প্রচ্ছদ শিক্ষাঙ্গন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অসহায় প্রধান শিক্ষকের আর্জি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অসহায় প্রধান শিক্ষকের আর্জি

1812
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অসহায় প্রধান শিক্ষকের আর্জি

৫ নং ইসলামপুর দরগাভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রসুলপুর ইউনিয়ন, গফরগাঁও উপজেলা, ময়মনসিংহ জেলায় অবস্থিত। দীর্ঘ সরকারি ছুটি শেষে ১৫/০৬/২০১৯ তারিখে খোলা হয় বিদ্যালটি। তবে বিদ্যালয়ের পরিবেশ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে পালটে গেছে কিছু কর্তাব্যক্তি আর ঠিকাদারের কিছু শ্রমিকের কোদালের আঘাতে। ১৪/০৬/২০১৯ তারিখে আমাকে অবহিত না করেই অবৈধভাবে খুড়ো-খুড়ি করা হয়েছে বিদ্যালয়ের মাঠের প্রায় ১০০০ বর্গফুট অংশ। মাঠে বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি, অবাধ ছুটে চলা, মাঠের উৎসবমুখর পরিবেশ আর নেই। সব কিছু কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। এই বিষয়ে কথা বলতে আমি উপজেলা প্রকৌশলীর কাছে গেলে তারা আমাকে জানায় এটি স্কুল কানেক্টিং রাস্তা। স্কুল কানেক্টিং রাস্তা স্কুলের গেইট পর্যন্ত হওয়ার কথা। রাস্তাটি স্কুলের মাঠ দিয়ে প্রায় ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঠিকাদারেরর কাছে মাঠ দিয়ে রাস্তা নির্মাণে উপজেলা শিক্ষা অফিস বা প্রাথমিক ও গণ-শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতিপত্র দেখতে চাইলে তারা দেখাতে পারেনি। প্রকৌশলী আমাকে এলাকাবাসীর ভয় দেখান। বিষয়টি আমি উপজেলা শিক্ষা অফিসার সাহেবকে অবগত করি। পরদিন আবার আবেদন নিয়ে প্রকৌশল অফিসে যাই এবং রাস্তার কাজের ওয়ার্ক অর্ডারের কপি চাইলে তিনি তা দেননি। পরবর্তীতে তথ্য অধিকার আইনের তথ্য প্রাপ্তি বিধি ৩ এর (ক) মোতাবেক যথাযথ উপায় অবলম্বন করে আবেদন পর্যন্ত জানিয়েছি, কোন উত্তর পাইনি, আমরা আপীল আবেদন করব। প্রকৌশলী এবং উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয় একত্রে অফিসে বসে আমাকে উল্টো চাপ দেন এবং বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যা বলে তাই হবে”। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সাহেব রাস্তার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন।আমার প্রশ্ন হলো একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান যেখানে সরকারি সম্পত্তি তথা রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিধি মোতাবেক যথাযথ রক্ষনাবেক্ষন করবেন, সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি/খেলার মাঠ রাস্তার কাজে লিখে দেয়ার বা মৌখিক অনুমতি দেয়ার কোন অধিকার তিনি রাখেন কী না? পরদিন থেকে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে থাকে যা এখনও চলমান। গত ১৯/০৬/২০১৯ তারিখে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের নির্দেশে সন্ত্রাসীরা আমার উপর হামলা করার জন্য স্কুলের সামনে অপেক্ষা করতে থাকে এবং অফিসে অনধিকার প্রবেশ করে শিক্ষক-কর্মচারী-বাচ্চাদের টিজিং শ্লেজিং করতে থাকে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়। আমি স্কুলে উপস্থিত হলে সসন্ত্রাসীরা আমার প্রতি আক্রমনে উদ্যত হয় এবং অশালীন বাজে ভাষায় গালাগাল করে, পেট্রোল ঢেলে গায়ে আগুনদিবে বলেও হুমকী দেয়। স্কুলের অফিসে চেয়ারম্যান, মেম্বার সাহেবসহ সকল নেতৃবৃন্দের সাথে আমি একা অসহায় হয়ে কথিক বৈঠকে বসতে বাধ্য হই, ফলাফল ভাষায় অবর্নীয়। “জাতীয় জরুরী পুলিশ সার্ভিসে” সহযোগীতা চাইলে, স্থানীয় পুলিশী হস্তক্ষেপে পরিবেশ সাময়িক শান্ত হয়, পুলিশের পরামর্শে ১৯ তারিখ রাত্রে আমি থানায় এজাহার দায়ের করি। এরপর প্রায় প্রতিদিনই আমাদের উপর হামলা, অপমান-অপদস্থ চলমান আছে, বাচ্চাদের প্রতিনিয়ত স্কুলে আসতে বাঁধা, স্কুলে গাল-মন্দ করা, এমনকি গায়ে হাত তোলা পর্যন্ত অব্যাহত আছে। আমি সংশ্লিষ্ট জাতীয় আইন পরিষদ সদস্যসহ, সকল সরকারি উপজেলা অফিসে সমস্যার সমাধানে লিখিতভাবে ঘটনাসমূহ জানাই। স্কুলের বাচ্চারা মাঠের জন্য প্রতিদিনই মানববন্ধন করলে, “কালের কন্ঠ” সহ বিভিন্ন গন-মাধ্যমে প্রতিদিনই খবর আসতে থাকে, ফলে আমি আরো সকলের রোষানলে পড়ি। গত ২৩/০৬/১৯ তারিখেও একই ঘটনা ঘটে, ওসি সাহেবকে অবহিত করলে নতুন করে অভিযোগ দিতে বলেন।

উল্লেখ্য ঐদিনই বিকেল বেলায় স্কুলের একজন জমিদাতা বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। রাতে জানতে পারি যে তারা পরিকল্পনা করে রেখেছে, ২৪/৬/১৯ তারিখে স্কুল মাঠে জানাজার নামাজ শেষে ইউপি চেয়ারম্যান সহ সকল নেতাকর্মী এবং উশৃঙ্খল সন্ত্রাসীরা আমার স্কুল ঘেরাও করবে এবং তাদের উপস্থিতিতেই রাস্তা করবে, আমি প্রতিবাদ/বাধা প্রদান করলে বা অতীতে স্কুল মাঠে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ছবি ধারণ করার মতো, ছবি তুলতে চাইলে মোবাইল, লেপটপ কেড়ে নেয়া হবে, আমাকে প্রয়োজনে খুন পর্যন্ত করা হবে। বিষয়টি জানার পর আমি গফরগাঁও থানায় যাই এবং প্রায় দেড় ঘন্টা অপেক্ষার পর রাত ১২ টা ৪৫মিনিটের দিকে আবার নতুন একটি এজাহার দায়ের করতে যাই এবং আমার স্কুলের বিরুদ্ধে পরিকল্পনার কথা অবগত করি। কিন্তু ওসি সাহেব আমার এজাহার গ্রহণ করেননি বরং উল্টো আমাকে চাপ দিয়ে বলেন “আপনি এই স্কুলে আজকে আছেন, কয়েকদিন পর হয়ত বদলি হয়ে চলে যাবেন, স্কুল মাঠে রাস্তা হলে আপনার সমস্যা কী”? আমি আশানুরোপ ফল না পেয়ে বাসায় চলে আসি এবং নিরুপায় হয়ে রাত প্রায় ২ টার পর আমার স্কুল সংক্রান্ত সমস্যা সম্পর্কিত সকল আবেদন মাননীয় আইজিপি, সংশ্লিষ্ট ডিআইজিপি, এডিআইজিপি, এসপি, এএসপি, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক মহোদয় সহ আরও সংশ্লিষ্ট কিছু অফিসে ই-মেইল করে ঘটনা জানাই(সংযুক্তি ৭ ফর্দ)। জানতে পারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে বাচ্চাদের মানববন্ধন ও স্কুল সংক্রান্ত সমস্যা কেন গণ-মাধ্যমে প্রকাশিত হল বা আসলো তার কারণ দর্শানোর নোটিশ আমাকে করা হচ্ছে, বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনেরও হুমকী দেয়া হচ্ছে আমাকে।

পরদিন সকালে ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার সহ সকলের উপস্থিতিতে স্কুল মাঠে ইট আনা হয়, শ্রমিকদের মারধর করে কাজ করতে বাধ্য করে সন্ত্রাসীরা। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি আমি ইউএনও স্যারকে জানাই। ইউএনও স্যার বলেন উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে যোগাযোগ করতে। শিক্ষা অফিসারের সাথে যোগাযোগ করলে উনি বলেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা বলতে। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, “এলাকার স্ট্যাক হোল্ডারদের সাথে কথা বলেন, জান দিবেন নাকী?” উপজেলার সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষরাও যেখানে কোন সমাধান দিতে পারছেন না, সেখানে এলাকার ২/৪ জন সাধারণ মানুষ আমার/আমাদের বা স্কুলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, বিষয়টি সমাধান করে ফেলবে এটা ভাবা আমার কাছে সকলের দায় এড়ানো ছাড়া আর কিছু মনে হয় না! যেখানে আমার, আমার স্কুলের শিক্ষকদের, শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে , প্রতিটা দিন আমরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র আর হিংসাত্বক আক্রমনের শিকার হচ্ছি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ দিয়ে রাস্তা হচ্ছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একেবারেই উদাসীন বলে মনে হচ্ছে। কারও কাছে আশানুরোপ কোন সাহায্য না পাওয়ায়, বাচ্চারা স্কুল মাঠে থাকায়, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আমিসহ অন্যান্য শিক্ষক, কর্মচারী, অভিভাবকগণ স্কুল মাঠে কাজের প্রতিবাদ জানালে কিছু সন্ত্রাসী ধরনের লোক, ওয়ার্ড মেম্বাররাসহ আমাকে অতর্কিত আক্রমন করে, আমাকে লাঞ্চিত অপমান-অপদস্ত করে। দুপুর প্রায় ২ টার দিকে স্থানীয় আবুল কালাম আজাদ সাহেবের মোবাইল মারফত বারবাড়ীয়া ইউপি চেয়ারম্যান আমাকে যাচ্ছেতাই বলে, অপমান-অপদস্থ করেন এবং বলে, “মাঠ দিয়ে রাস্তা হলে, দুর্ঘটনায় ২/৪ টা ছাত্র মরে গেলে তাতে তোমার কী”? অবশেষে আবারো পুলিশী হস্তক্ষেপে মাঠের ভিতর দিয়ে রাস্তার কাজ আপাতত বন্ধ আছে, শোনা যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে বা ছুটির দিনে মাঠে রাস্তার কাজ করবে! রসুলপুর ইউনিয়নের ব্যাপার নিয়ে বারবাড়ীয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে অপমান-অপদস্থ করার কোন যৌক্তিক অধিকার রাখেন কীনা তা আমার প্রশ্ন? আমি মেরুদন্ডহীন প্রাণী নই, আমি নিজের বিবেকের কাছে জবাব দিহিতায় অভ্যস্ত হওয়া, এই রসুলপুর হাই স্কুলের অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সন্তান, নিজেও তাই শিখেছি। আমার স্কুলের ব্যাপারে ভাল/মন্দ যদি আমি কোন কথা, সিদ্ধান্ত না নিতে পারি, সকল সিদ্ধান্ত যদি নেতাকর্মী, ঠিকাদার, সন্ত্রাসীরা নেয়, তাহলে শুধু প্রধান শিক্ষকের চেয়ারটাতে বসে থাকবো এতটা নির্লজ্জ আমি নই। আমি আমার উপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তথা সরকারি সম্পদ ও স্কুল মাঠ রক্ষায় সকল কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি চেয়ে আশানুরূপ সাহায্য না পেয়ে, ব্যর্থ হয়ে বাচ্চা ও স্টাফদের কোনরুপ শান্তনা বা সদোত্তর দিতে না পারায়, নিজের বিবেকের কাছে অসহায়-অপমানিত-অনিরাপদ বোধ করছি। আজ থেকে আমার স্কুলের অফিসের নির্ধারিত চেয়ারে আমি বসব না, স্কুলের প্রশাসনিক সকল দায়িত্ব আমি দাঁড়িয়ে থেকে পালন করব। আগামী ৩ দিনের মধ্যে স্কুলের সমস্যার যৌক্তিক ও ন্যায় সঙ্গত সমাধান, কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে না পেলে আমি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমার চাকুরী থেকে অব্যাহতি পত্র জমা (রিজাইন লেটার) দানের ঘোষণা করব।

মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ হিল বাকী, প্রধান শিক্ষক (৩৪ তম বিসিএস নন-ক্যাডার), ইসলামপুর দরগাভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। রসুলপুর, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। মোবা: ০১৭১০ ১৭৬৩৬২।