প্রচ্ছদ অর্থ-বাণিজ্য বিমানে ১১ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুদক

বিমানে ১১ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুদক

32
বিমানে ১১ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুদক

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুর্নীতির উৎস আট খাত। আর সিভিল এভিয়েশনের ১১ খাত দুর্নীতির উৎস। এমন তথ্য দিয়ে এসব খাতে দুর্নীতি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে ১৯ দফা সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এই সুপারিশগুলো গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর কাছে হস্তান্তর করেছেন দুদকের কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান। এ সময় বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক উপস্থিত ছিলেন।

সরকারি সেবা প্রদানের প্রক্রিয়াকে পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে ঘুষ, দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতা এবং হয়রানি থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতে দুদক সরকারি ২৫টি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ২৫টি টিম গঠন করেছিল। দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বিমানের আটটি এবং সিভিল এভিয়েশনের ১১টি খাত সুস্পষ্টভাবে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়মের উৎস। বাংলাদেশ বিমানের যে আটটি খাতকে দুর্নীতির উৎস হিসেবে দুদক চিহ্নিত করেছে সেগুলো হচ্ছে- বিমান ক্রয় ও বিমান লিজ খাত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস সিস্টেম, কার্গো এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট খাত এবং বিমানের ফুড ক্যাটারিং খাত।

সুপারিশ জমা দিয়ে দুদক কমিশনার বলেন, এটা সবাই জানেন যে, এই খাতগুলোতে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং হয়রানি একেবারে দৃশ্যমান। তিনি বলেন, আমাদের টিম বিভিন্নভাবে এ খাতগুলো সম্পর্কে যেসব তথ্য পেয়েছে এবং সংগ্রহ করেছে তাতে দেখা গেছে, এসব খাতে ঘুষ লেনদেন, দুর্নীতি ও অনিয়ম হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে বিমান ক্রয় এবং বিমান লিজের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে। একইভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহোলিংয়ের ক্ষেত্রে জিনিসপত্র ক্রয় করতে গিয়েও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। গ্রাউন্ড সার্ভিসের কথা উল্লেখ করে দুদক কমিশনার বলেন, এখানেও দুর্নীতি শিকড় পুঁতেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেলে দেখা যায়, আমরা ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্টে পৌঁছার আগেই লাগেজ পৌঁছে যায়। কিন্তু আমাদের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কার্গো এক্সপোর্ট ও ইমপোর্ট খাতেও নানাভাবে দুর্নীতি হচ্ছে। বাদ যায়নি বিমানের ফুড ক্যাটারিং খাতও। অথচ এ খাতে অনেক সম্ভাবনা ছিল। দুদকের অনুসন্ধানে বিমানের টিকিট বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টিকিট কাটতে গেলেই বলা হয় টিকিট নেই।

আবার কারও রেফারেন্স বা বিশেষ কেউ গেলে টিকিট পাওয়া যায়। এখানে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়। এমন তথ্য দিয়েছেন দুদকের কমিশনার। বিমানের সার্ভিসের ক্ষেত্রেও হয়রানির চিত্র তুলে ধরা হয়। বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সেবাটা এক রকম, আবার বিশেষ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরেক রকম। এটা বিমানের জন্য ক্ষতিকর। সবার জন্য সমান সুযোগ এবং সেবা থাকা উচিত।

সিভিল এভিয়েশনের দুর্নীতি ১১ খাতে: শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসই নয়, দুদকের টিম সিভিল এভিয়েশনের ১১টি খাতে দুর্নীতি হয় এমন তথ্যও পেয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে সিভিল এভিয়েশনের যে ১১টি খাতে দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে সেগুলো হচ্ছে- ক্রয় খাত, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ ও উন্নয়নমূলক কাজ, বিমানবন্দরের স্পেস/স্টল ও বিলবোর্ড ভাড়া, কনসালট্যান্ট নিয়োগে দুর্নীতি এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে দুর্নীতি হয়। এই খাতগুলোর চিত্র তুলে ধরে দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান এসব খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে ১১টি সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, এই খাতগুলোর প্রত্যেকটিতেই নানাভাবে দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে দুদকের টিম। মালপত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে মোটা অংকের দুর্নীতি হচ্ছে। একইভাবে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি হচ্ছে। প্রত্যেকটি নির্মাণ প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কাজে দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে জানিয়ে দুদক কমিশনার বলেন, এ খাতগুলোর দুর্নীতির কথা সবাই জানে। অনুসন্ধানেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে।

বিমানবন্দরের ডিউটি ফ্রি শপ ভাড়া দেওয়া, বিলবোর্ড ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রেও মোটা অংকের আর্থিক অনিয়ম হয়। আরেকটি খাত হচ্ছে কনসালট্যান্ট নিয়োগ, যেখানে অপ্রয়োজনীয় কাজেও মোটা অংকের টাকা দিয়ে কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা হয়। এর পেছনেও আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়ম কাজ করে। দুদক কমিশনার বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের এই ১৯টি খাতের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, এসব খাতে দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে না। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর হাতে ১৯টি সুপারিশ তুলে দিয়ে এসব খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান।

এ সময় প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, আমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির যে ঘোষণা দিয়েছেন সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের বিষয়ে দুদক যে ১৯টি খাতের চিত্র তুলে ধরে ১৯টি সুপারিশ করেছে সেগুলোর বিষয়ে আমরা কার্যকর ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব। কোনো খাতেই ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মকে কোনোরকম আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, শুধু দুর্নীতি নয়, যারা কাজে অবহেলা করছেন বা করবেন তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রসঙ্গত, তিতাস গ্যাস, বাংলাদেশ রেলওয়ে, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বিমান, কাস্টমস, ভ্যাট অ্যান্ড এক্সাইজ, আয়কর বিভাগ, ওয়াসা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, সাব-রেজিস্টার অফিসসহ রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশন, গণপূর্ত অধিদফতর, মহাহিসাব নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, সমুদ্র এবং স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষসমূহ, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঢাকার ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) ও রাজস্ব (এসএ) শাখা, পরিবেশ অধিদফতর, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর, স্বাস্থ্য অধিদফতর, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা অধিদফতর। সরকারের এই ২৫টি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে দুদক ২০১৭ সালে ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে।

এসব টিম অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানির তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। ইতিমধ্যে এই ২৫টি টিমের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকে ২০১৮ সালে কাস্টমস, ভ্যাট অ্যান্ড এক্সাইজ ও আয়কর বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর সংক্রান্ত টিম এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির সম্পর্কে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে। যেগুলো ইতিপূর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতর প্রধানকে দেওয়া হয়েছে।