প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত বাংলায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, সিলেটের শাহ জালাল ও মুসল্লিদের হুমকি

বাংলায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, সিলেটের শাহ জালাল ও মুসল্লিদের হুমকি

155
বাংলায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, সিলেটের শাহ জালাল ও মুসল্লিদের হুমকি

রাজর্ষি বন্দোপাধ্যায়

অধুনা বাংলাদেশের এক বিখ্যাত জেলা সিলেট, আরো বিখ্যাত ইসলামের সুফিবাদী শান্তিপূর্ণ বিস্তারের জন্য। শান্তির ধর্মের বাংলায় বিস্তারের এই নিদর্শন সিলেটে রেখে গেছেন শাহ জালাল আর তাই আজকাল রোজার সময় দোকান বন্ধ রাখতে মুসল্লিরা হুমকি দেয়: ‘শাহ জালালের মাটিতে রোজার সময় দোকান খোলা যাবে না’! কে এই হুমকিবাজ মুসল্লিদের অনুপ্রেরণা শাহ জালাল?

শাহ‌্ জালালার জন্মস্থান সম্পর্কে স্বচ্ছ কোন ধারণা পাওয়া যায় না। কোন কোন ইতিহাসবিদদের মতে, উনি ১২৭১ সালে তার্কির কৌনাতে জন্মগ্রহণ করেন, পরে তিনি ইয়ামেন গমন করেন। আবার কারো কারো মতে, তিনি ইয়ামেনেই জন্মগ্রহণ করেন। উনার বাবা জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ রুমির সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় জালাল উদ্দীন বিন মুহাম্মদ, অবশ্য পরে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান শায়েক উল মাশায়েক হযরত শাহ‌্ জালাল মুজাররেদ নামে।

শিক্ষা-দীক্ষা, ধন সম্পদ, উর্বর জমি, জীবন যাপনের মান সবদিক বিবেচনা করলে ভারত বর্ষের খ্যাতি ছিল সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। আরবের নিয়মিত যুদ্ধরত, কঠিন, বেপড়োয়া যাযাবর জীবন, গোত্রে গোত্রে বিবাদময় জীবনের চেয়ে ভারত বর্ষের শান্ত, স্নিগ্ধ, সবুজ, সুশীতল জীবন তাদের কাছে ছিল স্বপ্নরাজ্য। উন্নত ও নিরাপদ জীবন-যাপন এবং অন্ন সংস্থানের লোভেই তারা এসে ভীড় করত ভারতবর্ষে। দেশান্তরি এই সব আরবের লোকেরা ছিল খুবই দরিদ্র শ্রেণির। সমস্যা সমাধানে দুটো সহজ রাস্তা তারা খুঁজে পেয়েছিল, (১) রাজ্য দখল করা, (২)বিনা পয়সায় ধর্ম ব্যবসা করা। তবে ধর্ম ব্যবসার পূর্বশর্ত রাজ্য দখল ও শাসন ক্ষমতার আনুকুল্য।

আরবের মুসলমানদের পক্ষে ভারত বর্ষ দখল করে নিতে খুব একটা বেশী বেগ পেতে হয়নি। হিন্দু রাজাদের আয়েশী জীবন-যাপন, অরক্ষিত রাজ্য সীমান্ত, যুদ্ধ বিদ্যায় অপারদর্শীতা, মার-দাঙ্গা ও পর রাজ্য দখলে সিদ্ধহস্ত আরবের মুসলমানদের পক্ষে ভারত বর্ষ দখল করে নিতে খুব একটা বেশী বেগ পেতে হয়নি। রাজ ক্ষমতার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায়- তথা কথিত ইসলামী পীর দরবেশদের ধর্ম প্রচারের আড়ালে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের দুয়ার সম্পূর্ণ খুলে যায়। হিন্দুদের জাতিভেদ প্রথা, কুসংষ্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ নিম্নবর্ণের নির্যাতিত অশিক্ষিত হিন্দু ও হিন্দুদের নিকট অবহেলিত বৌদ্ধদের কাছে ইসলাম ধর্মের বীরত্ব, সাম্যবাদ ও পরকালের লোভ সম্বলিত নতুন মতবাদ প্রচার করে তাদের অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে সহজেই এক একজন বড় বড় পীর রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মারা যাওয়ার পরেও তাদের অবস্থান হয়েছে আরো শক্তিশালী। অসংখ্য কবরকে মাজারে রূপান্তর করে রমরমা ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অনুসারী আরেক শ্রেণির ধর্ম ব্যবসয়ীরা বাংলাদেশসহ ভারত বর্ষের বিভিন্ন জেলায়।

শাহ্ জালাল বিভিন্ন দেশ পাড়ি দিয়ে অবশেষে স্বপ্নরাজ্য ভারতে আসেন ১৩০০ খ্রীষ্টাব্দে। এরপর চলে যান আজমীরে- সেখানে পান ইসলাম প্রচারক পীর খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈন উদ্দীন হাসান চিস্তিকে। পরে যান দিল্লী, সেখানে সংস্পর্শে আসেন আরেক ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইসলাম প্রচারক নিজাম উদ্দীন আউলিয়ার সাথে। তাদের ইসলাম প্রচারের মহীমা, কলাকৌশল এবং তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি শাহ জালালকে বিশেষ প্রভাবিত করে। সিলেট শাসন করতেন হিন্দু রাজা গৌড় গোবিন্দ। রাজ্যে বাস করতেন সৈয়দ বুরহান উদ্দীন নামের এক মুসলমান। পুত্র সন্তান লাভের খুশিতে গরু জবাই করে ভুরিভোজের আয়োজনে ব্যস্ত, ঠিক সে সময় এক ক্ষুধার্ত বেরসিক চিল এক টুকরা গরুর মাংস চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঠোঁট ফসকে এক টুকরো পড়ে যায় এক ব্রাহ্মণের ঘরে, আবার অন্য এক মতে মাংসের টুকরাটি গিয়ে সোজা পরে গৌড় গোবিন্দের মন্দিরে। ধর্মীয় অপমানে রাজা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে আদেশ দিলেন যখানেই পাও বুরহান উদ্দীনকে ধরে তার হাত দুটি কেটে ফেলো আর তার পুত্র সন্তানকে হত্যা করো। বুরহান উদ্দীন পালিয়ে বিচার চাইল গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহর কাছে। সুলতান এই কথা শুনে তার ভাগ্নে সিকান্দার খান গাজীর নেতৃতে একদল সৈন্যবাহিনী পাঠালেন গৌড় গোবিন্দ শাস্তি দিতে। বিনা উস্কানিতে হিন্দু রাজাকে বিতারিত করে সিলেটে মুসলমানের বিজয় পতাকা ওড়ানোটাই ছিল ফিরোজ শাহর মুখ্য উদ্দেশ্য।

১ম বার যুদ্ধে সিকান্দার খান গোবিন্দের কাছে হেরে যায়। এই পরাজয় সুলতান ফি্রোজ শাহর পক্ষে সহজভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সে বুঝতে পারল গৌড় গোবিন্দের শক্তিকে খাটো করে দেখা তার মোটেই উচিত হয়নি, তাই পরবর্তী আক্রমনের জন্য বেশ আট ঘাট বেঁধেই মাঠে নামল। তার সেনাপতি নাসির উদ্দীনকে আদেশ দিল পুনঃরায় গৌড় আক্রমনের জন্য তৈরী হতে। যুদ্ধ জয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসাবে সুলতান ফিরোজ শাহ্ ইসলামিক চিন্তাবিদ নিজাম উদ্দীনকে আদেশ দিলো সিলেট যুদ্ধে তাকে সাহায্য করতে। নিজাম উদ্দীন অনুরোধ করলো শাহ‌্ জালালকে। শাহ‌্ জালাল তার সাথে ইয়েমেন, তুর্কিস্তান, আলরুম, তুরফান, বুখারা, তিরমিজসহ আরবের বিভিন্ন আঞ্চল থেকে আসা আরো ৩৬০ জন ভাগ্যন্বেষী যুবককে সাথে নিয়ে ফিরোজ শাহর মুসলমান সৈন্য দলের সাথে যোগ দিলো হিন্দু রাজা গোবিন্দকে সিলেট থেকে উৎখাত করার লক্ষ্যে। এই ৩৬০ জনের মধ্য তার ভাগ্নে শাহ্‌ পরানও ছিল।

শাহ জালাল যদি সত্যি কোন পীর, দরবেশ, আওলিয়া বা এ জাতীয় নিরীহ শান্ত গোছের কিছু হত- তাহলে ধারালো তরবারি হাতে আরো ৩৬০ জন সৈন্য জোগাড় করে দখলদার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না বরং বিনা রক্তপাতে কোন সমাধানে আসা যায় কিনা সুলতানকে সে পরামর্শ দিতে পারত। শাহ্‌ জালাল সম্পর্কে বিশ্বাসীদের বিশ্বাস পাকাপোক্ত করতে ধর্ম ব্যাবসায়ীরা সুনিপুণভাবে আরো কিছু ধর্মীয় রূপকথা জুড়ে দিল তার সিলেট দখলের পর। যেমন- গৌড় গোবিন্দ যখন জানতে পারল শাহ জালাল সিলেট আক্রমন করতে আসছে তখন সে সুরমা নদীর ঘাট থেকে সব নৌকা সরিয়ে ফেলে যাতে শত্রু পক্ষ নদী পার হয়ে সিলেটে প্রবেশ করতে না পারে। শাহ্ জালাল ক্যারিশমা দেখানোর সুযোগ পেয়ে গেল। সে জায়নামাযে চড়ে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে দিল মূহুর্তে যা তার গুরু স্বয়ং নবিজীর পক্ষেও কোন দিন সম্ভব হয়নি। নদীর অপর পাড়ে পৌঁছেই সে বিকট শব্দে আযান দিয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ শুরু করল, তাতেই গৌড় গোবিন্দের প্রাসাদ ধসে ধসে পড়তে শুরু করল। আযানের শব্দে ধসে পড়ল না আক্রমনের তীব্রতায় ধসে পড়ল তা কেবল বুদ্ধিমান পাঠকই বুঝবে! শুরু হল দখলদার বনাম অস্তিত্ব রক্ষার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ তাতে গৌড় গোবিন্দ পরাজিত হয়ে সিলেট ছেড়ে পালিয়ে গেল।

সিলেট এলো মুসলমানদের দখলে। পক্ষান্তরে, বলা চলে শাহ্ জালালের দখলেই সেই সাথে পূর্ণ হল আজমীরের মঈন উদ্দীন হাসান চিস্তি বা দিল্লীর নিজাম উদ্দীন আউলিয়ার মত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন। যুদ্ধ জয়ের পর সে তার ৩৬০ জন সহযোগীকে বিয়ে করে সংসারী হওয়ার নির্দেশ দেয়। তখনো ইসলামের প্রচার প্রসার সিলেটে তেমন শুরু হয়নি। তাই তারা কাদেরকে কিভাবে বিয়ে করেছিলেন, তা সহজেই বোঝা যায়!

একজন যদি একটা করেও বিয়ে করে তাহলে ৩৬০ জন হিন্দু-বৌদ্ধ মেয়ের গায়ে ইসলামী আঁচড়ের দাগ পড়েছিল নিঃসন্দেহে…!