প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় ২১ আগস্টের রায়: তারেকের প্রত্যাশিত রায়ই হয়েছে

২১ আগস্টের রায়: তারেকের প্রত্যাশিত রায়ই হয়েছে

1353
২১ আগস্টের রায়: তারেকের প্রত্যাশিত রায়ই হয়েছে

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। স্থানীয় সময় সকালে লন্ডনে পলাতক তারেক জিয়ার বাসভবনে যান যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতৃবৃন্দ।

যুক্তরাজ্য বিএনপির একজন নেতা বলেছেন, ‘আমরা এটুকুই চেয়েছিলাম। ভাইয়াও (তারেক) আমাদের বলেছিল, যেন শুধু মৃত্যুদণ্ড না হয়। তারেকের বাসায় যাওয়া অন্য একজন নেতা বলেছেন, ‘তারেক জিয়া জানতেন এই মামলায় আদালত তাঁকে দণ্ড দেবেই। কিন্তু তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিলে তাঁর রাজনীতি কঠিন হয়ে পড়তো। এই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে তারেক খুশিই।’

অবশ্য বিএনপির যুক্তরাজ্য শাখার সভাপতি আবদুল মালেক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘এই রায় ফরমায়েশি রায়। বিএনপির বিরুদ্ধে সরকারের আক্রোশের প্রতিফলন ঘটেছে এই রায়ে।’

‘রায়ের কপি পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত আপিলের’

বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনের যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণা করার পর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আজকের রায়ে তারেক রহমানের মৃত্যু দণ্ড হওয়া উচিৎ ছিল। তার কারণ তিনিই হলেন এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা। আজকে আমরা মনে করি বাংলাদেশের জনগণ বিচার পেয়েছে। বিএনপি কোন দিনই আইনের শাসনের মানেনা। আইনের শাসনের ধারাবাহিকতায় যেসব মামলার বিচার হওয়া উচিৎ তাঁরা সেটা মানেন নাই।’

আইনমন্ত্রী আরও বলেন ‘আমরা জন-নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার পদক্ষেপ নিয়েছি। সেই জন্য আপনারা দেখছেন সকল আসামিকে সকল সুযোগ দেওয়ার পর, বিচার সম্পন্ন করার পরে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে তার রায় দিয়েছে। এই মামলায় রায় হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট। রায়ের কাগজপত্র পাওয়ার পর আমরা চিন্তা-ভাবনা করবো, তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী এবং কায়কোবাদকে যে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে, উচ্চ আদালতে তাদের ফাঁসির জন্যে আপিল করবো কি না?

বিশ্বে মৃত্যুদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

বাংলাদেশের ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে আজ। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। যাবজ্জীবন হয়েছে আরও ১৯ আসামির। এছাড়া ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে যখনই কোনো মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয় বা কার্যকর করা হয়, তখনই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সোচ্চার হয়ে ওঠে। যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের সময়ও আমরা দেখেছি এই সংস্থাগুলো বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এমনকি যুদ্ধাপরাধিদের শাস্তি বাতিল করতে প্রকাশ্যে আবেদনও করেছিল তারা।

সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে মনে হয় বাংলাদেশ যেন মৃত্যুদণ্ডে বিশ্বে শীর্ষে অবস্থান করছে। কিন্তু আমাদের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায়, মৃত্যুদণ্ডের দিক থেকে শীর্ষ দশ দেশের তালিকাতেই নেই বাংলাদেশ।

মৃত্যুদণ্ডে শীর্ষ দেশ কোনগুলো? এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানই বা কোথায়? এ বিষয়গুলোই এখানে তুলে ধরা হল:

১. চীন: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় চীনে। তবে মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে দেশটি সরকারিভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করে না। একারণে অ্যামনেস্টি বিশ্বব্যাপী মৃত্যুদণ্ডের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে গত বছর দেশটিতে ১ হাজারের বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। এই সংখ্যা বিশ্বের বাকি দেশগুলোতে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি। দেশটিতে বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমে অথবা গুলি করে এই দণ্ড কার্যকর করা হয়।

২. ইরান: অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, গতবছর ইরানে ৫০৭ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটিতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানা গেছে। ২০১৬ সালে ইরানে অন্তত ৫৬৭ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এর আগে ২০১৫ এ সেখানে ৯৭৭ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানা যায়।

৩. সৌদি আরব: ২০১৭ সালে সৌদি আরবে অন্তত ১৪৬ টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ২০১৬তে এই সংখ্যা ছিল ১৫৪ এবং ২০১৫ এ ১৫৮। দেশটিতে শিরচ্ছেদের মাধ্যমে এই দণ্ড কার্যকর করা হয়।

৪. ইরাক: ইরাকে ১২৫ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। দেশটিতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ঝুলন্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময় পরে নামিয়ে হাত পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

৫. পাকিস্তান: অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, গতবছর পাকিস্তানে ২০০ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ৬০ জনেরও বেশি মানুষের। ২০১৬ সালে দেশটিতে অন্তত ৮৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ২০১৫ তে এই সংখ্যা ছিল ৩২৬।

৬. মিসর: অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, মিসরে ২০১৭ সালে ৪০২ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। আর ৩৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৪। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যশনালের মতে ২০১৫ সালে মিসরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ছিল ২২টি।

৭. সোমালিয়া: আফ্রিকার অন্যতম দরিদ্র দেশ সোমালিয়া। দেশটিতে ২০১৭ সালে অন্তত ২৪জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যশনাল।

৮. যুক্তরাষ্ট্র: সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যেখানে ফায়ারিং স্কোয়াড, ইলেকট্রিক চেয়ার, গ্যাস চেম্বার এই তিন পদ্ধতিতেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। দেশটিতে ২০১৭ সালে ২৩ জন অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হয়।

৯. জর্ডান: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যশনালের তথ্য অনুযায়ী, গতবছর জর্ডানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ছিল ১৫টি। এরমধ্যে ১০ জনকেই সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে এই শাস্তি দেওয়া হয়। আর ২০১৬ সালে দেশটিতে একটিও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।

১০. সিঙ্গাপুর: ২০১৭ সালে সিঙ্গাপুরে ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর আগের বছর ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী শীর্ষ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাবধান অনেক। এদেশে ২০১৭ সালে মাত্র ৬ টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটে। বলাই বাহুল্য, এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশগুলো থেকে অনেক কম। তবুও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কেন বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া নিয়েই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।