প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জেলা ৫ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগ-ভাটোয়ারা করলেন আ’লীগ নেতারা!

৫ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগ-ভাটোয়ারা করলেন আ’লীগ নেতারা!

117
৫ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগ-ভাটোয়ারা করলেন আ'লীগ নেতারা!

মামুন খাঁন চট্টগ্রাম: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ৫ কোটি টাকার কাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ রেখে সুকৌশলে দলীয় নেতাদের ভাগ ভাটোয়ারা নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এডিপি বরাদ্দের এ টেন্ডার হজম করার পর ঢেঁকুর তুলেছে পরবর্তী কাজের টেন্ডার ও ভাগিয়ে নিতে এমন অভিযোগ স্বয়ং সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ও তাদের নিয়ন্ত্রিত পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। এমনকি গোপন কমিশন হারে পুর্বে পরিকল্পিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদার ছাড়া কাউকে টেন্ডার ড্রপ করতে দেয়নি। ফলে ক্ষমতাসীন দলের কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে যুবলীগ, শ্রমিকলীগ, স্বেচ্ছোসেবকলীগ ও ছাত্রলীগের একাংশ টেন্ডার বাক্স নিয়ন্ত্রিত রেখে হজম করে নিয়েছে ৫ কোটি টাকার টেন্ডার।

অভিযোগ রয়েছে, মূলত প্রশাসনকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ভূমিমন্ত্রীর সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ম রক্ষার পাঁতানো টেন্ডার দাখিল করে টেন্ডারটি ভাগিয়ে নিতে। আগ্রহী একাধিক দরপত্রদাতাকে সিডিউল ক্রয় করার সুযোগ দিলেও কাউকে জমা দিতে দেয়নি বলে বিষয়টি শর্তসাপেক্ষে স্বীকার ও করেছেন উপজেলা প্রকৌশলী জয়শ্রী দে। এ অফিসের সহকারিরা নাম না প্রকাশ শর্তে স্বীকার করেছেন তাঁরা অপারগ ছিল দলীয় নেতাদের চাপে। এমনকি আগামীতে তাঁরা ই-টেন্ডার পদ্ধতি করার আবেদন ও করেছেন নির্বাহী অফিসারের কাছে।

এতে একদিকে সরকার বহু টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কেন না যারা সিডিউল কিনেছেন তাদের কে ড্রপ করতে দেয়নি। আনোয়ারার ঠিকাদার কাশেম বলেন, দলীয় নেতাদের উদর ভরাতে আইওয়াশ টেন্ডার এটি। কেননা মন্ত্রীর একজন এপিএস ও কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের নামে প্রভাব কাটিয়ে, এমনকি ভূমিমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে এক শ্রেণীর সিন্ডিকেট প্রায় সময় এমন পরিস্থিতি তৈরী করলে কর্ণফুলী প্রশাসন অসহায় হয়ে পড়ছে। স্বয়ং প্রকৌশলী কর্মকর্তা জয়শ্রী দে বিরক্ত ভাবে এসব কথা জানান।

এ যেনো একটি নিয়ন্ত্রিত টেন্ডার বানিজ্যের মহড়া কর্ণফুলীতে। এডিপি বরাদ্দের ৫ কোটি টাকার কাজ ছিনিয়ে নিতে এখানে পাঁতানো টেন্ডার হয়েছে। আসলে এ নিয়ন্ত্রণের রিমোট কার কাছে এবং দলীয় নেতাকর্মীরা কেনইবা বার বার প্রশাসনের কাছে মন্ত্রীর নাম এপিএসের নাম ভাঙ্গাচ্ছে তা বোধগম্য নয় সাধারণ জনগণের। তাহলে কি জনগণের সামনে চোখে ধুলো টেন্ডার প্রক্রিয়া দেখিয়ে এডিপি বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ এর চিন্তা রয়েছে নেতাদের।

সূত্র জানায়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলা কতৃক জাতীয় দৈনিক ভোরের কাগজে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি ০১/২০১৮-২০১৯ইং প্রকাশ করা হয়। এতে কর্ণফুলী উপজেলাধীন ২০১৮-২০১৯ইং অর্থবছরে উন্নয়ন তহবিল (রাজস্ব) এডিপি এর আওতায় সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৩৪টি প্যাকেজে প্রায় ৯৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এলজিইডি’র হালনাগাদ নবায়নকৃত তালিকাভুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নিকট (গত ২৭ মার্চ প্রায় ৫ কোটি টাকার) দরপত্র আহ্বান করলেও নিজেদের লোক ছাড়া কাউকে অংশ গ্রহণ করতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রথমে দরপত্র দাখিলের সময় ছিল সোমবার ২২ এপ্রিল। দরপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ছিলো ২৩ এপ্রিল কিন্তু নানা অভ্যন্তরীণ কারণে সিডিউল কেনাবেচার সময় বাড়িয়ে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তাও মানা হয়নি।

দরপত্রে কারা সিডিউল কিনতে পারবে আর পারবেনা এমন কোন শর্ত কোথা ও উল্লেখ না থাকলেও কর্ণফুলী উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে থাকা স্ব স্ব দলীয় ঠিকাদারকে (যারা তাদের গোপন শর্তে রাজি) তাদের নিজস্ব ইউনিয়নে সিডিউল কিনতে বাধ্য করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়।

সরকারী বিধি বিধান মতে কোন জনপ্রতিনিধি ঠিকাদারি কাজ করতে পারবেনা মর্মে আইনে বাধা থাকলেও কর্ণফুলীর বেলায় তা মানা হচ্ছেনা। এখানে প্রতিটি জনপ্রতিনিধিরা তাদের নামে বেনামে একের অধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স তৈরি করেছেন। অনেকে নিজের লাইসেন্স এর নাম পরিবর্তন করে অন্যের নামে দিয়ে কৌশলে ভাগ ভাটোয়ারায় অংশ নিচ্ছেন বলে জানা যায়। জনপ্রতিনিধিরা ঠিকাদারি করার সুযোগ না থাকলেও প্রশাসন তাতেও কোন ব্যবস্থা নিতে পারছেনা।

অসমর্থিতসূত্রে খবর পাওয়া যায়, অনেক আগেই শহরের লাগোন্ডোলা হোটেলে গোপন বৈঠকে আলোচনা হয় স্থানীয় কর্ণফুলী উপজেলার ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তাদের বলয়ে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজগুলো পাইয়ে দেওয়ার জন্য শর্তে নানা সুযোগ সুবিধার বিষয়ে সিন্ডিকেট গ্রুপের। তবে এ বিষয়ে কেহ মুখ খুলছে না।

সংশ্লিষ্ট দরপত্র সূত্র জানা যায়, ৩৪ টি প্যাকেজে ৯৩ টি উন্নয়নমূলক প্রকল্পে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। যার মধ্যে ৫৬ লক্ষ টাকার কাজ সরাসরি বাস্তবায়ন করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)।

তথ্যমতে, এতে চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ২৩টি প্রকল্পে ৭৯ লাখ ১৬ হাজার, চরলক্ষ্যা ইউনিয়নে ২০টি প্রকল্পে ৭৫ লাখ ৬৬ হাজার, জুলধা ইউনিয়নে ১৯টি প্রকল্পে ৯৬ লাখ ২১ হাজার পাঁচশ, শিকলবাহা ইউনিয়নে ১৩টি প্রকল্পে ৮৭ লাখ ৬১ হাজার, বড়উঠানে ১৭টি প্রকল্পে ১কোটি ৪৪ লাখ ৫ হাজার টাকা। সর্বমোট পিআইসি সহ ৫ কোটি টাকার কাজের টেন্ডার।

এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা সিন্ডিকেটটি নিজেদের মধ্যে যোগসাজোসে পরিকল্পিতভাবে দরপত্র দাখিল করে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয় ৫ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার। ক্ষমতাসীন দলের এমন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ২০১৭ সালেও কর্ণফুলীতে প্রায় ৯ কোটি টাকার এলজিইডি’র কাজ বুঝিয়ে না দিয়ে পলাতক রয়েছে মেসার্স এমডি সেলিম এন্ড ব্রাদার্স নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সহ ৯টি অন্যান্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যাদের বিরুদ্ধে এখনো প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অনেকে আবার সরাসরি বলেন এ বিষয়ে নাকি মন্ত্রীর সাথে কথা বলতে। আমাদের প্রতিবেদক মন্ত্রীর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে মন্ত্রীর পিএস বাবু মন্ত্রী মিটিং এ ব্যস্ত বলে ফোন কেটে দেন।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বিভাগের কর্ণফুলী উপজেলা প্রকৌশলী জয়শ্রী দে বলেন, ‘আমাদের করার কিছু নেই। টেন্ডার প্রক্রিয়ার দিন কয়েকজন নেতা অফিসে বসা ছিল।’