প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য অডিও ফাঁস: মেয়র আইভীর বিএনপি-জামায়াত কানেকশন

অডিও ফাঁস: মেয়র আইভীর বিএনপি-জামায়াত কানেকশন

1953
অডিও ফাঁস: মেয়র আইভীর বিএনপি-জামায়াত কানেকশন

জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শুরা সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আমির মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহমদ পুলিশের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন। পুলিশি জেরায় উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির অজানা কথা।

তাঁর কাছ থেকে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নানা সমীকরণের তথ্য জানতে পেরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হতবাক। মাঈনুদ্দিন আহমদের জবানিতে নারায়ণগঞ্জের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের গোপন ঘনিষ্ঠতার চিত্র উঠে এসেছে। আইভীর বিএনপিতে যোগদানের পরিকল্পনার তথ্যও ফাঁস করেন জামায়াতের এই নেতা। এসংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড এখন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে।

জামায়াত নেতা মাঈনুদ্দিনের এসব তথ্য ফাঁসের বিষয়টি স্বীকার করেছেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার ওসি মঞ্জুর কাদের। যোগাযোগ করা হলে মঞ্জুর কাদের বলেন, ‘মাঈনুদ্দিন এমন কিছু তথ্য ফাঁস করেছেন, যা আগে কেউ শোনেনি। এসব তথ্য জানার পর আমরাও অবাক হয়েছি।’

তিনি বলেন, মাঈনুদ্দিন আহমদ এখন কারাগারে আটক রয়েছেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে দুই দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি বলেন, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই মূলত একসময় তাঁর মুখ থেকে নানা গোপন তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে।

ফাঁস হওয়া তথ্যে জানা যায়, বিএনপির সঙ্গে আইভীর যোগাযোগ প্রশ্নে মাঈনুদ্দিন বলেছেন, ‘আইভীর সাথে বেগম জিয়ার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। ঢাকার মির্জা আব্বাসের বউ আফরোজা আব্বাসের মাধ্যমেই এই সম্পর্কটা হয়।’

মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘মেয়র নির্বাচনের সময় আমরা (জামায়াত) হেল্প করেছি। বিষয়টা হলো এ রকম, আইভীর একটা ইয়ে (ওয়াদা) ছিল বেগম জিয়ার সাথে। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি বিএনপিতে জয়েন করবেন। আইভীর সাথে বেগম জিয়ার আন্ডারস্ট্যান্ডিং-টা এ রকম ছিল। সেই হিসাবে তৈমূরকে প্রত্যাহার করা হলো। রাতের মধ্যেই তৈমূরকে বসিয়ে দেওয়া হলো।’

চুনকা পরিবারের সঙ্গে জামায়াতের যোগাযোগের বিষয়ে অডিও রেকর্ডে মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘আমরা আলী আহমদ চুনকা (আইভীর বাবা) সাহেবের সাথে ছিলাম। আইভীর ফাদারের সময় আমরা রাজনীতি করেছি। আমরা ওনার সাথে আলোচনা করে, ওনারে সাথে নিয়া সাঈদী সাহেবের মিটিং করেছি এখানে। আমি চুনকা সাহেবের কাছ থেকে আদর্শ স্কুলের জায়গা নিয়েছি।’

আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘স্কুলটা প্রতিষ্ঠা করেছে মুজাহিদ সাহেব (আলি আহসান মুজাহিদ)। উনি এখানে ছিলেন, উনি প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং প্রিন্সিপাল ছিলেন। কিছু জায়গা কিনেছি আমরা, কিছু জায়গা ওনার (চুনকা) কাছ থেকে দলিল করে নিয়েছি। ওই সময়টা ছিল আওয়ামী লীগ হোক আর যেই হোক, তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক কো-অপারেশন ছিল। কিন্তু এখন সেটা আর নেই। আমরা আমলাপাড়া মসজিদে চুনকা সাহেবকে নিয়ে বসে আলোচনা করে সাঈদী সাহেবের মাহফিল করেছি সেই ঈদগাহে।’

জামায়াতের সঙ্গে আইভীর যোগাযোগ প্রশ্নে অডিও রেকর্ডে জামায়ত নেতা মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘আইভীর বাপের সাথে আমারও রিলেশন ছিল। মুজাহিদ সাহেবের ওয়াইফ আর আইভী ক্লাসমেট ছিল। আইভী আর মুজাহিদের বউ সমবয়সী এবং ক্লাসমেট। মুজাহিদ সাহেব যখন জেলে, তখন ওনার ছেলেদের জন্ম নিবন্ধনও এখানেই হয়েছে। অনেক ঘোরাঘুরি করে যখন পাচ্ছিল না, তখন মুজাহিদের ওয়াইফ আইভীকে বলার পরই আধঘণ্টার মধ্যেই এই জন্ম নিবন্ধন হয়ে গেল।’

বর্তমানে জামায়াতের সঙ্গে আইভীর যোগাযোগ প্রসঙ্গে মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘সম্পর্ক আছে, তবে এখন রিলেশনটা ওপেন হলে সমস্যা। আমরাও চাই না তাকে (আইভী) বিব্রত করতে। অ্যাভয়েড করে চলি। আমিও চলি, সেও চলে। তবে আইভীর মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। আমাদের যেকোনো কাজে অনুরোধ করলে ডাইরেক্ট, ইনডাইরেক্ট সে বসে সহজে করে দিছে। অনেক কাজ করে দিছে।’

মুজাহিদ-চুনকা সম্পর্কের বিষয়ে মঈনুদ্দিন বলেছেন, ‘১৯৭৮-৭৯ সালের দিকে চুনকা সাহেব পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আগে তো এখানে (নারায়ণগঞ্জে) কমিউনিটি সেন্টার ছিল না। চুনকা পাঠাগারে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হতো। এগুলোর আয়োজন চুনকা সাহেব করতেন। মুজাহিদ সাহেবকে প্রধান আলোচক হিসেবে তিনি সবগুলোতে রাখতেন। তখন পৌরসভার সেমিনারগুলো পাঠাগারের উদ্যোগে হতো। উনিই পাঠাগারের চেয়ারম্যান ছিলেন। উনিই উদ্যোক্তা, সব। উনি সভাপতি হতেন আর মুজাহিদ সাহেব প্রধান আলোচক হতেন।’

২০১১ সালের নির্বাচনের সময় আইভীর জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘ওই সময় সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও একটা যোগাযোগ ছিল। কারণ, আইভীর তো একটা অবস্থান আছে, তাকে আওয়ামী লীগই করতে হবে। আওয়ামী লীগ না করলে তার ইয়ে থাকবে না। তার সাথে যারা আছে তারাও তাকে আওয়ামী লীগের বাইরে যেতে দিবে না। আওয়ামী লীগ করে ব্যাকওয়ার্ড পজিশনে পড়ে এমন কাজ সে করবে না, আর আমরাও চাই না যে আইভী তার নিজের ইমেজটাকে নষ্ট করুক। এতে কোনো লাভ নেই, ও আওয়ামী লীগেই থাকুক। ও (আইভী) আওয়ামী লীগে থাকলে শামীম ওসমানদের সাথে যে দূরত্ব, এটা বহাল থাকলে বিএনপি-জামায়াত সবার জন্য সুবিধা আছে। ওকে আওয়ামী লীগে রাখতে পারলেই ভালো। ও যে কথা শামীমকে বলতে পারে, তা বিএনপির কেউ বলতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে বিএনপির কারো সাহস নাই। ও যে পারছে এটার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। সে শামীম ওসমান বা সেলিম ওসমান— কাউকে কোনো পাত্তা দেয় না।’

সম্পাদক/এসটি

পোস্টে মন্তব্য করে ফেসবুকে শেয়ার করুন