প্রচ্ছদ স্পটলাইট যুক্তরাষ্ট্র কি ধরনের সরকার চায় বাংলাদেশে, কোন দলকে চায়?

যুক্তরাষ্ট্র কি ধরনের সরকার চায় বাংলাদেশে, কোন দলকে চায়?

143
যুক্তরাষ্ট্র কি ধরনের সরকার চায় বাংলাদেশে, কোন দলকে চায়?

বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচনে ক্ষেত্রে মার্কিনীদের প্রভাবের কথা কারও অজানা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশগুলোর উপরেই আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে, যে দেশগুলো তুলনামূলক ভাবে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং অর্থনৈতিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নীতিতে প্রকাশ্যেই বলেছে, যে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে তাঁদের অবস্থান সুদৃঢ়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাই দেখতে চায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে। বিশ্বের যেসব দেশে সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের কথা বলা হয়েছে, সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদের উত্থান ঘটেছে সেসব দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত নগ্ন ভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। চিলির আলেন্দের কথা আমরা জানি, যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটোর কথা আমরা জানি। এমনকি বিপ্লবী চে গুয়েভারার হত্যাকাণ্ডের মার্কিনীদের প্রকাশ্য ভূমিকা ছিল বলে সবরকমের তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদ এবং প্রচ্ছন্ন সমর্থনের কথাও এখন বিভিন্ন দলিলপত্রে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের নির্বাচনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অতীতেও ছিল, এখনো আছে। তবে বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে আসার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা অনেক কমে এসেছে। যার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বলয়ও এখন অনেক কম। তারপরও ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। কারণ এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়, তাহলে কৌশলগত কারণেই বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।

অন্যান্য নির্বাচনের মতোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনে সুস্পষ্ট কিছু বিষয়ের উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার এসেই বলেছেন, বাংলাদেশে তাঁরা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তাঁরা দেখতে চায়। যে নির্বাচন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে, যে নির্বাচনে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। এই প্রকাশ্য কথার বাইরেও বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতি এবং কৌশল আছে। তাঁরা বাংলাদেশে এমন একটা সরকার চায়, যে সরকার সুনির্দিষ্ট কিছু নীতি এবং কর্মপন্থা অনুসরণ করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে যে ধরনের সরকার চায় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম বিষয় হচ্ছে:

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশে যেন ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থান না ঘটে। তাঁরা আরও চায় বাংলাদেশে একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা হোক। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে জামাত এবং হেফাজতসহ মৌলবাদী দলগুলোর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট একটি বিল উত্থাপিত হয়েছে এবং এই বিলের মাধ্যমে স্পষ্টতই মার্কিন আকাঙ্ক্ষা-অভিব্যক্তি প্রকাশ হয়েছে।

২. কৌশলগত কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে এমন একটা সরকার চায় যারা চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সংকোচন নীতি গ্রহণ করবে। গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশ দক্ষিণ দক্ষিণ অর্থনীতি গ্রহণ করেছে। এই সময়ে বাংলাদেশের সবগুলো সরকার ধারাবাহিকভাবেই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা বাণিজ্য অনেক হ্রাস পেয়েছে। এ বিষয়টি তাঁদের বর্তমানে অন্যতম একটি ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে যখন অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বাবলম্বী দেশে পরিণত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে অনেক ব্যবসায়িক এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেই ব্যবসায়িক সুযোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাজে লাগাতে পারছে না। সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে এমন একটা সরকার চায়, যারা চীনের সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্য সংকোচন নীতি গ্রহণ করবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে।

৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া কোনো দেশ মার্কিন বিরোধী অবস্থান যেন না থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুস্পষ্ট নীতি হলো কোন রাষ্ট্র যেন সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের প্রতিষ্ঠা না হয়। সে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নির্বাচনে এমন একটা আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে কোন ভাবেই বামপন্থার রাজনীতির উত্থান না হয়। হেনরি কিসিঞ্জারের যে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি, সেখানে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান হলো, সমাজতন্ত্রের পক্ষের কোনো শক্তির যেন উত্থান না ঘটে। যেসব দেশে সমাজতন্ত্রের উত্থান ঘটেছে, সেসব দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনেও তাঁরা চায়, বাংলাদেশে মার্কিন বিরোধী কোনো বামপন্থী দল ভালো অবস্থানে না থাকে।

৪. বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে বিনিয়োগ চলছে, সেইগুলোর ধারাবাহিকতায় আরও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ঘটে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার আসবে তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করে।

৫. বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপন্থী বেশ কিছু সুশীল প্রতিনিধি রয়েছে। যেমন ড. মুহম্মদ ইউনূসকে প্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। তাঁকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো লুকোচুরি করে না। ড. মুহম্মদ ইউনূসকে যখন গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই তার প্রতিবাদ করেছিল। এছাড়াও মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানহানির মামলা করা হয়েছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাহফুজ আনামের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিল। বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপন্থী এবং মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষক যে সুশীল রয়েছে তাঁদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়াও মার্কিনীদের একটা বড় এজেণ্ডা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় এমন একটা সরকার আসুক যারা এইসব মার্কিনপন্থী সুশীলদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে।

৬. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা প্রকাশ্য নীতি আছে, যা তারা বাংলাদেশে কোনদিন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সেটা হচ্ছে তাঁরা চায় বাংলাদেশ ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করুক। লক্ষ্য করা যায় বিএনপির একজন নেতা আসলাম চৌধুরী ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে ভারতে একটা বৈঠক করেছিল। বাংলাদেশে যেন ইসরাইলের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়, সেই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন থেকে কাজ করে করলেও এই বিষয়ে তেমন কোনো সফলতা তারা অর্জন করতে পারেনি।

এগুলোর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা যে, প্রথমত তারা এমন একটা সরকার বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চায়, বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি আছে, সেই নীতিকে যে সরকার সমর্থন করবে। দ্বিতীয়ত তাঁরা এমন একটা সরকার বাংলাদেশে দেখতে চায়, যে সরকার মার্কিন কূটনীতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে তারা এমন একটা সরকার চায়, যে সরকার বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণে রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখবে। যে রাজনৈতিক দল এই বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তাঁদের দিকেই থাকবে। যদিও বাংলাদেশের নির্বাচনকে প্রভাবিত করার কোনো ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর রাখে না।

সম্পাদক/এসটি