প্রচ্ছদ স্পটলাইট নিমতলী থেকে চুড়িহাট্টা: ৯ বছরে সরেনি কেমিক্যালের গুদাম

নিমতলী থেকে চুড়িহাট্টা: ৯ বছরে সরেনি কেমিক্যালের গুদাম

32
নিমতলী থেকে চুড়িহাট্টা: ৯ বছরে সরেনি কেমিক্যালের গুদাম

পুরনো ঢাকার অলি গলিতে রয়েছে কেমিক্যাল মজুদ রাখার গোডাউন। শুধু মাত্র বংশাল, মালিটোলা, নিমতলী, নবাব কাটরা, আগামাসি লেন, উর্দুরোড, জয়নাগরোড, চুরিহাট্টা, পোস্তা, ইমামগঞ্জ, লালবাগ, হোসেনী দালান রোড নাজিমউদ্দিন রোডের বাগিচা এলাকায় রয়েছে প্রায় কমবেশি দুই শতাধিক কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থের গোডাউন।

পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের এসিড জাতীয় তরল পদার্থ। কাঠের ব্যবহৃত বার্নিশ, ইথাইল, মিথাইল, বডি স্প্রে তৈরির কারখানা ও গোডাউন। প্রতিনিয়তই ওই এলাকার মানুষ ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। নিমতলীর ট্র্যাজেডির পর এখন আর তাদের কোনও ভাষানেই। এখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিন কন্যাসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা তাদের আপনজন হারানোর ব্যথা ভুলতে পারেনি। তার মধ্যে গতকাল আবারো ঘটে গেলে নিমতলী ট্র্যাজেডির মতো আরো একটি মর্মান্তিক ঘটনা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ আট বছরেও পুরান ঢাকা থেকে সরেনি ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল কারখানা। এমনকি অনেক মালিকই বেশি ভাড়ার লোভে কেমিক্যালের গুদাম হিসেবেই বাসা ভাড়া দিয়েছেন। ফলে নিমতলীর ওই অগ্নিকাণ্ডের পরও কেমিক্যালের কারখানা আর গুদামের সংখ্যা পুরান ঢাকায় তো কমেইনি, বরং বেড়েই চলেছে।

কেমিক্যাল গোডাউন কেরানীগঞ্জে সরানো জন্য ৬ মাস বেঁধে দেয়া হলেও গত ৯ বছরেও সরেনি। কেমিক্যাল না সরানোর ফলে নিমতলীর ট্রাজেডির প্রায় ৯ বছর পর আজ আবার এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা চুড়িহাট্টা ট্রাজেডি। অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত কীভাবে, তা এখনও সুনিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও এটা স্পষ্ট যে, এবারও অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতার কারণ কেমিক্যালের গুদামই।

মর্মান্তিক ওই অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকা থেকে বিভিন্ন সময় কেমিক্যাল কারখানা সরানোর দাবিতে সামাজিক আন্দোলন হয়েছে। সেখানকার কেমিক্যালের গুদাম আবারো নতুন কোনো আতঙ্কের কারণ হতে পারে বলে একাধিকবার সচেতনও করেছে সংশ্লিষ্ট মহলগুলো।

ঝুঁকিপূর্ণ গুদামগুলো সরাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা সময় নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কেমিক্যাল পণ্যের ৮০০ গুদামের তালিকা তৈরি করে সেসব কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও নেয় সরকার। কিন্তু সেসব উদ্যোগ আটকে আছে শুধু কাগজ-পত্রে।

মেয়র সাঈদ খোকন বলছেন, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে লোকজন এগিয়ে না আসলে বা জনগণ সচেতন না হলে কেমিক্যাল গোডাউন অপসারণ হচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বলেছেন, ডিএসসিসি, রাজউক, পরিবেশ মন্ত্রনালয়, বিস্ফোরক অধিদফতরসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিনিধিদের নিয়ে সমন্বয় করে কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হবে।

পুলিশের আইজি ড. জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, পুরনো ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন সরাতে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগকে পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।

গত ২০১০ সালের ৩ জুন। পুরান ঢাকার নিমতলীতে ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরিত হয়ে আনুমানিক রাত ১০টা ৩৮মিনিটে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই আগুন ভয়াবহ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। ইতিহাসের স্মরনীয় সেই অগ্নিকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার মধ্যেই আগুন ছড়ায় আশেপাশের বেশ কয়েকটি ভবনেও!

সে সময়ে স্থানীয় গুদামে থাকা কেমিক্যাল পণ্যের কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে চোখের নিমিষেই। যে ভবনগুলোতে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল সেগুলোর একটিতে চলছিল বিয়ের অনুষ্ঠান। যেখানে আনন্দের বাদ্যবাজনা ছিল, সেখানে শুরু হলো কান্নার রোল আর বাঁচার আকুতি। তাদের আর্ত চিৎকারে ভারি হয়ে উঠেছিল নিমতলীর আকাশ-বাতাস। তিন ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিল ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু ততক্ষণে ঝড়ে যায় ১২৪টি প্রাণ।

বৃহস্পতিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পর্যন্ত চকবাজারের চুড়িহাট্টার দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭০ জন। আহত অর্ধশতাধিক। তারা ঢাকা মেডিকেলের (ঢামেক) বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। তবে অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, স্বজনের মরদেহ এখনও অনেকেই শনাক্ত করতে পারেননি। সেজন্য করতে হচ্ছে ডিএনএ পরীক্ষা। আর পুড়ে যাওয়া ভবনের ভেতরে আরও মরদেহ কিংবা মানুষের কয়লা মিলবে কিনা তা হয়তো শঙ্কাই রয়ে গেল।