প্রচ্ছদ চিলেকোঠা কবিতা কুমার দীপ-এর প্রেমের কবিতাগুচ্ছ

কুমার দীপ-এর প্রেমের কবিতাগুচ্ছ

20
কুমার দীপ-এর প্রেমের কবিতাগুচ্ছ

পাথরে প্রেম

ঠিকই ধরেছ তুমি
পাথর,
পাথরেই ঢালো জল
ফুটে উঠবে ফুল
পাথরই মিলিয়ে দেবে
টসটসে ফল

কীভাবে?
সেকথা আগেই জানতে চেও না
সোনা
চতুর্দিকে নির্মাণকাজ চলছে
ভাঙছে পাথর
হাতুড়ির আনাগোনা

তার চেয়ে জল ঢালো
জলেই মিলবে
উত্তর
প্রশ্নদিগকে ছুটি দাও
সন্দেহকে বলে দাও-
ধুত্তোর!

চুম্বন

নিভে থাকা দুটো চোখে, ধীরে
জ্বলে উঠছে আলো, নীরবে;

অন্ধকারে পথ হারানো পথিক, যদি
সহসা এভাবে পেয়ে যায় দৃশ্য, রূপ
রসের পিপাসা কিছুটাও যদি মেটে
হেসে ওঠে এতটুকু সুখের অসুখ;

সেই ভালো;
জেগে থাকা, জীবন্ত ভলকানোতে পোড়া
এই দিবসের
কোনো রঙ, রূপ, গন্ধ; অসহ্য ভীষণ

তার চেয়ে বরং ঘুমই ভালো, আঁধার প্রকোষ্ঠে
স্বপ্ন হয়ে ধরা দিয়ে যাও তুমি; থরথর ওষ্ঠে।

আগুন নিয়ে

আমায় তুমি ক্যামন বাসো?
ওই দ্যাখো না নৌকাযোগে
যাচ্ছে ভেসে
পদ্মাপারের মেয়ে
এমন করে ভাসতে পারো?

সেই ছেলেটা
আশির দশের পাঠশালাঘর
এই শহরে
এখন শুনি
মঙ্গলেতে বাঁধবে বাসা
স্বপ্ন এমন দেখতে পারো?

সেই দুজনে
থাকতো যারা অন্ধকারে
রাতের ছায়া
কাঁদতো যারা গহীন রাতে
এখন তারা ঘুমিয়ে আছে
গাছের তলে
ওই সুদূরে
নীল সাগরে
থাকতে এমন পারো?

এমন করে আমায় যদি বাসো
বুকের মাঝে আগুন নিয়ে হাসো।

বহুরূপী

বিদেশি পারফিউম আর পছন্দের লেহেঙ্গাটি হাতে
দরজায় দাঁড়িয়ে রফিক।
দোর খুলতেই
সালেহাকে জাপটে ধরে ভেতরে ঢুকলো সে
পৌষের সন্ধ্যাটা মুহূর্তেই
হয়ে উঠলো উষ্ণ ফাগুন

বিয়াল্লিশ বসন্ত পেরিয়ে,
তবু মুখের আঙিনায় ঝরছে সোনালি আপেল
কামালকে নিয়ে উধাও হয়েছে সীমা;
সীমা সরকার
বিকেলে সে- ভোরের আগুন

‘তুমি আমার রাতের চাঁদ
দিনের চোখের মণি!
তোমাকে ছাড়া আর সবই অন্ধকার
আমি জানি।’
ব্রেইল শেখানো ম্যাডামের মেয়েকে
লিখেছে- ফাহিম।

ঘর। ভেতরে আলো জ্বালালে বাইরেও দ্যাখা যায়
এমনই কাঠের বেড়ার একটি ফুটোয় চোখ আমাদের
দেখি: পা হারানো বিমর্ষ স্বামীকে পরম আদরে
শয্যায় তুলে নিচ্ছে শিরিন;
অতঃপর বাতিটা নিভিয়ে দিচ্ছে,
দূরে যাচ্ছে হিম।

একই দড়িতে যুগপৎ
ঝুলে আছে সেলিম-রুমানা
সবগুলো খবরে প্রকাশ
তবু কাউকে বলতে মানা !

রফিকুল পেশাদার ছিনতাইকারী
মাঝে মাঝে খুনি।
সীমার মেয়ে দশম, ছেলেটা অনার্স
চারদিন বাদে মাটি থেকে তোলা হলো
স্বামীটির লাশ
সীমা গ্রেফতার।
কাকে দিয়ে যেন চিঠিটা লিখিয়ে নেওয়া ফাহিম
জন্মান্ধ।
শিরিনের বাবা শহরের নামকরা ব্যবসায়ী
ক্রোরপতি।
সেলিম চৌধুরী বিবাহিত
রুমানা একমাত্র শালিকা।

ঘর-বাড়ি চেয়ার-টেবিল
কাব্য-গান নাটক-নভেল… দুনিয়ার
সবকিছুরই একেকটি ফ্রেম আছে
প্রেমেরই কেবল কোনো নির্দিষ্ট রূপ মেলা ভার

মাতাল রাতের চাঁদ

দুধের থালা হাতে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে চাঁদ
মুখের উপর আছড়ে পড়ছে আলো
যেন অলৌকিক মায়াজালে বিদ্ধ আমি
আমাকে ডাকছে অপরূপ- এক ভালো

অদূরে বিজলিবাতিগুলো ম্লান, যৌবনরহিত
পাগলির ন্যায় খামোখা দ্যাখাচ্ছে মুখ
প্রকৃতি নীরব; যেমন শিশু-সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে
নিজস্ব জলসাঘরে মেতে ওঠে মা-বাবারা, তেমনি
পাতা ও পতত্রিদেরকে নিদ্রালু জেনে
অনুগত ছাত্রের ধরনে গাছেরাও শিখে নিচ্ছে
ভণিতাহীন জোছনার ক্লাস।

পা বাড়াতেই-
দুধের থালা হাতে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে চাঁদ
মুখের উপরে আছড়ে পড়ছে ধবধবে স্তন
কোজাগরী রাত
আমি এক উন্মাতাল শিশু
শুদ্ধ পাখি হবো
অনাবিল আকাশের দেশে ভেসে ভেসে
অপরূপ জোছনা কুড়োবো।

আমার ডান-পায়ের গোঁড়ালি বেয়ে বেয়ে ক্রমশ
সর্পিল উঠে আসছে পিঁপড়ে সেনানী
দুহাত বন্ধ, তবুও বন্দনার মোড়কে হাত বাড়াচ্ছে কেউ
মস্তিষ্কের মৃত্তিকায় ঝিকিয়ে উঠছে- এ্যাডোনিস

আমাকে গ্রাস করছে আফ্রোদিতি-মোহ
মুখের উপর আছড়ে পড়ছে আলো
বুকের উপর আছড়ে পড়ছে ঢেউ
আমাকে তুলে নিচ্ছে অচেনা কোন ভালো

আলো!
না কি চতুর্দিকে জোছনা পেতেছে ফাঁদ!
জোছনার অমোঘ আগুনে আমাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে
এই মাতাল রাতের চাঁদ

আমি-
মুখ লুকোচ্ছি, বুক লুকোচ্ছি, হারিয়ে যাচ্ছি রমণে
আমাকে সঙ্গী করে নিচ্ছে কি কেউ
এ-মাতাল রাতের ভ্রমণে!