প্রচ্ছদ অর্থ-বাণিজ্য প্রতিটি সিএনজি থেকে তারেকের পকেটে ঢুকতো ৩ লাখ টাকা

প্রতিটি সিএনজি থেকে তারেকের পকেটে ঢুকতো ৩ লাখ টাকা

4193
প্রতিটি সিএনজি থেকে তারেকের পকেটে ঢুকতো ৩ লাখ টাকা

২০০২ সালের অক্টোবর মাস। মন্ত্রিসভা বৈঠকের আগের দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে ফোন এলো। বলা হলো, কালকে ক্যবিনেট মিটিংয়ে ‘থ্রি হুইলার নীতিমালা’ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি উত্থাপন করা যাবে না। ওটা আলোচ্য সূচি থেকে বাদ দিন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ড. সাদাত হুসেইন। পরিচ্ছন্ন, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ। বিরক্ত হয়ে বললেন, কে বলছেন, আর মন্ত্রিসভার আলোচ্য সূচি আপনার কাছে কীভাবে। অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর এলো, ‘আমি তারেক জিয়া।’ বিব্রত ড. সাদাত কী করবেন, বুঝতে পারছিলেন না। কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর ফোন করলেন, যোগাযোগ সচিব রেজাউল হায়াতকে। দু’জন পরামর্শ করে ‘থ্রি হুইলার ক্রয় নীতিমালা আলোচ্য সূচি থেকে বাদ দিলেন।

এর কয়েকদিন পর যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এক বৈঠকে ৩০ হাজার থ্রি হুইলার উত্তরা মোটরস লি. এর মাধ্যমে আমদানির সিদ্ধান্ত নিল। একই বৈঠকে একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দশ হাজার কালো ট্যাক্সি আমদানির সিদ্ধান্ত নিল। যেদিন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত নেয়, সেই দিনই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এতে অনুমোদন দেন। উত্তরা মোটরস পায় মনোপলি ব্যবসা, বলা যায় সোনার খনি। দেড় লাখ টাকার সিএনজি আমদানি করে, তা বিক্রি করে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকায়। আর এই পুরো লাভের টাকা যায় তারেক জিয়ার পকেটে।

টু হুইলার বা স্কুটার ঢাকার রাস্তা থেকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত পরিবেশবান্ধব থ্রি হুইলার বা সিএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৯৯ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের এরকম একটি প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ২০০০ সালে ‘ফেস আউট প্রোগাম’ এর কর্মকৌশল নির্ধারণ করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবার আগেই স্কুটার এর বদলে পরিবেশবান্ধব যান ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে নামানোর জন্য খসড়া নীতিমালা তৈরি হয়।

খসড়া নীতিমালায়, ভারত, চীন এবং থাইল্যান্ডে এ ধরনের স্বল্প খরচের যান তৈরি হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। নীতিমালায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মূল প্রস্তুতকারকের থেকে আমদানির কথা বলা হয়েছিল। নীতিমালা চূড়ান্ত হবার পরপরই বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে। তারা এই নীতিমালা চূড়ান্ত না করে নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেন। ২০০১ এর অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামাত জোট। ২০০২ সালে এই নীতিমালা মস্ত্রিসভার বৈঠকে আসার আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়।

সিএনজি নামেই অধিক পরিচিত এই থ্রি হুইলার ঢাকায় নামার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। এই নৈরাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় কালো ট্যাক্সি। যেমন ইচ্ছা ভাড়া আদায় হয়ে যায় স্বাভাবিক ঘটনা। বিষয়টি জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ায়। জাতীয় সংসদে তীব্র বিতর্কের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ সালে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফার নেতৃত্বে একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়। সাব কমিটিকে একমাসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। কিন্তু অষ্টম জাতীয় সংসদের মেয়াদকালে ওই কমিটি কোনো রিপোর্ট দিতে পারেনি।

প্রথম দুটি বৈঠকে জানা যায়, উত্তরা মোটরসের মাধ্যমে বিএনপির এমপি জিএম সিরাজ এই সব যান আমদানি করেন। জিএম সিরাজ ছিলেন তারেকের ঘনিষ্ঠ। ওয়ান ইলেভেনের সময় রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আসাদুর রহমান স্বীকার করেন যে, তারেক রহমানের নির্দেশেই এভাবে সিএনজি আমদানি করা হয়েছিল। তারেক রহমানকে প্রতিটি সিএনজির জন্য চার লাখ টাকা দিলে হাওয়া ভবন থেকে স্লিপ আসত, ওই স্লিপ পাওয়ার পরই বিআরটিএ রুট পারমিট সহ আনুষাঙ্গিক কাগজপত্র দিত।

প্রথম দফায় তারেক ১০ হাজার সিএনজির বিপরীতে ৪০০ কোটি টাকা উপার্জন করতে সক্ষম হন। আর ৩০ হাজার কালো ট্যাক্সি আনিয়ে তিনি পান আরও ৬০০ কোটি টাকা। ঢাকার রাস্তায় সিএনজি এখনো আছে কিন্তু কালো ট্যাক্সি নিখোঁজ হয়ে গেছে। যাঁরা লাভের আশায় বিপুল অংকের টাকা বিনিয়োগ করে কালো ট্যাক্সি কিনেছিল তাঁরা অনেকেই পথে বসেছে।

সম্পাদক/এসএ