প্রচ্ছদ রাজনীতি “যেভাবে প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টায় জামায়াত!”

“যেভাবে প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টায় জামায়াত!”

50
যেভাবে প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টায় জামায়াত!

প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিরোধীতাকারী দল হিসেবে চিহ্নিত ও পরিচিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দলের আমিরসহ শীর্ষ বেশ কয়েক নেতার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর থেকেই মূলত দলটি আর প্রকাশ্য রাজনীতিতে নেই। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হঠাৎ তাদের নেতাকর্মীদের দেখা গেলেও গত প্রায় দুই বছরেরও অধিক সময় থেকে আর রাজপথমুখী নেই জামায়াত নেতাকর্মীরা। বর্তমান নের্তৃত্বের মধ্যে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান, কর্মপরিষদ সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরোয়ার, মাওলানা আবদুল হালিমকে কদাচিৎ বিভিন্ন সভা সেমিনারে হঠাৎ দেখা গেলেও আর কোনো নেতাকে প্রকাশ্য দেখা যায় না বললেই চলে।

প্রতিষ্ঠার ৭৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে জামায়াতে ইসলামী ৷ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধিতা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দলটির আমিরসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার ফাঁসির দণ্ড এরইমধ্যে কার্যকর হয়েছে ৷ আরও কয়েক প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার মাথার উপর ঝুলছে দণ্ড কার্যকরের অপেক্ষা। বিচারের মুখোমুখি রয়েছেন বেশ কয়েকজন। এ পর্যায়ে দলের মধ্যে সংস্কার ইস্যুতে বিভক্তি দলটিকে আরও নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জামায়াত তার ইতিহাসে সবচেয়ে দুঃসময় পার করছে ৷ কেন্দ্র থেকে তাই সবাইকে ধৈর্য ধারণের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ৷ আর জোট শরিক বিএনপির আচরণ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

জামায়াত সূত্রে জানা যায়, কারাগারের বাইরে থাকা জামায়াতের নেতারা এখন সহিংস আচরণ না করার কৌশল নিয়েছেন ৷ কারণ তারা মনে করেন, নতুন করে সহিংসতা করলে জামায়াতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করতে সরকারের সুবিধা হবে। তাহলে জামায়াতের অস্তিত্বই নাজুক হয়ে যেতে পারে ৷ এরইমধ্যে আদালতের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে ৷ এর পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতের বিচার শুরু হওয়ার হুমকিও দলটিকে ভাবিয়ে তুলেছে। নেতারা চাইছেন এই অবস্থায় অন্তত জামায়াতকে দল হিসেবে রক্ষা করতে।

জামায়াত সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা থাকার পর বর্তমান নেতৃত্ব যেকোনো প্রকারে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই চেষ্টার অংশ হিসেবে বিগত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই বিভিন্ন লবিয়িং ব্যবহার করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তারা যোগাযোগ করে আসছেন।

সূত্র জানায়, সরকার ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের কাছে প্রকাশ্য রাজনীতির অনুমতির জন্য জামায়াত অনেক দিন ধরেই প্রচেষ্টা চালিয়ে আসেছে। তাদের সেই প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে এককভাবে রাজনীতি বা বিএনপির বাইরে কোনো আলাদা প্লাটফর্মের আড়ালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর অনুমতি। এ দুই ধারার যেকোনো একটির অনুমতি পেলেও জামায়াত রাজনীতির মাঠে সরব হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। এ কারণে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বে আলাদা রাজনৈতিক প্লাটফরমের আড়ালে জামায়াত রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চায়।

২৭ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে কর্নেল অলি ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে বিএনপির বাইরে আলাদা রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ঘোষণা করেন। সেদিন কর্নেল অলি জামায়াত প্রসঙ্গে বলেন, ১৯৭১ সালের জামায়াত আর এখনকার জামায়াত এক নয়। তখনকার নেতৃত্ব ও বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে ব্যাপক তফাত সৃষ্টি হয়েছে। এখনকার জামায়াত নেতৃত্ব দেশের স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী। তারা দেশপ্রেমীও বটে। রাজনৈতিক অঙ্গনে কানাঘুষা আছে কর্নেল অলির নতুন এই অবস্থানের পেছনে জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম ভূমিকা আছে।

জানা যায়, প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগের জন্য সরকারের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় থাকা জামায়াত সরকারের কাছে এরইমধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনাও দিয়েছে। সরকার এখনও সেই প্রস্তাবনায় সাড়া না দিলেও সুনির্দিষ্টভাবে বিরোধিতাও করছে না। সিদ্ধান্ত এখনও বিবেচনাধীন বলে জানা গেছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৮ জুন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীতে আদর্শিক পরিবর্তন এসেছে কি না তা বুঝতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

কাদের বলেন, আসলে বাস্তবতা কী সেটা দেখতে হবে সরেজমিনে। তারা পরিবর্তিত কোনো রূপ নিয়ে এসেছে কি না। এটা তাদের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে। তারা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে, করলে কতটা করে, সেটা তাদের কার্যক্রমের উপর নির্ভর করবে। এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে, রাজধানীর বড় মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয় গত কয়েক বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। সেখানে কোনো কেয়ারটেকারেরও দেখা মেলেনি। আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে জানা যায়, এক সময়ের সরগরম এ কার্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ আছে। এখানে দলটির কোনো লোকজনকে দেখা যায় না।

এ ছাড়াও www.jamaat-e-islami.org এড্রেসে জামায়াতে ইসলামীর একটি সচল ওয়েবসাইট ছিল। এটাও এখন অকার্যকর হয়ে আছে। দলটি একটি ই-মেইল থেকে প্রচার বিভাগের এম আলম নামে এক ব্যক্তির স্বাক্ষরে বিভিন্ন প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়। এ ছাড়াও, রাজধানীর পুরানা পল্টনের কার্যালয় থেকে দলটির মহানগর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ হত। সেখানে ছিল জামায়াতের অন্যতম সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরেরও কার্যালয়। এসব কার্যালয়ও গত কয়েক বছর যাবত বন্ধ হয়ে আছে। প্রকাশ্য কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

দলটির আধ্যাত্মিক নেতা এক সময়ের আমির গোলাম আযম ৯০ বছরের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে মুত্যুবরণ করেছেন। ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর। আরও ফাঁসি হয়েছে সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের। বর্তমান কর্মপরিষদের ২২ জনের মধ্যে ৯ জন আছেন কারাগারে। বাকিরা হয় নিষ্ক্রিয়, নয় পলাতক ৷ বাইরে থাকা ১৩ জন সদস্যের মধ্যে ৯ জন একাধিক মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে। দুজন আদালত অবমাননার অপরাধে দণ্ডিত হয়ে পলাতক। বাকিরা অসুস্থ, নয়তো রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। একজন (ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক) লন্ডনে। কিছুদিন আগে সেখান থেকেই তিনি জামায়াতের রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে জামায়াতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বন্ধু এবং একই জোটের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি জামায়াতের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। জামায়াতের নেতাদের বিরুদ্ধে দেয়া ফাঁসির দণ্ডের রায়ের পরও বিএনপি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকলেও তা আসলে অকার্যকর অবস্থায় আছে। দীর্ঘদিন ধরেই ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে দলটির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধি যোগ দিচ্ছে না। জামায়াতের নেতাদের ফাঁসির দণ্ডের পর বিএনপির নিশ্চুপ থাকা ও দণ্ডের বিরুদ্ধে জামায়াত শিবিরের সহিংস আচরণের দায় এড়াতে বিএনপি জামায়াতের কাছ থেকে ‘পোশাকি’ দূরত্ব বজায় রেখে আসছে বলে বিএনপি সূত্র থেকে জানা যায়।

রাজপথে দলকে সক্রিয় রাখার দায়িত্বে ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, শিবিরের সাবেক সভাপতি ডা. ফখরুদ্দিন মানিকের মতো তরুণ নেতারা। তারা দুজনই দীর্ঘদিন কারাগারে থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

জামায়াতের এক নেতা দৈনিক জাগরণকে বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষমতা জামায়াতের আছে ৷ কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীদের দেখামাত্র গুলি বা আটক করে নির্যাতনের কারণে তারা মাঠে নামতে পারছেন না। তিনি বলেন, জামায়াত বিপাকে আছে সত্য, কিন্তু জামায়াত নিঃশেষ হয়ে গেছে এই ধারণা ভুল। সময় হলেই জামায়াত রাজনৈতিক মাঠে তার অবস্থান সংহত করবে।

এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান দৈনিক জাগরণকে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো আদর্শিক ঐক্য নেই ৷ এটি একটি নির্বাচনি জোট ৷ তাই জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সংকটে বিএনপির কোনো করণীয় নেই। এটা জামায়াতের নিজস্ব ব্যাপার।

অ্যাডভোকেট আযম বলেন, যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াত নেতারা দণ্ডিত হয়েছেন, কারোর দণ্ড কার্যকর হয়েছে। এগুলো বিএনপির বা জোটের কোনো বিষয় নয়। তাই বিএনপি কোনো বিবৃতি, প্রতিবাদ বা শোক প্রকাশ করেনি, দেখায়নি কোনো প্রতিক্রিয়া।

প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং পাকিস্তান বিভক্তির বিরোধিতা করে জামায়াত। দলটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী, বুদ্ধিজীবী এবং সংখ্যালঘু হত্যায় সহযোগিতা করে বলে অভিযোগ। দলটির অনেক নেতাকর্মী সেসময় গঠিত আধা-সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেছিল যারা গণহত্যা, ধর্ষণ এবং জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো অপরাধে জড়িত থাকায় অভিযুক্ত। জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা আধা-সামরিক বাহিনী শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আলবদর গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিল।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর নতুন সরকার জামায়াতকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর এবং কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৭ সালে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলে জামায়াতের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

১৯৮০-এর দশকে জামায়াত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বহুদলীয় জোটে যোগদান করে। এসময় দলটি আওয়ামী লীগ ও সমসাময়িক বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে পরবর্তীতে দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য আন্দোলনও করে। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে। ২০১২ সালের মধ্যে দুজন বিএনপি নেতা ও জামায়াতের সাবেক ও বর্তমান সদস্যসহ ৮ জন নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা দায়ের করা হয়।
২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত জামায়াতের সাবেক সদস্যসহ মোট ৪ জনকে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা ও একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সাবেক আমির গোলাম আযমকে ৯০ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

সম্পাদক/এসটি