প্রচ্ছদ স্পটলাইট ওএসডির পর ইউএনওর আবেগঘন স্ট্যাটাস ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

ওএসডির পর ইউএনওর আবেগঘন স্ট্যাটাস ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

1115
ওএসডির পর ইউএনওর আবেগঘন স্ট্যাটাস ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসনে আরা বেগম বীনাকে সম্প্রতি বদলি করা হয়েছে। তার জায়গায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন নাহিদা বারিক। যিনি ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের এসিল্যান্ড ছিলেন। তবে বিদায়ের আগ মুহূর্তে বেশ আলোচিত হয়েছেন ইউএনও হোসনে আরা বেগম বীনা। আলোচনার কেন্দ্রতে ছিল তার সন্তান সম্ভাবা হওয়ার বিষয়টি।

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হোসনে আরার কোল জুড়ে আসে প্রথম সন্তান। তবে সন্তান অপরিপক্ক জন্ম নেওয়ায় বর্তমানে স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে (এনআইসিও) আছে।

দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর মা হবার সৌভাগ্যবতী হলেও সাধনা লব্ধ সন্তানের এমন শরীরিক অবস্থা দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এই ইএনও। তার নিষ্পাপ সন্তানের এমন অবস্থার জন্য একজনকে দায়ী করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বীনা তার ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন।

তার ওই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো: ‘আমি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হলো এখন চুপ করে থাকাটাও অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলবো… আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি।

আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও আমরা কোনো সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি আমি দুই মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয়, এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুণছিলাম।

উল্লেখ্য আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি।

একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত, ফাঁকিবাজী এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোনো ব্যতিক্রম আমি করিনি।

অথচ আমি সন্তান সম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলির পাঁয়তারা করেই চলেছিল।

আমার সন্তান সম্ভবা হওয়াটাকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এতে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অ্যাপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি।

আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল এপ্রিলের ২০ তারিখ, তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রেগুলার চেকআপ করতে আমি হাসব্যান্ডসহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি।

চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমরা হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য, এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায় আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।

আমার অপরাধ হলো আমি সন্তান সম্ভবা। আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির। খবরটা শোনার পর আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি। আমি অ্যাজমার রোগী। প্রচণ্ড মানসিকচাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রি-ম্যাচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কী অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানি না!তবে জানি একজন সব দেখেন তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের উপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোনো কর্তা ব্যক্তিদের কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলব তুমি এর বিচার করো!

আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোনো কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’

প্রধানমন্ত্রীর যে নির্দেশ: নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডির ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশ হলে সেটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে এবং আজ সকালে তিনি জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহম্মদকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। এরপর গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বীনা তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। যা নিয়ে তোলপাড় চলছে প্রশাসনে।

জানা যায়, মাত্র ৯ মাস পূর্বে তিনি এ পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও কোনো সন্তান হয়নি তার। কিন্তু ৫ মাস পূর্বে জানতে পারেন তিনি ২ মাসের সন্তানসম্ভবা। এ অবস্থা নিয়েই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল আগামী ২০ এপ্রিল। কিন্তু হঠাৎ করে ওএসডির খবরে তিনি মারাত্মক মানসিক আঘাত পান। তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ৮ মাস বয়সী প্রি-ম্যাচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। বর্তমানে সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে ভর্তি।

বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত শেষে হোসনে আরা বেগম বীনাকে ভালো কোথাও বহালেরও নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সম্পাদক/এসটি