প্রচ্ছদ রাজনীতি তবে কি জামায়াত বদলাবে না?

তবে কি জামায়াত বদলাবে না?

53
তবে কি জামায়াত বদলাবে না?

কথা ছিল জামায়াত ইসলাম তার নাম পরিবর্তন করবে। নতুন রূপে সাজাবে দলকে। একাত্তরে তারা যে অপকর্ম করেছিল তাদের উত্তরসূরীরা সেই অপকর্মের দায় নিবে না।

এমনও কথা ছিল জামায়াত ইসলাম ২৬শে মার্চের মধ্যে তাদের অতীতের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইবে। কিন্তু জামায়াত যে কখনো বদলায় না, তার আরেকবার প্রমাণ হলো। জামায়াতের এই সবই ছিল দুটি কারণে। প্রথমত, জামায়াত যে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি সেখান থেকে জনগণের দৃষ্টি আড়াল করার জন্য। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে যে জামায়াতের ভরাডুবি হয়েছে সেখান থেকে দলের নেতাকর্মীদের যে হতাশা তা থেকে চাঙ্গা করার জন্য। সেই হতাশা থেকে দলকে আলগা করার জন্য। এরকম কথাবার্তা দলের মধ্যে শুরু হয়েছিল। কিন্তু জামাত যে আসলে বদলাবার নয়, সেটা আরেকবার প্রমাণ হলো।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের জামায়াত ২২টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিল। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত অধিকাংশ নেতারা দণ্ডিত হয়েছেন, তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। এ অবস্থায় দলটি ছিল বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত। এর মধ্যে তাদের এতগুলো আসলে লড়াই ছিল বিস্ময়কর। জামায়াতকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বিএনপি সহায়তা করেছিল বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে। কিন্তু ওই নির্বাচনে জামায়াতের ভয়াবহ ভরাডুবি হয়। প্রথমবারের মতো জামায়াতের সবগুলো প্রার্থীর জামানতই বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। এই প্রেক্ষিতে জামায়াতের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়।

জামায়াতের অপেক্ষাকৃত যারা তরুণ তারা দাবি করেন যে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ এবং স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকার জন্যই সাধারণ মানুষ জামায়াতের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে জামায়াতকে ঢেলে সাজাতে হবে। এই প্রেক্ষিতে লন্ডনে পলাতক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেন। তার পথ ধরে জামায়াতের আরো দু-একজন তরুণ নেতা পদত্যাগ করেন এই ইস্যুতে। এই প্রেক্ষিতে জামায়াতের ভিতর একটি কমিটি গঠন করা হয়, সেই কমিটি থেকে বলা হয় জামায়াতের নাম পরিবর্তন করবে এবং একাত্তরের ভূমিকার জন্য তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে।

কিন্তু একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে যে, জামায়াতের মধ্যে এখনো স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী শক্তিশালী। এই গোষ্ঠীই জামায়াতকে নিয়ন্ত্রণ করে। এজন্য জামায়াতের নাম পরিবর্তন বা একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কোনটাই জামায়াত শেষপর্যন্ত করছেন না।

দ্বিতীয়ত, জামায়াত যদি তার অবস্থান পরিবর্তন করে তাহলে দেশে যে স্বাধীনতা বিরোধী একটি সমর্থক গোষ্ঠী আছে, যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতা বিরোধীতা করেছিল, যাদের সংখ্যা মোটেও কম নয়, সেই গোষ্ঠীটার কোন রাজনৈতিক দল থাকে না। এজন্যই আন্তর্জাতিক মহল যারা জামায়াতের জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ এবং স্বাধীনতা বিরোধী অবস্থাকে প্রশ্রয় দেয়। তারা চায় জামায়াত যেন আগের অবস্থানে থাকে।

বিএনপিও মনে করে যে, বাংলাদেশে ভারত বিরোধী এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের যে মোর্চাটা তা জামায়াত যদি না থাকে তাহলে বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়বে। এজন্য বিএনপিও জামায়াতকে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য একটি চাপ সৃষ্টি করেছে। এরফলে জামায়াত তার আগের অবস্থানে রয়ে গেছে। স্বাধীনতা বিরোধী যে অবস্থানে ছিল, সেই অবস্থানেই রয়ে গেছে।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে যে, জামায়াত যেন তার অবস্থান পরিবর্তন না করে সেজন্য জামায়াতের উপর বিএনপির একটি অংশ যারা বিএনপিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষক এবং ধারক বাহক হিসেবে পরিচিত, তারা জামায়াতের উপর রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে জামায়াত তাদের অবস্থান থেকে সরে না দাঁড়ায়। ৩ সদস্যের যে কমিটি জামায়াতকে সংস্কার এবং নাম পরিবর্তন করে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করার সুপারিশ করেছে। সেই কমিটি সুপারিশ করেছে যে, জামায়াতের বর্তমান বাস্তবতায় নাম পরিবর্তন করা অনুচিত হবে এবং তাতে জনগণের মধ্যে ভুলবার্তা যাবে।

একই সঙ্গে তারা এটাও সুপারিশ করেছে যে, জামায়াতের যে বিপুল সংখ্যক সমর্থক এবং কর্মী আছেন তাদেরকে পর্যায়ক্রমে সংগঠিত করতে হবে। অর্থাৎ জামায়াত যেটা প্রমাণ করলো, জামায়াত যে স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দল ছিল সেই নীতি থেকে তারা এখনো সরে আসেনি। একাত্তরে তারা যে ভূমিকায় ছিল তারা এখনো সেখানেই আছে।

বাংলাদেশকে আরেকটি পাকিস্তান করার যে তাদের উদ্দেশ্য সেই অবস্থান তাদের মোটেও পরিবর্তন হয়নি। এরফলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার যে দাবি, তা আবার নতুন করে ওঠা উচিত বলে সচেতন মহল মনে করছেন। জামায়াতের নিষিদ্ধকরণের ইস্যুটিকে দ্রুতই একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করা প্রয়োজন বলে স্বাধীনতার পক্ষের লেখক, বুদ্ধিজীবি এবং মুক্তিযোদ্ধারা মনে করছেন।