প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত রোজা ও অটোফেজি: মুমিনীয় মিথ্যাচার

রোজা ও অটোফেজি: মুমিনীয় মিথ্যাচার

706
রোজা ও অটোফেজি: মুমিনীয় মিথ্যাচার

সেজান মাহমুদ

ধর্মীয় কারণে উপোস থাকা প্রায় সকল ধর্মের মধ্যেই আছে। সনাতন হিন্দু ধর্ম, খ্রিশ্চিয়ানিটি, বৌদ্ধ, জুডাইজম, ইসলামসহ সকল প্রধান ধর্মের মধ্যে এটা বিদ্যমান। তবে মুসলমানদের রোজার মাস পালন উল্লেখযোগ্য একটা ধর্মীয় রিচুয়াল। গ্রীক অর্থোডক্স খ্রিশ্চিয়ানেরা বছরের ১৮০-২০০ দিন উপোস থাকে। কোন কোন সময় টানা ৪৮ দিন এই ব্রত পালন করে। এই ধর্মীয় রিচুয়াল পালনে স্বাস্থ্যের উপকার না অপকার হয় তা নিয়ে বিস্তর আগ্রহ মানুষের।

কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানভিত্তিক বা গবেষণা ভিত্তিক লেখার চেয়ে অনুমান ভিত্তিক, এমনকি বিজ্ঞানের আবিস্কারের কু-ব্যবহার করে সত্যের মধ্যে মিথ্যা ঢুকিয়ে নানান প্রচারণা চালানো হয়। আসলে লম্বা সময় না খেয়ে বা পান না করে থাকলে শরীরের ক্ষতি বা উপকার হয় কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেবার উদ্দেশ্যে এই লেখা না। কেউ বিনা যুক্তিতে বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করতে পারেন, তাতে কোন সমস্যা বা আপত্তি নেই, কিন্তু বিজ্ঞানের অপব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অধিকার কারো নেই।

রোজার মাসে একটি পোস্ট সব সময় দেখা যায়। জাপানের বিজ্ঞানী রোজা নিয়ে গবেষণা করে অটোফেজি আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে। এই নিয়ে আগেও লিখেছি। সেখান থেকে অংশ বিশেষ তুলে দিচ্ছি-

“বাংলাদেশে মানুষকে যে কোন কিছু গেলানো যায় শুধু সঙ্গে কায়দা করে ‘ইসলামে বা কোরানে কতো আগেই বলা হয়েছে’ বলে। আরিফ আর হোসেন নামের একজন দেখলাম রোজার ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে মানব শরীরের “অটোফেজি’ টেনে এনেছেন; দেখুন ২০১৬ সালে অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে জাপানিজ বিজ্ঞানী ইউয়োসিনরি ওসুমি নোবেল পুরস্কার পেলেন। আর এর কথা কোরানে ১৪০০ বছর আগেই বলা হয়েছে। এর সম্পর্ক কোথায়? রোজা রাখলে শরীরে অটোফেজি হয়। সেখানে হাজার হাজার লাইক।

সবার আগে অটোফেজি কি একটু বলি। এটা হলো অনেকটা শরীরের নিজের কোষ যখন ভেতরের বর্জ পদার্থ খেয়ে ফেলে এবং কোষগুলো নতুন ভাবে উজ্জীবিত হয় সেই প্রক্রিয়া। অনাহারে থাকলে এটা ঘটে। সুতরাং আরিফ সাহেব জানালেন, দেখুন রোজা রাখা কতো ভাল, কতো আগেই বলা হয়েছে ধর্মগ্রন্থে। ব্যস, এই হলো ধর্মকে গেলানোর সহজ নেরেটিভ।

এই মানুষগুলোকে কীভাবে বোঝাবেন যে প্রথমত রোজা রাখা বা উপোস করা শুধু ইসলামে না পুর্বাপর সব ধর্মেই প্রচলিত ছিল। হিন্দুরা মুনি-ঋষীরা উপোস করতেন নিদেন পক্ষে ৫০০০ বছর আগে থেকে। তারও আগে মধ্যপ্রাচ্য এলাকায় খাবারের সংকট থাকতো জন্যে মানুষজন খাবার বাঁচাতে উপোস থাকতেন। সুতরাং রোজা রাখার যদি উপকারিতা থাকে তাঁর কৃতিত্ব একা মুসলমানদের না। ঐতিহাসিকভাবে অন্য সব মানবগোষ্ঠীরও। যদিও মেডিক্যাল সায়েন্সের মতে লম্বা সময় একদম কিছু না খেয়ে থাকা, বিশেষ করে শরীরকে পানিশূন্য করার অপকারই সবচেয়ে বেশি। সেদিক থেকে অন্যান্য ধর্মের প্রথায় যেখানে ফলমূল বা পানি পান করা যায় তা-ই বরং স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা।

এবার আসি অটোফেজি প্রসঙ্গে। অটোফেজি কি শুধু মানুষের হয়? বিবর্তনের সূত্র ধরে তা সেই উদ্ভিদ থেকে শুরু করে ছোট প্রাণীদের মধ্যেও দেখা যায়। অর্থাৎ এটা একেবারেই বিবর্তনের প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বেশি অটোফেজিও শরীরের জন্যে ক্ষতিকর হতে পারে। তাহলে বিবর্তনের একটি বিষয়কে অহেতুক, অযৌক্তিকভাবে ধর্মের সঙ্গে জড়ানো কেন?”

লম্বা সময় না খেয়ে থাকলে বা পানি পান না করলে কী কী শারীরিক পরিবর্তন হতে পারে তা নিয়ে গবেষণায় মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে। তবে কতগুলো জৈবিক পরিবর্তন সাধারণভাবে দেখা যাবেইঃ

এক। লম্বা সময় না খেয়ে থাকা, পানিশূন্য থাকা, ওজন কমানোর জন্যে না খাওয়া (অনেকেই রোজা রাখেন ওজন কমাতে) শরীরের মেটাবোলিজম কমিয়ে দেয়। অনেকটা গুহামানবের অবস্থানে চলে যায় শরীর যখন খাদ্যের সংকট ছিল। শরীরের চর্বি যেমন কমে, তেমনি লীন বা হালকা মাংসপেশি কমে যায় পাঁচ শতাংশের মতো। এই মাংসপেশি কমা কিন্তু ভাল না। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসপেশি কমে যাওয়া অর্থই হলো গ্লুকোজ মেটাবোলিজম কমে যাওয়া। পানি কম থাকায় শরীরের মিনারেলে পরিবর্তন ঘটে এবং অর্গান গুলো ২০% ছোট হয়ে যায়। এগুলোর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব মারাত্নক ক্ষতিকর। রোজা রাখলে যে পানি শূন্যতা হয় তা থেকে রক্তে ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়া (যা থেকে গাউট হতে পারে), সার্কুলেটরি ইন্সাফিশিয়েন্সি, হাড়ের সমস্যা (মিনারেল কমে যাওয়া) হয় বা হতে পারে তা মুসলমান প্রধান দেশে গবেষণায় পাওয়া গেছে।

দুই। উপরের এগুলো গেল সুস্থ মানুষের জন্যে। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্ত চাপ আছে বা অন্য কোন অসুখ আছে, বয়স বেড়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রে বড় রকমের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ছাড়া কোন ভাল ফল তেমন পাওয়া যায় নি।
আরেকটা কথা বলি, যদি রোজার স্বাস্থ্য ফজিলত এতোই হতো তাহলে তো মুসলিম প্রধান দেশগুলোর গড় আয়ু সবচেয়ে বেশি থাকার কথা; অথচ মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে মানুষের গড় আয়ু ৬২ আর অমুসলিম জাপানিজদের ৮২.৯ বছর!!

সুতরাং যা বলতে চাচ্ছি তা হলো, অবৈজ্ঞানিকভাবে রোজার উপকার নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াবেন না। যারা রোজা রাখবেন তারা জানবেন যে শরীরের আসলে অনেক ক্ষতি হতে পারে। নিজেকে প্রচুর পানি পানের মাধ্যমে রিহাইড্রেটেড রাখুন। স্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর খাবার খান। সচেতন থাকুন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো ‘সিয়াম সাধনা’ বা নিজেকে সংযত রাখার দায়িত্ব রোজাদারের। তার জন্যে অন্য ধর্মের মানুষ বা যিনি রোজা রাখবেন না তাদের জীবন দূর্বিসহ করার অধিকার কারো নেই। খাবারের দোকান বন্ধ রেখে কেন আপনাকে রোজা রাখতে হবে? আপনার সংযমের তাহলে কী মূল্য আছে?

সকলেই সুস্থ ও আনন্দে থাকুন।

ভিডিও: