান থেকেই। মুসলমানরা হিন্দুদের থেকে পিছিয়ে থাকায় প্রতিযোগিতায় পারবে না। তাই ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চলগুলো নিয়ে মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা, যারা অর্থে শিক্ষায় প্রধান ছিলো তারা দেশভাগের প্রবল বিরোধী হয়ে উঠে। আপনারা যারা শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েছেন, সেখানে দেখেছেন দেশভাগ নিয়ে মুসলিম লীগারদের সঙ্গে হিন্দুদের দ্বন্দ্ব কেমন ছিলো। মুসলিম লীগাররা কেমন হিন্দু বিরোধী ছিলো। মনে করা হচ্ছিল, এই হিন্দুদের কারণে হয়ত দেশভাগ পণ্ড হয়ে যাবে। মুসলমানদের মঙ্গল হোক সেটা এই হিন্দুরা কোনদিন চাইবে না। এরকম থমথমে একটা সময়ে মুসলিম লীগ ডাইরেক্ট এ্যাকশান ডে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলো। এই কর্মসূচিতে উশকানি ও মদদ দিতে সরকারী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে বসেন সোহরাওয়ার্দী। তিনি তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী।

মুসলিম লীগের খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের যুদ্ধ ইংরেজদের বিরুদ্ধে নয় হিন্দুদের বিরুদ্ধে’। এরকম ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’-তে সোহরাওয়ার্দী দাঙ্গা বাধাতে পূর্ণ মদদ দিয়ে গেলেন। লেখক আবুল মনসুর আহমদ কোলকাতা দাঙ্গার জন্য সোহরাওয়ার্দীকে সম্পূর্ণ দায়ী করেছিলেন। এই দাঙ্গা পরবর্তীতে ঢাকা, নোয়াখালী, খুলনাতে ভিন্ন রূপ নেয় যার মূল্য উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দুদের এটা বুঝানো যে, তাদের এদেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে যদি তারা বাঁচতে চায়। খুলনা যে পাকিস্তানের ভাগে পড়েছে এ জন্য খান-এ সবুরকে তার সম্পূর্ণ ক্রেডিট দেয়া হয়। খুলনার হিন্দুদের খেদাতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলো এই বীর পাকিস্তান আন্দোলনকারী। ১৯৭১ সালে এই একই লোক পাকিস্তান রক্ষা করতে চেয়ে খুলনার হিন্দুদের কচুকাটা করেছিলো। রাজাকার বাহিনী গঠন করে ৯ মাস অত্যাচার নির্যাতন ধরষণের মচ্ছব বসিয়েছিলো। যুদ্ধের পর তাকে জেলে ভরা হলে তিনি বঙ্গবন্ধুকে চিঠি লিখে পাকিস্তান আন্দোলনে তার বিশেষ ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছিলো।

পূর্বপাকিস্তান গঠন হয়েছিলো হিন্দুদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক প্রভাব সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে। এটা করা হয়েছিলো যাতে পূর্ব পাকিস্তানে কোনদিন হিন্দুরা রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে না পারে। তবু যে অবশিষ্ট হিন্দুরা থেকে গিয়েছিলো তাদের ১৯৫০ সালে ফের ভারত চলে যাবার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। কথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু সমাজের নেতা যোগেন মন্ডল ভারতকে বয়কট করে পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিলেন। তার কারণেই তার অনুসারী হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিলো। ১৯৫০ সালে তিনি তখন মন্ত্রী, ঢাকা পরিদর্শন করে তিনি বলেছিলেন, “ঢাকায় ৯ দিন অবস্থানকালে আমি ঢাকা ও তার পার্শ্ববতী এলাকার প্রায় সব দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করি। ঢাকা-নারায়নগঞ্জ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে শত শত নিরপরাধ হিন্দুর হত্যালীলার সংবাদ আমাকে দারুণভাবে ব্যথিত করে।”

এই যোগেন মন্ডল নিজে ভারত পালিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। সেকথায় পরে আসছি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনী মূলত হিন্দুদের টার্গেট করেছিলো। এর আগে পুরো পাকিস্তান আমলে হিন্দুদের পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানরা ভারতের স্পাই মনে করত। ৬৪-৬৫ সালে ফের দাঙ্গায় হিন্দুদের শত্রু আখ্যা দিয়ে তাদের সম্পত্তি এনিমি প্রোপার্টি করা হয়। ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেছিলো আর যারা রাজাকার আল বাদর গঠন করে বিরোধী তৈরি করেছিলো- এরা উভয়ে “ভারতের ষড়যন্ত্র” “ভারতের দালাল” সম্পর্কে একমত ছিলো। একসময় এরা উভয়েই পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য হিন্দুদের সন্দেহ করত। পাকিস্তানে বাঙালি মুসলমানদের সতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠার পথে বুদ্ধিজীবীদের একাংশ হিন্দুদের সমস্যা মনে করত। কারণ এদের সঙ্গে কোলকাতার একটা ঐতিহাসিক যোগ থেকেই গিয়েছিলো। এটাকে মনে করা হত বাঙালি মুসলমানদের পুরোপুরি মুসলমান হতে দেয়ার পথে একটা বাধা।

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমান প্রবলভাবে ভারত বিরোধী ছিলো। আজকের মত তখনো সবাই মনে করত, ভারত তাদের দখল করার জন্য ওত পেতে বসে আছে। ভারত তাদের বিরুদ্ধে দিনরাত ষড়যন্ত্র করছে। যদিও ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের বর্ডার সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকার পরও ভারত আক্রমণ করেনি। কেন্দ্রের এই উদাসিনতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা পশ্চিম পকিস্তানের তীব্র সমালোচনা করেছিলো। তারা ভাবছিল শত্রু ভারত থেকে পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙালি মুসলমানদের বিষয়ে উদাসিন থেকেছে। তাদের ক্ষোভ পাকিস্তানের অস্তিত্ব ধ্বংস করার চিরশত্রু ভারত থেকে পূ্র্ব পাকিস্তানকে পশ্চিমারা রক্ষা না করে কেবল নিজেদের কথাই ভেবেছে। এর বাইরে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ কখনই বাংলাদেশ স্বাধীন হোক এরকম কোন চিন্তা ঘুমের ঘোরেও ভেবে দেখেনি।

পাকিস্তানে তারা তাদের অধিকার চায়, বৈষম্য দূর করতে চায়, কিন্তু যে আদর্শে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো, তা থেকে সরে আসার মত কোন রেনাসা তো এখানে ঘটেনি। কাজেই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কিছুতে প্রগতিশীল সেক্যুলার মুভমেন্ট ছিলো না। এটা ছিলো পাঞ্জাবী পাঠানদের সঙ্গে বৈষম্যের লড়াই। কিন্তু হিন্দুরা বোকার মত এটাকে ভুল বুঝল। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ যে ‘মুসলমান বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এটা বু্ঝেনি। যোগেন মন্ডল যেমন পাকিস্তান কি এবং কেন করা হয়েছিলো বুঝতে দেরী করেছিলো। যাই হোক, হিন্দুরা ভুল বুঝেই ৬ দফার পর আশায় বুক বাঁধল। ৭১ সালে হিন্দু নারীদের গণিমতের মাল, তাদের ধরে ধরে পাখির মত গুলি করে হত্যা, শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয়- সবটাই ছিলো হিন্দু হলোকাস্ট। তবু মুক্তিযুদ্ধ শেষে হিন্দুরা কেন দেশে ফিরোছিলো তারাই সেটা ভালো জানে। তাদের কি কোন আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো যে এদেশে তাদেরও হবে? এদেশের পরিচয় কেবল মুসলিম হবে না? না, এরকম কোন আশ্বাস তাদের কেউ দেয়নি। তারা নিজেরাই এসেছে এখন দলবেধে নিরবে নিভৃতে আবার চুপেচাপে দেশ ছাড়ে…।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতের সেমিফাইনের হারের পর অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তফার দায়িত্বহীন অযৌক্তিক ভারত বিদ্বেষে ভরা পোস্ট, কিংবা সাবেক ছাগু ফাইটারের ভারত হারে পৈশাচিক আনন্দ লাভ, প্রবাসী আরবী নামের কমিউনিস্টদের ভারত ঘৃণা, ভারতকে “দাদাবাবু” বলে সম্বোধন পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের বেসমেন্ট জেনে নিলে বুঝতে সহজ হবে। কিছু হিন্দু সব যুগেই ছিলো যোগেন মন্ডলের মত ভুল করেছিলো এবং করবে। যারা ক্রিকেট প্রেমে ভারতকে রেন্ডিয়া, ভারত চোর, আইসিসি চোর বলে সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে ভালো হতে চাচ্ছে- এক দশক পরে এদের অধিকাংশ লাত্থি খেয়ে ঠাই নিবে পশ্চিমবঙ্গে। এমন কি বাংলাদেশ টিমের লিটন-সৌম্য ক্রিকেট খেলে সংখ্যাগরিষ্ঠদের যে পরিচয় পেয়েছে, ৯০ ভাগের দেশে তারা ১০ ভাগের কি কি করা উচিত নয়- সেরকম থ্রেট প্রতিনিয়ত তাদের মনে করিয়ে দেয়া থেকে অনুমান করতে পারি, খেলা ছেড়ে দেবার পর এদের অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে ঠাই নিবে…।