প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “আ’ইএস বধূ বা যৌ’নদা’সী শামিমা বেগমের পরিণতি”

“আ’ইএস বধূ বা যৌ’নদা’সী শামিমা বেগমের পরিণতি”

তসলিমা নাসরিন

236
আইএস বধূ বা যৌনদাসী শামিমা বেগমের পরিণতি

*ইসলামিক স্টেটে যোগ দেওয়া মানুষের সংখ্যা দেখে আমি সত্যিই অবাক হই। অচেনা ভাষা আর অচেনা সংস্কৃতির অচেনা দেশে, ধূসর মরুভূমিতে, অ’স্ত্র হাতে নিয়ে ঘুরবে, আর উগ্র সালাফি আদর্শে তৈরি ইসলামিক স্টেটে বিশ্বাস-না-করা মানুষদের, সে মুসলিম হোক, অমুসলিম হোক, নৃ’শংসভাবে গ’লা কে’টে হ’ত্যা করবে, যৌ’নদা’সীর সঙ্গে রাত কাটাবে, মানবে না গণতন্ত্র, মানবাধিকার মানবে না শরিয়া আইন ছাড়া অন্য কোনও আইন, গুঁ’ড়িয়ে দেবে প্রাচীন সভ্যতা, ত্যাগ করবে স্বজন-বন্ধু- কে চায় এমন ভ’য়াবহ জীবন? কে আকৃষ্ট হয় এসবে?

*অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পৃথিবীর ১১১টি দেশের অন্তত ৪১ হাজার ৪৯০ জন মানুষ এসবে আকৃষ্ট হয়েছে। তারা ইরাকে আর সিরিয়ায় গিয়ে ইসলামিক স্টেটে যোগ দিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যের নাগরিকই যোগ দিয়েছে প্রায় ৬ হাজার। ব’র্বরতা, নৃ’শংসতা হয়তো মানুষের র’ক্তেই। তা না হলে এত লোক কেন সোল্লাসে মানুষ খু’ন করার জন্য মরিয়া হয়েছে! এত লোক কী করে অসম্ভব এক স্বপ্নও দিব্যি দেখে ফেলেছে- পৃথিবীর সব মানুষ ধ’র্মান্তরিত হয়ে সালাফি বা ওহাবি মুসলমান হবে, আর পৃথিবী শাসন করবে এক খলিফা!

*অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন অনেকেই দেখে। সব স্বপ্ন তো দোষের নয়। ইউটোপিয়ায় বিশ্বাস করা মানুষ অসম্ভব স্বপ্ন দেখে। তারা কিন্তু বর্বরতায় বিশ্বাস করে না। বর্বরতা আর খু’ন খারাবির মধ্য দিয়ে যারা নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চায়, তাদের নিয়েই সমস্যা। হিটলারের স্বপ্ন ছিল, স্টালিন, পল পটের ছিল। তাদের স্বপ্ন মানুষকে অকথ্য অ’ত্যাচার, অ’মানুষিক নির্যা’তন, নৃ’শংস হ’ত্যা করা ছাড়া পূরণ হতো না। এ যুগের মাওবাদিরা মানুষ খু’ন করছে স্বপ্ন পূরণের জন্য। যাদের খু’ন করছে তারাও সাধারণ মানুষ। এতে সত্যিই কি মাওবাদিদের কোনও লাভ হচ্ছে? ইসলামিক স্টে’টও তাই। মানুষ মেরে তারা পৃথিবীকে নিজের দখলে নিতে চায়। এক পাল খু’নি আর বর্ব’র পুরুষ পৃথিবীতে বাস করবে শুধু, মেয়েদের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না। মেয়েরা পুরুষের ক্রী’তদা’সী বা যৌ’নদা’সী হবে। এটি ওদের স্বপ্ন হতে পারে, কিন্তু যে কোনও সুস্থ মানুষের জন্য এ নিশ্চিতই দুঃস্বপ্ন।

*ইসলামিক স্টেটের পতন নিশ্চিত হওয়ার পর অনেক আ’ইএস যোদ্ধাই যার যার দেশে ফিরে গেছে। ১৮০০ জন যো’দ্ধা ফিরে গেছে ইউরোপে। অবশ্য এখনও ইরাক ও সিরিয়ায় ১৪ হাজার থেকে ১৮ হাজার যো’দ্ধা রয়েছে। এরাও একসময় নিশ্চিহ্ন হবে। এটা ঠিক, অনেকে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, আই’সিসের মতো বর্ব’র দলের সঙ্গে ভেড়াটা যে তাদের উচিত হয়নি, সেটা বোধগম্য হয়েছে অনেকের। আইসিস যে সত্যিকার শান্তির ইসলাম নয়, বরং অশান্তি আর অস্থিরতার- সেটা অনুধাবন করতে পেরেছে। সেটা কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামিমা বেগমের এখনও বোধগম্য হয়নি, এখনও তার ঘোর কাটেনি। ডাস্টবিনে মানুষের কা’টা মুণ্ডুর রাজনীতি নিয়ে তার কোনও সংশয় নেই, আশঙ্কা নেই। সে বরং মনে করে এটিই সত্যিকারের ইসলাম।

*তার ভাষ্যে, ইসলাম যদি বলে বিধর্মীদের মুণ্ডু কে’টে ফেলা উচিত, তাহলে কে’টেই ফেলা উচিত, এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। কতটা মগজধোলাই হলে মানুষ এমন অকম্পিত দ্বিধাহীন কণ্ঠে বর্ব’রতার পক্ষে দাঁড়াতে পারে! শামিমা অনুতপ্ত তো নয়ই, বরং গর্বিত কণ্ঠেই বলেছে, আ’ইসিসে যোগ দিয়ে সে ভুল করেনি। চোখের সামনে দুই সন্তানের মৃত্যু হলো, তারপরও তার একবারও আক্ষেপ হয় না কেন সে সিরিয়া এসেছিল। সে এখনও বিশ্বাস করে আইসিসের আদর্শে, আইসিসের ঘাঁটি যারা বো’মা মে’রে উড়িয়ে দিয়েছে, দোষ সে তাদেরই দেয়।

*যুক্তরাজ্যে তার ফিরে যেতে চাওয়ার একমাত্র কারণ তার ছেলেটা যেন বেঁচে থাকে, দুই সন্তান হারানোর পর তার এই আকুতি। ছেলেটি তার এবং আইসিসের এক ও’লন্দাজ স’ন্ত্রাসীর সন্তান। উ’গ্র সালাফি আদর্শে বিশ্বাস করা শামিমা কেন সালাফিদের সৌদি আরবে আশ্রয় চাইছে না, তা আমি বুঝতে পারছি না। এত নিরীহ নিরপরাধ অমুসলিম খু’ন করার পরও, অমুসলিমদের প্রতি তীব্র ঘৃ’ণা প্রকাশ করার পরও বাস করার জন্য তারা সেই অমুসলিমদের দেশকেই বেছে নেয়। কী ভীষণ বৈপরীত্য তাদের জীবনে এবং মনে! যুক্তরাজ্য তার নাগরিকত্ব বাতিল করার পর সে এখন তার স্বামীর দেশ নেদারল্যান্ডে যাওয়ার চেষ্টা করবে, নিজেই বলল। যদি নেদারল্যান্ডও তাকে অনুমতি না দেয়, তাহলে? তাহলেও কি সে বলবে না আই’সিসে যোগ দিয়ে সে ভুল করেছিল? শামিমা তার করুণ প’রিণতির জন্য নিজেকে নয় বরং যুক্তরাজ্যকেই দোষ দিচ্ছে।

*উদারপন্থিরা দাবি করছে ‘শামিমাকে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। তার সন্তান তো কোনও দোষ করেনি। তা ছাড়া শামিমা সন্ত্রা’সী হয়েছে যুক্তরাজ্যে বসেই, এই দায় যুক্তরাজ্যকেই নিতে হবে। তাকে পুনর্বাসনে দিয়ে তার সন্ত্রা’সের ঘোর দূর করতে হবে, অথবা তাকে জেলে পুরে শাস্তি দিতে হবে’। ডানপন্থিরা বলছে, ‘আইসিস দলের সব সন্ত্রা’সীকে মে’রে ফেলা হোক, ওদের বাঁচিয়ে রাখা ঝুঁকির ব্যাপার। কোনও দেশই তাদের ফেরত নেবে না’। বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত হলেও বাংলাদেশ শামিমাকে নেবে না। বাংলাদেশে জ’ঙ্গির অভাব নেই, নতুন জ’ঙ্গিকে আহ্বান করার মতো বোকামো বাংলাদেশ করবে না। অগত্যা শামিমার কী হবে, তা শামিমা এবং শামিমার শুভাকাঙ্ক্ষী যারা আছে, তারা বুঝবে। কেউ কেউ বলে এভাবে সন্ত্রাসীদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হলে এদের ক্ষো’ভ প্রচণ্ড আকার ধারণ করবে, আগুন আরো জ্বলবে, স’ন্ত্রাস আরও বাড়বে। কিন্তু অন্যরা কী শিখবে যদি সন্ত্রা’সীদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়? শিখবে সন্ত্রা’সী বনে যাওয়ার পরও আরাম আয়েশ বাতিল হয় না। সমস্যায় পড়লে দিব্যি সভ্য দুনিয়ায় ফেরত আসা যায়। দক্ষ সন্ত্রা’সী হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকায় সন্ত্রা’স করার সুযোগও মেলে।

*শামিমা যুক্তরাজ্যে ফিরে গেলে, আমার ভয় হয়, সে হয়তো বোরখার আড়ালে বো’মা নিয়ে ভিড়ের রাস্তায় বা মেট্রো রেলে যাবে ফুটাতে। ম’গজধোলাই খুব সাংঘাতিক ক্ষতিকর জিনিস। ধো’লাই হওয়া মগজকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। খুব দ্রুত মানুষ নরমপন্থা থেকে চরমপন্থায় চলে যেতে পারে, কিন্তু চরমপন্থা থেকে নরমপন্থায় আসা কারও জন্য সহজ নয়। তাহলে কি চরম ডানপন্থিদের মতো বলব, সন্ত্রা’সিদের বা জি’হাদিদের মে’রে ফেলো? না, তা বলব না। শামিমা তার আদর্শে জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করুক চাই। বিধর্মীদের প্রতি তার যে তীব্র ঘৃণা, তার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়াটা নিরাপদ নয়। এমন কী যুক্তরাজ্যের জেলও তার জন্য নিরাপদ নয়। বিধর্মীরা একসময় তাকে হয়তো ভালোবাসতো, এখন, বিধর্মীদের প্রতি তার মনোভাব জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর তাকে ঘৃ’ণাই করবে।

*এসব শামিমাকে প্রতি’শোধপরায়ণ করে তুলবে আরও, সে আরও বড় সন্ত্রা’সী হয়ে উঠবে। এটা তার জন্য তো বটেই, যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার জন্যও ভালো নয়। জি’হাদিদের নিজের প্রতি যেমন কোনও মায়া থাকে না, অন্যের প্রতিও থাকে না। কচি কচি তরুণেরা হলি আর্টি’জান ক্যাফেতে কী ঠান্ডা মাথায় মানুষের গলা কে’টেছে। ওরা কি আগে কখনও মানুষের গলা কে’টে হাত পাকিয়েছে? মগ’জধোলাই সব করিয়ে নিতে পারে, অন্যকে খুন, স্বজন বন্ধুকে খু’ন, নিজেকে খু’ন, সব।

*শামিমা এবং আরও যারা আইসিস জ’ঙ্গি রাষ্ট্রহীন অবস্থায় ইরাকে বা সিরিয়ায় পড়ে আছে, যারা ইউরোপ আমেরিকার নাগরিকত্ব হারিয়েছে; ইউরোপ বা আমেরিকায় নয়, তাদের চেষ্টা করতে হবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে বাস করার, বিশেষ করে যেসব দেশে শরিয়া আইন কায়েম আছে। ওসব দেশেই তারা মনের শান্তি সুখ সব পাবে। বোরখা পরে চলাফেরা করলে ওসব দেশে কেউ টিপ্পনি কাটবে না। ইউরোপের মতো বোরখা নি’ষিদ্ধ করার আইন জারি হবে না। আর আইসিস পুরুষেরাও ধর্মীয় পোশাক পরে রাস্তা ঘাটে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারবে। কেউ তাদের স’ন্ত্রাসী বলে হামলা করবে না। মুসলিম সমাজে ওরা সহজে মিশে যেতে পারবে। তাই সবাই মিলে ওদের ইউরোপ আমেরিকায় ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে শরিয়া আইনের দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করুন।

লেখক: নির্বাসিত লেখিকা