প্রচ্ছদ স্পটলাইট “শেখ হাসিনার ট্রেন মার্চ: সেদিন কী হয়েছিল পাবনায়?”

“শেখ হাসিনার ট্রেন মার্চ: সেদিন কী হয়েছিল পাবনায়?”

53
শেখ হাসিনার ট্রেন মার্চ: সেদিন কী হয়েছিল পাবনায়?

দিনটি ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ১৯৯৪ সাল। আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তৎকালীন বিএনপি সরকারের অব্যাহত নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে মাঠে নামেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর অংশ হিসেবে শুরু করেন ট্রেন মার্চ। ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে রূপসা এক্সপ্রেসে খুলনা থেকে নীলফামারীর সৈয়দপুরের উদ্দেশে ট্রেন মার্চ শুরু করেন তিনি। মাঝপথে ১১টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি ও পথসভা করেন। বিকালে পাবনার ঈশ্বরদী স্টেশনে পূর্বনির্ধারিত পথসভা ছিল। ওই নির্ধারিত কর্মসূচি সফল করা ও নেত্রীকে স্বাগত জানাতে পাবনা ছাড়াও নাটোর ও রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঈশ্বরদীতে জড়ো হতে থাকেন দুপুর থেকে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে দলীয় নেতা-কর্মীরা হাজির হন ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে। এদিকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রীর ঈশ্বরদীর জনসভাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেন ঈশ্বরদী থানা বিএনপির তৎকালীন নেতা-কর্মীরা। স্টেশনের প্লাটফরম ও আশপাশে চলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের স্লোগান-পাল্টা স্লোগান। সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শেখ হাসিনাকে বহনকারী রূপসা এক্সপ্রেস স্টেশনে প্রবেশের মুহূর্তে শুরু হয় ট্রেন লক্ষ্য করে বোমা হামলা ও গুলিবর্ষণ।

শেখ হাসিনা ট্রেনের যে কামরায় অবস্থান করছিলেন সেটিতে গুলি ও বোমার আঘাত লাগে। কিন্তু শেখ হাসিনা অক্ষত থাকেন। এ সময় স্টেশনে অবস্থান নেওয়া আওয়ামী লীগের নিরস্ত্র নেতা-কর্মীরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। গুলি ও বোমার শব্দে আতঙ্কিত ট্রেনের যাত্রীরা জীবন বাঁচাতে ট্রেন থেকে নেমে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।

শেখ হাসিনা কিন্তু স্থির ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে ট্রেনে অপেক্ষা করেন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শেখ হাসিনা তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মীদের নিষেধ ও বাধা উপেক্ষা করে কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে হ্যান্ডমাইকে বক্তৃতা করেন। রেলস্টেশনে কড়া পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষের উদ্দেশে শেখ হাসিনার বক্তৃতাকালে আবারও বোমা বিস্ফোরিত হয়। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, এই হামলার মাধ্যমে সরকার তার পতনের বীজ রোপণ করল, এই মুহূর্ত থেকে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারকে উৎখাত করে সন্ত্রাসী হামলার জবাব দেওয়া হবে।
তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীর ট্রেনযাত্রায় সফরসঙ্গী আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, সেদিন ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে রূপসা এক্সপ্রেসে গুলি ও বোমার স্পি­ন্টার বিদ্ধ হয়। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুকন্যা। পরে স্টেশনে অপেক্ষমাণ নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বক্তৃতায় এ হামলার জন্য তৎকালীন সরকারি দল বিএনপিকে দায়ী করেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেন মার্চের সফরসঙ্গী সিনিয়র সাংবাদিক মাহমুদ হাসান জানান, ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার পর তারা খুলনা থেকে রওনা হন। ১১টি স্টেশনে সমাবেশ-জনসভায় বক্তৃতা শেষে ঈশ্বরদী এসে পৌঁছালে জননেত্রীকে বহনকারী রূপসা এক্সপ্রেস আক্রান্ত হয়। ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে প্রবেশের মুখে শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেন লক্ষ্য করে উপর্যুপরি বোমা ও গুলিবর্ষণ করে সরকারি দল বিএনপির কর্মী ও মাস্তান বাহিনী। ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের জানান, সকাল থেকে বিএনপি সমর্থকরা স্টেশনে আওয়ামী লীগকে সমাবেশ করতে দেবে না বলে কর্মীদের বাধা দেয়। তারা দিনব্যাপী স্টেশনের আশপাশে ব্যাপক বোমাবাজির মাধ্যমে লোকজনকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখে। স্টেশনের লোকজন আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয় পৌর চেয়ারম্যানের সমর্থনপুষ্ট মাস্তানরা ট্রেনে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে।

এ সময় আওয়ামী লীগ কর্মীরা অভিযোগ করেন, বিএনপির প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের নির্দেশে এ হামলা চালানো হয়েছে। সন্ধ্যায় রেলস্টেশনে ব্যাপক পুলিশ পাহারার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের মঞ্চও পুড়িয়ে দেয়।

তৎকালীন ঈশ্বরদী কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান স্বেচ্ছাসেবক লীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটন বলেন, মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার ফিরিয়ে দিতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ট্রেন মার্চে ঈশ্বরদীতে জনসভা করতে চেয়েছিলেন। এ ঘোষণার পর পরই স্থানীয় বিএনপির সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। শেখ হাসিনাকে ঈশ্বরদীতে প্রবেশ করতে দেবে না-এমন ঘোষণা দেয়। আমরাও পাল্টা ঘোষণা দিয়ে জীবনবাজি রেখে ঈশ্বরদী স্টেশনে হাজির হয়েছিলাম। নেত্রীর ট্রেন আসা মাত্রই সন্ত্রাসীরা গুলি ছোড়ে। আমার মায়ের হাত ভেঙে দেয় সন্ত্রাসীরা। আমাকেও বাড়িছাড়া করে বিএনপির সন্ত্রাসীরা। আজকে দীর্ঘদিন পর রায় হয়েছে, সন্ত্রাসীদের সাজা হয়েছে, কিন্তু মা দেখে যেতে পারলেন না।

সম্পাদক/এসটি