প্রচ্ছদ খেলা ক্রিকেট এশিয়ার দ্বিতীয় ক্রিকেট পরাশক্তির নাম বাংলাদেশ

এশিয়ার দ্বিতীয় ক্রিকেট পরাশক্তির নাম বাংলাদেশ

50
এশিয়ার দ্বিতীয় ক্রিকেট পরাশক্তির নাম বাংলাদেশ

নিজেদের উদ্ভাসিত উত্থানের বার্তা নিয়ে এবারের বিশ্বকাপ আসরে অংশ নিতে আসে মাশরাফী-সাকিব-মুশফিকদের নিয়ে গড়া দল, লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

সেক্ষেত্রে প্রতিটি ম্যাচে তাদের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বিচার করলে বলতেই হয়, ইংল্যান্ডের মাটিতে নিজেদের সেই সামর্থ্য ও যোগ্যতা প্রমাণে সফল তারা। আর এবার, বিশ্বের লাখো-কোটি ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের সত্যায়নে তাদের এই অর্জিত সাফল্য পেল এক অনন্য স্বীকৃতি। বিশ্ববাসী জানিয়ে দিলো; বিশ্বমঞ্চে ভারতের পর এশিয়ার দ্বিতীয় ক্রিকেট পরাশক্তির নাম বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার (২০ জুন) ট্রেন্টব্রিজে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৪৮ রানে পরাজিত হয় টাইগার বাহিনী। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত যা ঘটেছে তার বিচারে, ম্যাচ হেরেও আজ প্রশংসায় ভেসেছেন মাশরাফীরা। আসরজুড়ে ভালো খেলার সম্মান পেয়ে আসলেও, অজিদের বিরুদ্ধে এদিনের লড়াই তাদের নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়। খেলা শেষ হতেই আইসিসি’র বিশ্বকাপ আয়োজকদের অফিশিয়াল টুইটার পেজে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার ৩৮২ রানের পেছনে আগ্রাসী বাঘের মতো তাড়া করে যে সাহসিকতা দেখিয়েছে সাকিব-মুশফিকরা, তাতেই শুরু হয়ে গেছে টাইগার বন্দনা।

তবে এর মাঝে চোখে পড়ে এক বিস্ময়কর পরিবর্তন। এদিন আর শুধু বাহবা বা প্রশংসায় ক্ষান্ত দেয়নি বিশ্বের ক্রিকেট অনুরাগীরা। সরাসরি টুইটার পোস্টের মাধ্যমে রীতিমতো মোহর ঠেসে সত্যায়িত করে দিয়েছে, যোগ্যতম দল হিসেবেই ভারতের পর এবার বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য দেখিয়ে যাচ্ছে এশিয়ার দ্বিতীয় ক্রিকেট পরাশক্তি, লাল-সবুজের বাংলাদেশ!

এমন কি হয়ে গেল যে, অকুন্ঠ চিত্তে এতো বড় মর্যাদার স্বীকারোক্তি জাহির করলো লোকে? এ প্রশ্নের উত্তর খুজে নেয়ার পাশাপাশি চলুন জেনে নেয়া যাক, কেমন ছিল অজিদের বিরুদ্ধে এই লড়াই আর ঠিক কি বার্তা দিচ্ছে সেটি-

ট্রেন্টব্রিজে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে, বিশ্বকাপে নিজেদের পঞ্চম ম্যাচ খেলতে নামে টাইগাররা। তবে দুর্ভাগ্যবসত, ইনজুরির হানায় সাইফুদ্দিন ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের মতো দুইজন ইনফর্ম যোদ্ধাকে ছাড়াই নামতে হয় তাদের। এদিন টস জিতে ব্যাটিং করতে নেমে ফর্মের তুঙ্গে থাকা ওয়ার্নারের দেড় শতাধিক রানের ইনিংসে ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৩৮২ রানের বিশাল পুঁজি গড়ে অজিরা। আর সেখানেই অনেকে ঘোষণা করে দেন, ‘বাংলাদেশের নির্মম পরাজয়’। আর সেটা একেবারে অযৌক্তিক ছিল না। কারণ, এই পাহাড় সমান রানের চাপ, যেকোনো দলের লড়াই করার মনোবল ভেঙে খান খান করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আর তাও সেটা যদি হয় বিশ্বের বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের অপ্রতিরোধ্য বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে, তাহলে তো কথাই নেই!

আসরজুড়েই নিজেদের হারিয়ে খুঁজতে থাকা বাংলাদেশের বোলিং লাইনআপ একেবারে দুর্বল না হলেও এদিন তারা রীতিমত বিধ্বস্ত হয় অজি ব্যাটসম্যানদের ইনফর্ম তাণ্ডবে। অন্যদের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে এতটাই মারমুখী হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষের ব্যাট যে তা থেকে রক্ষা পাননি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিবও। তবুও অজিদের এই রানের পুজি সাড়ে তিনশ’র মাঝে বাধার সম্ভাবনা ছিল, যদি না সেই সঙ্গে যোগ না হতো ফিল্ডিং দৈন্যতা। সেখান থেকে অন্তত ৪০-৫০ অতিরিক্ত রান জমা পড়েছে ক্যাঙ্গারুদের ঝুলিতে। সেটুক না হলে আজকের এই ম্যাচের দৃশ্যপট কেমন হতো, একটু চোখ বন্ধ করেই দেখুন না!

এরপর এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের শক্তিমত্তার ‘পাওয়ার ডিভিশন’ ব্যাট হাতে সে লক্ষ্য তাড়া করতে নামে। ইনিংসের শুরুর দিকে তামিমের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি রান আউট হয়ে ফেরেন সৌম্য সরকার। তারপর তামিমকে সঙ্গে নিয়ে নিজের সেরা ফর্মে থাকা সাকিব খানিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এক পর্যায়ে ষাটের ঘরে তামিম এবং চল্লিশের ঘরে সাকিব আউট হলে ইতিহাসের আরেকটি লজ্জাজনক হারের প্রহর গুণতে শুরু করে টাইগার ভক্তরা। অন্যদিকে, এদিন নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থ হন লিটনও। তবে সেই লাঞ্চিত হওয়ার দিন যে শেষ, হারতে হারতেও তা জানিয়ে দিলেন টাইগার ব্যাটসম্যান মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। দুইজনের ধৈর্য্য আর ইস্পাতদৃঢ় স্নায়ুর কাঠিন্য রীতিমত শঙ্কিত করে তোলে স্টার্ক-নাইলদের। তাদের ব্যাটেই এক পর্যায়ে পাল্টা অজিদের টুটি কামড়ে ধরে বাংলাদেশ। শেষে হাফ সেঞ্চুরি পাওয়া মাহমুদউল্লাহর পুল শট সীমানায় ধরা পড়লে একাই লড়তে থাকেন মুশফিক। প্রত্যাশা থাকলেও এ সময় তাকে যোগ্য সমর্থন দিতে পারেননি দলের একমাত্র আক্ষেপ ব্যর্থতার প্রতিশব্দ হয়ে ওঠা সাব্বির।

এতো ঘাটতি থাকার পরেও টাইগারদের অলআউট করার সামর্থ্য হয়নি স্টার্ক-জাম্পাদের। দলীয় সমন্বয় আর সাহসীকতার জোরে শেষ অবধি ৮ উইকেটে, ওয়ানডে ইতিহাসে নিজেদের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর ৩৩৩-এ গিয়ে থামে বাংলাদেশের লড়াই। ফলাফল, অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৪৮ রানের হার। যেখানে অজি বোলারদের বিরুদ্ধে একমাত্র অজেয় যোদ্ধার মতো টিকে থাকেন, তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি হাঁকানো মুশফিকুর রহিম। তবে একটা মুহূর্তে বারবার কেন যেন ভাবনায় নাড়া দিচ্ছিল, আজ এই দলে মোসাদ্দেক আর সাইফুদ্দিন থাকলে লক্ষ্যটা হয়তো ৩৮২ হতো না। তাতে নিশ্চয়ই আরও উজ্জীবিত হয়ে লড়তো বাংলাদেশ। আর যদি হতোও, অজিদের জীবনে চিরদিনের জন্য সম্ভবত এই ‘৩৮২’ সংখ্যাটির নাম হয়ে যেত ‘দুঃস্বপ্নের বাংলাদেশ’!

এই গল্পের শেষটা পরাজয়ে কিন্তু গল্পটা হয়ে থাকলো বিশ্বমঞ্চে টাইগারদের বীরোচিত আরও একটি লড়াইয়ের ইতিহাস হয়ে। সেই সঙ্গে দুটো সত্য সুনিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো- প্রথমত, বাংলাদেশ না হারলে এখন তাকে হারানো রীতিমতো এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। আর দ্বিতীয়ত, সেই দুঃসাধ্য সাধন করে অস্ট্রেলিয়া জানিয়ে দিলো, তারাই এ আসরে ট্রফিটার যোগ্যতম দাবিদার।

বিগত কয়েক বছর ধরেই দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলে যাওয়া বাংলাদেশ এখন আর আপসেট সৃষ্টি করে না। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেট পরাশক্তিদের মতো তারাও এখন ‘অজেয় নয় কিন্তু দুর্জয়’ তত্ত্বের বার্তা দেয়। বিশ্বমানের ক্রিকেটবোদ্ধাদের ধারণাই সত্যি প্রমাণ করে চলেছে টাইগাররা।

বলা হচ্ছিল, এবারের বিশ্বকাপে আপসেট ঘটানো সার্কাসে- সাময়িক বিনোদনের খোরাক জুটাতে আসেনি লাল-সবুজের সেনারা। ব্রিটিশ সিংহের ডেরায় এবার বাঘেরা এসেছে আগ্রাসী থাবায় স্থায়ী স্মৃতি চিহ্ন রেখে যেতে। যাতে বহু বছর পরেও ইতিহাস বলে, ‘এই বনে হানা দিতে এসেছিল একদল রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আর যাওয়ার আগে জানান দিয়ে গেছে যতক্ষণ না লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, ফিরে ফিরে আসবে ওরা হানা দিতে। বাধা দিলেই লড়বে। যত কঠিন হবে প্রতিপক্ষের বাধা ততো প্রাণঘাতি হবে তাদের আগ্রাসন! আর তাদের অর্জনের এমন প্রতিটি গল্পে এক একটি নতুন অধ্যায় লেখা হবে ক্রিকেটের ইতিহাসে। আর এভাবেই একদিন রচিত হবে তাদের বিশ্বজয়ের অমর উপাখ্যান,’দ্য লিজেন্ডস অব দ্য রাইজ অব দ্য টাইগার্স’।