প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় “নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর প্রশ্রয়দাতা সুনাম-দেলোয়ার”

“নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর প্রশ্রয়দাতা সুনাম-দেলোয়ার”

128
নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীর প্রশ্রয়দাতা সুনাম-দেলোয়ার

বরগুনায় স্ত্রীর সামনে প্রকাশে দিবালকে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে ‘হত্যা’র ঘটনা দেশব্যাপী আলোচিত। এই ঘটনায় জড়িত নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়া ছাড়াও এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে রিফাত ফরাজীসহ ১০ জন। যার মধ্যে চারজন এরই মধ্যে নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।

তবে নয়ন বন্ড ও রিফাত-রিশান ফরাজীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতারা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ নিয়ে আলোচনার ঝড় বাইছে সাধারণ থেকে শুরু করে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক মহলেও। তাদের অভিযোগ রাজনৈতিক নেতাদের মদদ ও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নয়ন বন্ড ও রিফাত-রিশান ফরাজীরা সৃষ্টি হয়েছে।

এমনকি তাদের মদদদাতা হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই এমপি ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভু’র ছেলে সুনাম দেবনাথ ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন এর নাম উঠে আসে। তাদের মদদেই নয়ন বন্ড ও রিফাত-রিশান ফরাজীরা বরগুনায় ভীতির রাজত্ব কায়েম করেছিল।

এর ফলে রিফাত শরীফ ‘হত্যাকাণ্ডে’র পরে পুলিশের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে সুনাম দেবনাথ ও দেলোয়ার হোসেন। এমনকি সুনামের তথ্যে নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত ও দেলোয়ারের তথ্যে রিফাত ফরাজী গ্রেপ্তার হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে সর্বত্র। যদিও তদন্তের স্বার্থে আসামিদের গ্রেপ্তারের স্থান সম্পর্কে কিছু বলতে নারাজ পুলিশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক বলেন, নয়ন বন্ডের পৃষ্ঠপোষক বা তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা সেটা এখন আর কারোর বুঝতে বাকি নেই। আমি শুনেছি নয়ন বন্ড এমপি’র ছেলের লোক। তাছাড়া ফেসবুকেও দেখেছি তাদের সাথে ০০৭ গ্রুপের সদস্যদের ছবি।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় প্রশ্রয় ছাড়া নয়ন বন্ডরা তৈরি হয়নি। মূলত মাদক ব্যবসা স্বার্থেই তাদের তৈরি করা হয়। এমনটি না হলে ২০১৬ সাল থেকে জেলা ছাত্রলীগ মাদক বিরোধী যে আন্দোলন শুরু করেছিল তাতেই নয়ন বন্ড ও তার গ্রুপ দমে যেত। এটা করতে ২০১৮ সালে আমরা সংবাদ সম্মেলনও করেছি।

কিন্তু রাজনৈতিক, প্রশাসন বা মিডিয়ার সহযোগিতা না পেয়ে এক সময় আমাদের আন্দোলন থেমে যায়। এখন যে আলোচনা চলছে সেটাও হয়তো একসময় থেমে যাবে। তবে বরগুনা সদরে একাদশ সংসদ নির্বাচনে এমপি মনোনীত প্রার্থী পরিবর্তন হলে বরগুনার অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে যেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বরগুনা জেলা যুবলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ বলেন, ‘খুনি’ কে সেটা স্পষ্ট। আমরা চাই ওইসব খুনিদের বিচার। তাই রিফাত হত্যার বিষয়টি রাজনৈতিক বিষয়ে জড়াতে চাই না। তবে এতটুকু বলতে পারি আমার যুবলীগের কোন নেতা-কর্মী এই নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়নি। বরং তারা অন্য কারোর ছত্রছায়ায় থাকতে পারে।

বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, নয়ন-রিফাতদের কোন রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন হয়নি। তারা কোন রাজনৈতিক দলেরও নয়। কোন রাজনৈতিক নেতা ব্যক্তি স্বার্থে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী তৈরি হয়েছে। যা আমি আগেও বলেছি।

তিনি বলেন, নয়ন বন্ড ও রিফাতদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা কে বা কারা সেটা বুঝতে কারোর বাকি নেই। আমরাও জানি তারা কারা। তবে পুলিশের তদন্তের স্বার্থে তার বা তাদের নাম প্রকাশ করতে অপরাগতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা চাই আর কোন নয়ন বন্ড বা রিফাত ফরাজী তৈরি নয় হয়। তাই ওদের পাশাপাশি এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতাদেরও শাস্তির দাবি করেন এই নেতা।

এদিকে, বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি মো. দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, নয়ন-রিফাতের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হলেন বরগুনার এমপি ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভুর ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথ।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বরিশাল বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় রিফাত হত্যা নিয়ে কথা বলেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির। তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং নয়ন-রিফাতের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের শাস্তির দাবি জানান। এসময় সেখানে ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভু উপস্থিত থাকলেও বিষয়টি নিয়ে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

দেলোয়ার হোসেন আরো বলেন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাতো রয়েছেই। তবে সেটা দলের স্বার্থে নয়, বরং ব্যক্তি স্বার্থে। মূলত মাদক ব্যবসার জন্যই নয়ন বন্ড সৃষ্টি হয়। আমি নয়নকে কখনোই চিনতাম না। সে এমপি পুত্র সুনামের লোক সেটা বহুবার শুনেছি। তবে রিফাত ফরাজী এমন ছিল না। পাশাপাশি বসবাসের সুবাধে নয়ন বন্ড ওকে মাদক এবং অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত করে।

ভায়রা ছেলে হিসেবে রিফাত-রিশানকে প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে দেলোয়ার হোসেন বলেন, রিফাত ওর পরিবারের অবাধ্য সন্তান। ওর বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত চারটি মামলা রয়েছে। ওর বাবা বহুবার ওকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কাজ হয়নি। তাই আমি নিজে রিফাতকে পুলিশের কাছে ধরে দিয়েছি। কিন্তু জামিনে বের হয়ে আবার সেই একই পথে চলে যায়। তাই ওকে পরিচয় দেয়াই বন্ধ করে দিয়েছি। মূলত রাজনৈতিকভাবে আমার সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমার দাবি একটাই, রিফাতের ‘খুনি’ যেই হোক তাকে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বরগুনার এমপি ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভু ও তার ছেলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা রিসিভ করেননি। যদিও রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসার শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন সুনাম দেবনাথ। তার অভিযোগ বাবার সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই কতিপয় নেতা মিথ্যাচার করছে।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের বরিশাল বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনা। এই ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

প্রধান বক্তার বক্তব্য দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ নয়ন-রিফাতদের প্রশ্রয়দাতাদের ইঙ্গিত করে বলেন, ‘নয়ন বন্ড একদিনে তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া নয়ন বন্ড তৈরি হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বরগুনার ঘটনাটি অবগত। তিনি দেশে ফিরে নয়ন বন্ডদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক তার বক্তব্যে বলেন, বরগুনার ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। এ ঘটনার সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া বরগুনার ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি যারা ক্ষুণ্ন করেছে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত নিবেন বলে জানিয়েছেন অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান।

সম্পাদক/এসটি