প্রচ্ছদ আইন-আদালত সুযোগ খুঁজছে উগ্রপন্থীরা: ব্লগারদের সতর্ক করল গোয়েন্দারা

সুযোগ খুঁজছে উগ্রপন্থীরা: ব্লগারদের সতর্ক করল গোয়েন্দারা

152
সুযোগ খুঁজছে উগ্রপন্থীরা: ব্লগারদের সতর্ক করল গোয়েন্দারা

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত ব্লগারদের সম্পর্কে তথ্য হালনাগাদ করছেন গোয়েন্দারা। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।

কারণ হিসেবে জানা গেছে, ব্লগে লেখালেখি করায় মতাদর্শগত জটিলতায় ব্লগার ও উগ্রপন্থীদের মাঝে সংকটের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে উগ্রপন্থীদের হাতে কয়েক ব্লগার খুন হয়েছেন।

এবার নির্বাচনের আগে মতাদর্শগত কারণে কোনোপক্ষ যাতে সুযোগ নিতে না পারে সেজন্য আগাম সতর্ক করা হয়েছে কয়েক ব্লগারকে।

দায়িত্বশীল এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ব্লগারদের বিষয়ে নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (বর্তমানে আনসার আল ইসলাম) কয়েকটি ছোট গ্রুপ ব্লগারদের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে তাদেরকে রেকি করার চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে গোয়েন্দারা উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ পেয়েছেন। কয়েকজনকে নজরদারির মাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত করার পাশাপাশি ব্লগারদের ওপরও কঠোর নজরদারি শুরু হয়েছে। ব্লগ বা সামাজিক মাধ্যমে কেউ কটাক্ষ করে উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য জঙ্গিদের তালিকা হালনাগাদ ও গ্রেফতার অভিযানের সঙ্গে ব্লগারদের সম্পর্কেও রাখা হচ্ছে আপডেট তথ্য। ব্লগাররা কে কোথায় আছে, কী অবস্থানে আছে, এসব বিষয়ও রয়েছে কঠোর নজরে। ২০১৩ সালে একটি তালিকায় ৮৪ ব্লগার হিটলিস্টে ছিল উগ্রপন্থীদের।

এদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ছয়টি দেশে অবস্থান করছেন বেশ কয়েকজন ব্লগার। মতাদর্শগত কারণে আত্মগোপনে থাকার পরও স্বস্তিতে নেই তারা। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের ফলে তাদের ঝুঁকি থেকে গেছে। ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করায় উগ্রপন্থীদের টার্গেট হয় এসব ব্লগার। পরে বৈধ ও অবৈধ উপায়ে দেশত্যাগ করে। সম্প্রতি গোয়েন্দারা বিদেশে থাকা ব্লগার সম্পর্কে তথ্য নিতে গিয়ে বিভিন্ন বিষয় জানতে পারেন।

সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের পর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিদেশে গেছেন অন্তত ২০ ব্লগার। তাদের মধ্যে – আসিফ মহিউদ্দিন, ওমর ফারুক লুক্স, অনন্য আজাদ, শাম্মী হক, মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ, সৈকত চৌধুরী, সুব্রত শুভ, ক্যামেলিয়া কামাল, রতন (সন্ন্যাসী), সবাক, ক খ গ, কৌশিক, পারভেজ আলম, পিয়াল, মিতু, আজম খান, মুন্সি ওরফে বাঁধন ও তন্ময় উল্লেখযোগ্য।

ব্লগার অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, বেশির ভাগ ব্লগার নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাণনাশের ভয়ে তিন বছর আগে দেশ ত্যাগ করে। এদের মধ্যে ব্লগার অনন্য আজাদ, শাম্মী হক, তন্ময়, আসিফ মহিউদ্দিন ও মাহমুদুল হক মুন্সী বাঁধন অবস্থান করছেন জার্মানিতে।

ক্যামেলিয়া কামাল, পিয়াল, সুব্রত শুভ ও আজম খান আছেন সুইডেনে। পারভেজ আলম নেদারল্যান্ডসে, সন্ন্যাসী রতন নরওয়েতে, মনির এবং ক খ গ আছেন ফ্রান্সে।

উগ্রপন্থীদের হামলায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন ব্লগার ও প্রকাশক শুদ্ধস্বরের কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল আমেরিকায় চলে যান। ক খ গ এবং বৃত্তবন্ধির ব্লগার প্রথমে ভারতে ও পরে ফ্রান্সে আশ্রয় নেন। ব্লগারদের অধিকাংশ ছদ্মনাম ব্যবহার করে ব্লগে লিখতেন। তারপরও উগ্রপন্থীরা তাদের নিজস্ব অনুসন্ধান টিমের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে হত্যার হুমকি দেয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারিতে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যাচেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে আসিফ জার্মানিতে পাড়ি জমান। একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজিব হায়দার শোভনকে পল্লবীতে খুন করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তমনা ব্লগের লেখক অভিজিৎ রায়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হত্যা করে উগ্রপন্থীরা। একই বছরের ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু ও ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে হত্যা করা হয়। ঠিক একই বছরে ৭ আগস্ট ব্লগার নিলাদ্রী চ্যাটার্জিকে (নিলয় নীল) খুন করা হয়।

ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করায় জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে ৩১ অক্টোবর খুন করা হয়। শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর প্রকাশক আহমেদুর রশিদ চৌধুরী টুটুলের ওপর হামলা হয়। আনসার-আল-ইসলাম হামলার দায় স্বীকার করে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী নাজিম উদ্দিন সামাদকে ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে খুন করা হয়।

ব্লগার নিয়ে কাজ করা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, দেশে ও বিদেশে থাকা ব্লগারদের সম্পর্কে তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে। বিশেষ করে উগ্রপন্থীদের সঙ্গে ব্লগারদের যে মতাদর্শগত জটিলতা আছে, সেটি নির্বাচন সামনে রেখে কেউ যেন সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, তাই সবার তথ্য নেয়া হচ্ছে।

মাহবুব আলম বলেন, যে কোনো নির্বাচনের আগেই উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসীগোষ্ঠী কোনো কিছু করার সুযোগ খুঁজে থাকে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। কোনো উগ্রপন্থিগোষ্ঠী যেন কোনোভাবে নাশকতা চালাতে না পারে সে জন্য গোয়েন্দারা সতর্ক রয়েছেন।

ঊর্ধ্বতন এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ব্লগাররা যাতে কোনো স্পর্শকাতর ব্যাপারে বা ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ না করেন, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে আগেও সতর্ক করা হয়েছিল তাদের। সম্প্রতি কয়েক ব্লগারকে আবারও আগাম সতর্ক করা হয়েছে।

সম্পাদক/এসটি