প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য সবচেয়ে বেশি অধিকার বঞ্চিত সৌদি নারীরা

সবচেয়ে বেশি অধিকার বঞ্চিত সৌদি নারীরা

40
সবচেয়ে বেশি অধিকার বঞ্চিত সৌদি নারীরা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২০১৫ সালে প্রার্থী হয়েছিলেন নাসিমা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ব্যালট থেকে তার নাম কেটে দেয়। নারীদের ইতিহাস বিষয়ক অধ্যাপক হাতুন। সৌদি আরবে প্রথম নারী হিসেবে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পান তিনি। লওয়াজাইন সম্প্রতি সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য একটি বেসরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য নিবন্ধনের চেষ্টা করেন। কোনো কারণ ছাড়াই ২০১৪ সাল থেকে তিনি কারাগারে।

বিশ্ব নারী দিবসে সৌদি আরবে যেসব নারী বর্তমানে তাদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সচেতন হতে গিয়ে কারাভোগ করছেন তাদের কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে নারীর অধিকার রক্ষায় ও দেশটির পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে তাদের জেল খাটতে হচ্ছে।

তাদের মধ্যে অন্তত দশজন নারী অধিকার কর্মী ও তাদের কিছু পুরুষ সমর্থকও জেলে। কারণ সৌদি আরবের রাজতন্ত্রের যে অবস্থা তার কবলে পড়েই তাদেরকে জেল খাটতে হচ্ছে। গত পহেলা মার্চ সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় আইনি সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে এসব নারীর বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হবে এবং তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হবে।

গত বছরের জুন থেকে নারীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ এই অভিযান শুরু করেছে দেশটি। যখন একইসঙ্গে সৌদি সরকার নারীদের গাড়িচালক হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। কর্তৃপক্ষ এসব নারী অধিকারকর্মীকে গেল বছরের মে মাস থেকে গ্রেফতার করা শুরু করে। সেইসব নারীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে তাদেরকে পরিবার কিংবা আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা এসব নারীদের গ্রেফতার করে জেলে পুরে দেয়া সৌদি সরকারের বর্বর মানসিকতার প্রতিফলন। এসব নারী বিরামহীনভাবে তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। তারা ভাবেন যদি সৌদি রাজতান্ত্রিক সরকার তাদের এমন প্রচারণার ফলে আগের অবস্থান থেকে সরে আসে তাহলে সেটা পরবর্তী সংস্কার কাজের জন্য সহজ হয়ে উঠবে।

কিন্তু সৌদির সরকারি কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটাকে দেখেছে অন্যভাবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো সৌদি আরব কোনো গণতান্ত্রিক দেশ নয়।এমন একটি রাজতান্ত্রিত ব্যবস্থা সেখানে চালু আছে যাতে করে দেশটির নেতারা মানুষের যে স্বাভাবিক অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয় না। অল্প কিছু বিষয়ে ছাড় দেয়া হলেও তা মানুষের সার্বজনীন অধিকারের সঙ্গে তুলনা করলে অনেকটা আদিম।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে আটক নারীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব যেসব নির্যাতন চালায় তার বর্ণনা দিয়েছেন। তারা বলে, সৌদি আরবের তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার এসব নারীদের অমানবিক নির্যাতন করে। অন্তত চারজন নারী অধিকারকর্মীকে ইলেকট্রিক শক, চাবুক মারা, যৌন নির্যাতনসহ শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করা হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানায়, কথিত তদন্তের পর প্রত্যেক নারীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেকে হাঁটতেও পারেন না, হাত নাড়াচাড়া করতে পারেন না। তাদের মুখে আর গলায় আঘাত করায় তা রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। কথাও ঠিকমতো বলতে পারে না। তাদের অনেকে এসব নির্যাতন সইতে না পেরে বহুবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নতুন কিছু কিছু সংস্কার করেছেন। এজন্য অনেকে তার প্রশংসাও করেন। যখন থেকে তিনি যুবরাজের পদে আসীন হয়েছেন, সরকার নারীদের জন্য কিছু অধিকারের বিষয়ে ছাড় দিয়েছে। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে, গাড়ি চালানো, খেলায় অংশগ্রহণ, সিনেমা হল ও বিনোদন কেন্দ্র খোলা।

কিন্তু সৌদি আরবে প্রতিদিন নারীরা যেভাবে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তার সঙ্গে তুলনা করলে এসব বিষয় কিছুই না। যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো প্রত্যেক নারীর একজন পুরুষ শাসক থাকা। যা এখনো বহাল তবিয়তে আছে। আর এমন পদ্ধতির কবলে পড়ে প্রত্যেক সৌদি নারীর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাপিত জীবন নিয়ন্ত্রণ করে একজন পুরুষ।

প্রত্যেক সৌদি নারীর অবশ্যই একজন পুরুষ অভিভাবক তথা শাসক থাকতে হবে। স্বাভাবিকভাবে সেটা হয় তার বাবা নয়তো স্বামী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাসকের স্থানে বসেন ভাই এমনকি নিজের ছেলে। সেই কথিত অভিভাবকের হাতে এমন ক্ষমতা থাকে যে নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটাও তিনিই নেন।

দেশটির সরকারি আইন অনুযায়ী একজন নারীকে দেশের বাইরে বেড়াতে যেতে, পাসপোর্ট করতে হলে, বিয়ে করতে চাইলে অথবা তাকে জেল থেকে মুক্ত হতে হলে একজন পুরুষের অনুমতি লাগে। আর এই অভিভাবকত্বের সীমা হচ্ছে একজন নারী জন্মাবার পর থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত। বলতে গেলে, সৌদি আরবে একজন নারীকে স্থায়ীভাবে একজন শিশুর মতো করে বিবেচনা করা হয়।

সৌদি আরবের রাজতন্ত্র এই উদ্ভট পুরুষ শাসক কিংবা কথিত অভিভাবক বিষয়ক পদ্ধতি থেকে কখনোই সরে আসেনি। দেশটিতে নারী অধিকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অন্তরায় এই অভিভাবকত্ব পদ্ধতি। যার কারণে একজন নারী তার স্বাভাবিক অধিকার অর্জন ও জীবন যাপনের সক্ষমতাও অর্জন করেনি কখনো।

সৌদি সরকারের একটি মোবাইল অ্যাপ আছে যার মাধ্যমে একজন পুরুষ অভিভাবক তার অধীনে থাকা নারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রন করতে পারেন। যার কারণে সবসময় নারীদের একটা নজরদারির মধ্যে থাকতে হয়। যা তাদের সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগের পথেও বাধা তৈরি করে।

সম্প্রতি রাহাফ নামের একজন নারী তার পরিবারের সঙ্গে বিদেশে গিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে অনেক নাটকীয়তা শেষে কানাডায় আশ্রয় পেয়েছেন। তবে যারা দেশটি থেকে পালাতে চান তাদের সবার ভাগ্যে এমন সফলতা আসে না।

আমরা জানি না সৌদি আরবের নারীদের এই অধিকার কোনোদিন আদায় হবে কি না। কেননা যারা নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেছেন তাদেরকে কারাবন্দি করে নির্যাতন করা হচ্ছে। অনেকে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এখন কারাবন্দি নাসিমা ও লওজায়িনরা। তারা কি কখনো জেল থেকে মুক্ত হবেন?

সূত্র: মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অস্ট্রেলিয়ার পরিচালক এলাইন পিয়ারসনের লেখা কলাম। সিডনিভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক লয়ি ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত কলামটি ইংরেজি থেকে অনূদিত।