প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত নতুন বছর, নতুন সরকার এবং নতুন চ্যালেঞ্জ

নতুন বছর, নতুন সরকার এবং নতুন চ্যালেঞ্জ

101
নতুন বছর, নতুন সরকার এবং নতুন চ্যালেঞ্জ

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

অবশেষে আমাদের এবং বাংলাদেশের সব দেশপ্রেমিক মানুষের আশা পূর্ণ হলো। আওয়ামী লীগ এককভাবে এবং মহাজোট সম্মিলিতভাবে বিশাল বিজয়ের অধিকারী হয়েছে। এই বিজয়ের জন্য প্রথমে জনগণকে অভিনন্দন, এরপর শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ।

তাঁর নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের পক্ষে এই মহাবিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছে। এটা শুধু একটা নির্বাচন-বিজয় নয়। এটা একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের চার দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে তোলা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের দাঁত ভেঙে দেওয়া। এই বিজয়কে সংহত করা যদি সম্ভব হয়, তাহলে একাত্তরের অসমাপ্ত যুদ্ধ, যা শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, তা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সফল সমাপ্তির পথে এগিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ রক্ষা পাবে।

আজ মঙ্গলবার ইংরেজি নববর্ষ (২০১৯) শুরু হলো। এই নববর্ষ উপলক্ষে দেশের মানুষকে, নির্বাচনে বিজয়ী, পরাজিত সব দলকে শুভেচ্ছা জানাই। নববর্ষ আমাদের নবপ্রেরণা দিক। নির্বাচনে জয়ীরা জয়ের উল্লাসে আত্মহারা না হয়ে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন উপহার দেওয়ার যে কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে, তা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হোন। পরাজিতরা স্পোর্টসম্যান সুলভ মনোভাব নিয়ে পরাজয়ের গ্লানি মুছে দেশের উন্নয়নের ধারায় রাজনীতিতে যুক্ত হোন, নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় গণতান্ত্রিক শাসনের চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের ব্যবস্থা সমুন্নত রাখার ব্যবস্থা করুন— এটাই আমাদের কামনা। বাংলাদেশে এখন নতুন বছর এসেছে, নতুন সরকার আসছে এবং মানুষের মনেও নতুন প্রশাসন। সবাই মিলে এ প্রত্যাশা পূরণের পথেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

আওয়ামী লীগ জোট যে নির্বাচনে জিতবে—এটা শুধু আমার নয়, বেশির ভাগ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরই প্রেডিকশন ছিল। সেটাই হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আমার প্রেডিকশনের সবটা সফল হয়নি। আমার ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে সরকার গঠনের মতো কমফোর্টেবল মেজরিটি পাবে। ভূমিধস বিজয়ের অধিকারী হবে না। বাস্তবে আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত গণনায় একাই ২৫৯ আসন এবং মহাজোট নিয়ে ২৮৮ আসনে বিজয়ী হয়েছে।

অন্যদিকে আমার প্রেডিকশন ছিল বিএনপি একাই নতুন সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের মতো সংখ্যাশক্তি পাবে। সে ক্ষেত্রে তারা পেয়েছে মাত্র আটটি আসন। অর্থাৎ তারা সংসদে বিরোধী দল গঠনের মতোও সংখ্যাশক্তি পায়নি। সে ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২১টি আসন নিয়ে কি এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টি আবার বিরোধী দল গড়বে? যদি তারা মন্ত্রিত্ব চায়, তাহলে যে কজন মন্ত্রিত্ব পাবেন না, তাঁরা কি গাছের ওপরটা খাবেন এবং তলারটাও কুড়াবেন, সেই আগের নীতি অনুসরণ করবেন, নাকি আওয়ামী লীগের সঙ্গে অধিকতর দর-কষাকষিতে না মিললে অন্যান্য সদস্যের (স্বতন্ত্র, গণফোরাম ইত্যাদি) সঙ্গে মিলে সংসদীয় বিরোধী দল গঠনের উদ্যোগ নেবেন, তা আমার জানা নেই। আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো ‘বসন্তের বিপ্লবীদের’ পরাজয়ে আমি অখুশি নই। এ পরাজয় ধানের শীষ, নকল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও সুবিধাবাদিতা— এই তিন মিশ্রিত ভেজালের।

সুলতান মনসুরের জয়লাভটি অবশ্যই আওয়ামী লীগের জয়লাভ। তিনি ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিলেও ওই মঞ্চেই জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। বিএনপি তাতে আপত্তি জানিয়েও তাঁকে থামাতে পারেনি। আমার ধারণা, শেখ হাসিনা তাঁকে ক্ষমা করে দিলে তিনি আওয়ামী লীগে ফিরে আসবেন। বিকল্পধারার ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে এবং দলেরও অন্যতম নেতা মাহী বি চৌধুরীর বিশাল নির্বাচন-বিজয়ে আমি খুশি এবং তাঁকে অভিনন্দন জানাই।

জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রশ্নে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিরোধিতা এখন সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। মাহী বি চৌধুরীরও এ ব্যাপারে একটা বড় ভূমিকা ছিল। যদি বিকল্পধারা আওয়ামী বলয়েই থাকতে চায়, তাহলে শেখ হাসিনা তাঁর নতুন সরকারে নতুন রক্তের সঞ্চালন এবং নতুন মেধা সংযোগের ইচ্ছা থেকে যদি মাহী বি চৌধুরীকে এই মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করেন, তাহলে ভালো করবেন।

ড. কামাল হোসেনের বয়স এখন ৮২ কিংবা ৮৩ বছর। তিনি আরো দীর্ঘজীবন লাভ করুন— এই কামনা করি। কিন্তু এবারের নির্বাচনই হয়তো তাঁর জীবনের শেষ নির্বাচন। এ নির্বাচনে তাঁর জোট হেরেছে। শোচনীয়ভাবে হেরেছে। তিনি নিজে নির্বাচনে দাঁড়ালে জয়ী হতেন কি না সন্দেহ। হলেও ধানের শীষ নিয়ে হয়তো দাঁড়াতে হতো। এখন তিনি কী করবেন? রাজনীতি থেকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেবেন, না পানি আরো ঘোলা করতে চাইবেন? তাঁর বর্তমান হাবভাব দেখে মনে হয়, তিনি পানি আরো ঘোলা করতে চাইবেন। এরই মধ্যে তিনি নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছেন।

নতুন তদারকি সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দাবি করেছেন। বিএনপি জোটেরও এটা দাবি। তাদের সদস্যরা নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে গিয়ে শপথ গ্রহণ করবেন, না সংসদ বর্জন করে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে আন্দোলন করতে চাইবেন, তা বোঝা যাবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে।

ড. কামাল হোসেন নতুন নির্বাচন দাবি করেছেন। শেখ হাসিনা এ দাবি মানবেন কেন? নিশ্চিতভাবেই এই মামাবাড়ির আবদারে সাড়া দেবেন না। তখন কামাল হোসেন কী করবেন? ১৯৯৬ সালে বিএনপি যথেষ্ট জালিয়াতির নির্বাচন করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেছিল। শেখ হাসিনা কারো কাছে নালিশ করেননি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের মুখে খালেদা সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। সেই আন্দোলনে সরকারি কর্মচারীরাও নেমে এসে জনতার মঞ্চ গড়েছিলেন।

এবার জালিয়াতির নির্বাচন হয়নি। জনগণও ক্ষুব্ধ নয়। ড. কামাল পারবেন গণ-আন্দোলন গড়ে নির্বাচনে দেওয়া জনগণের ম্যান্ডেট বানচাল করতে? বিএনপি পেরেছে অতীত কোনো সফল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে, নাকি কামাল হোসেন পেরেছেন? তিনি তো বরং গণ-আন্দোলন দেখলে বিদেশে পালিয়েছেন। এবারও তা-ই ঘটবে। তাঁর যা মুরোদ, তা হলো পশ্চিমা দেশে তাঁর ‘অভিভাবকদের’ কাছে গিয়ে দেনদরবার করা। ২০১৪ সালে তিনি ড. ইউনূসকে সঙ্গে নিয়ে তা করে দেখেছেন, সফল হননি। এবারও হবেন না।

তবু বলব, নির্বাচনে এই বিশাল ও অভাবনীয় বিজয়ে আওয়ামী লীগের অতি উল্লসিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই বিজয় তাদের সামনে যে বিরাট চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, সেই চ্যালেঞ্জ তারা কিভাবে মোকাবেলা করবে, তা বিনম্র চিত্তে বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয়বারের মতো দেশ শাসনে জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট পাওয়ার পর নতুন আওয়ামী লীগ মহাজোট যদি জনগণের বিশাল প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে, দলের ভেতরে ও বাইরে দুর্নীতির রাঘব বোয়ালদের দমন করতে না পারে, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসী অংশকে সংযত করতে না পারে, লোভী এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী সংসদ সদস্যদের যে অংশ হাসিনা-ক্যারিসমার জোরে পুনর্নির্বাচিত হয়ে এসেছে, তাদের সংশোধন করা না যায়, সর্বোপরি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হয়, তাহলে এই বিজয়ের ফসল ধরে রাখা বেশিদিন সম্ভব হবে না। এই মহাবিজয়ের দিনে আওয়ামী লীগের জন্য এই মহাসতর্কবাণী উচ্চারণ করে রাখছি।

এই নির্বাচন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে ড. কামাল হোসেন ও বিএনপি যে অভিযোগ তুলেছে, তার জবাবে বলব, এর চেয়ে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশেই হয় না। এমনকি আমেরিকার দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও হয়নি। এ সম্পর্কে আমার অন্য লেখায় বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইল।

লন্ডন, সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮