প্রচ্ছদ বিনোদন ‘জান্নাত’ দর্শকদের আকাঙ্খা পূরণ করবে

‘জান্নাত’ দর্শকদের আকাঙ্খা পূরণ করবে

168
‘জান্নাত’ দর্শকদের আকাঙ্খা পূরণ করবে

সাইফুল বাতেন টিটো

একটি টেলিভিশন চ্যানেল কর্তৃপক্ষের সুযোগ থাকে দর্শকদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার। আমার মনে হয় বর্তমানে সেই জায়গাটায় আছে টেলিভিশন নাটক যা একক বা ধারাবাহিকরূপে নির্মিত হয়। তবে হ্যাঁ, একক নাটক একটু পুরাতন হলেও ধারাবাহিক নাটকের ইতিহাসও কিন্তু দুই-চার-দশ বছরের নয়। বহু পুরনো।

সেই টেলিভিশন শুরুর দিকে বাংলাদেশি সাধারণ দর্শক দেখতে পারে এমন প্রতিদিনের ধারাবাহিক আমরা প্রথম পাই কেবলের মাধ্যমে, ইন্ডিয়ায়, হিন্দিভাষায়। সে সিরিয়াল আমাদের বিনোদনে ভিন্নস্বাদ এনে দিয়েছিলো বটে কিন্তু তা আগ্রাসী খেতাবও পেয়েছে। কারণ কী? সেটা আমরা একটু পরে খুঁজি।

এতোদিন এদেশের দর্শক ধারবাহিক বলতে যা দেখেছে তা হলো সাপ্তাহিক ধারাবাহিক। সপ্তাহে একদিন। অন্যভাষায় যা দর্শককে টানলেও ভাষাগত কারণে সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারতো না। বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রডিউসার নওজেশ আলী খান টেলিভিশনে প্রথম ধারারাবাহিক নাটক চালিয়ে দর্শকদের একটা ভিন্নস্বাদ দিলেন আর দর্শকও তাতে মজে গেলো। আমি তখন প্রায় শিশু। হলে কী হবে? আমিও মজে গেলাম।

রূপনগর, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই এসব ধারাবাহিক নাটক দেখার জন্য আমরা বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে আগে থেকে ব্যাটারির ব্যবস্থা করে রাখতাম। মনে আছে, যখন কোথাও কেউ নেই নাটকটি চলে তখন একটু আধুনিক মফস্বলের মেয়েরা অনেকেই সুবর্ণা মুস্তাফার মতো করে শাড়ি পরত, যুবকরা বাকের ভাইয়ের মতো চুল-দাড়ি রাখত। অন্য কার কথা বলব?

আমি নিজেই মনে মনে ভাবতাম আমি বড় হয়ে বাকের ভাইয়ের মতো চুল-দাড়ি রাখব। এখন তাই করছি। শুধু আমি নই, আমাদের প্রজন্মের অনেকেই বাকের ভাই দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এখনও ওরকম চুল-দাড়ি রাখছে যা কিনা ঐ সময়ের যুবকদের থেকেই শুরু হয়েছিলো। খারাপ- ভালো জানি না তবে এটা ছিলো তৎকালীন ঐ ধারাবাহিক নাটকের প্রভাব।

ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো সেই ট্রেন্ড, সেই সংলাপ, সেই রস। বাকের ভাইয়ের যাতে ফাঁসি না হয় সেজন্য মিছিল নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছিলো তা আজ যেমন লিখিত হচ্ছে সেসময়েও প্রধান দৈনিকের শিরোনাম হয়েছিলো এবং ভবিষ্যতেও ইতিহাসে ঠাঁই করে নেবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এদেশে যেন হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া অমন টিভি সিরিয়াল কেউ বানাতেই পারে না বা লিখতেও পারে না। শেষ যে ধারাবাহিকটি দেশজুড়ে সফলতা পেয়েছিলো তাও হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও মনির হোসেন জীবন পরিচালিত নাটক আজ রবিবার।

নাহ্! এরপর আর মনে পড়ে না। আমরা দর্শকরা বরাবরই বিদেশি সিরিয়ালের দিকে ঝুঁকে ছিলাম। দেশে আসলো ডাবিং করা ধারাবাহিক ‘সোর্ড অব টিপু সুলতান’। আহারে! কী সেই গল্প!

মনে আছে, ১৯৯৪ সালে যেদিন টিপু সুলতান ধারাবাহিকের অন্যতম চরিত্র গাজী-কালুকে প্রতারণা করে হত্যা করা হয়, তার পরেরদিন আমার বৃত্তি পরীক্ষা ছিলো। আমি সারারাত কেঁদেছিলাম। এরপর আসলো অ্যারাবিয়ান নাইটস-এর আলিফ লায়লা, দ্যা নিউ অ্যাডভেঞ্চার অব সিন্দবাদ, আকবর দ্যা গ্রেট, মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড, স্পেলবাইন্ডার, টিম নাইটরাইডার, রবিন হুড- সবগুলোই মারমার কাটকাট হিট সিরিয়াল।

বিটিভির এই ডাবিংকৃত ধারাবাহিক বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়লো “তেলেসতে হোসরুবা” নামক একটা সিরিয়াল অাসার পরে। সেই ভাষান্তরিত ধারাবাহিকের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিলো ডাবিং। আমার মনে আছে, আব্বু বলতেন ‘কী দেখোস? মুখ খোলার আগে কথা শুরু হয় আর মুখ বন্ধ করলেও কথা বাইর হয়?’ আব্বুর ঐ রসিকতায় ঐসময়ের দুর্বলদিকটা ধরতে না পারলেও এখন বুঝতে পারি সমস্যাটা কোথায় ছিলো।

সেই সমস্যা কাটিয়ে দীর্ঘদিন পরে বাংলাদেশে এলো এক ঝকঝকে, তকতকে ভিন্নস্বাদের তুর্কি ধারাবাহিক সুলতান সুলেমান। যা এসেই মন কেড়ে নিলো এদেশের কোটি দর্শকের। অসাধারণ ডাবিং, শুদ্ধ উচ্চরণ, চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠ সবমিলিয়ে এককথায় অসাধারণ এক ধারাবাহিক সুলতান সুলেমান। তারপর একদিন নটে গাছটি মুড়োলো, সুলতান সুলেমানের গল্পটিও ফুরালো। এরপর অনেক সিরিয়াল এলো, গেলো দেখলাম। কয়েকটি মোটমুটি ভালো লাগলো। কিন্তু কেন যেন দর্শককে আকৃষ্ট করার মতো বিষয়টি আর খুঁজে পেলাম না।

‘জান্নাত’ নামের আরেকটি তুর্কি ধারাবাহিকের খবরে চোখ পড়ল কয়েকদিন আগে। টিজারটা দেখলাম। বেশ ভালো লাগলো। ফোন দিলাম একজনকে যিনি এই সিরিয়ালটির সাথে সরাসরি যুক্ত। দুয়েকটা কথা বলতেই বললেন ‘ফোনে তো সব বলা সম্ভব না, একদিন সময় করে আসেন আমাদের অফিসে। কয়েকটি পর্ব প্রস্তুত হয়ে আছে। আগে দেখেন, তারপর ভালোমন্দ বলেন।’ হাসতে হাসতে বললেন উনি। আমারও মনে হলো খারাপ না। হতেই পারে। দুই বন্ধুকে নিয়ে হাজির হলাম।

প্রথম পর্বের তৃতীয় মিনিটেই আমাকে আটকে ফেললো গল্পটা। না, কোলকাতার জি-বাংলা জাতীয় গল্প এটি নয়। সম্পূর্ণ পারিবারিক ঘটনা হলেও একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকে বলা হয়েছে গল্পটা। খুবই সহজসরল কাহিনি কিন্তু চুম্বকের মতো আটকে রাখে।

একটি মেয়ের গল্প। পারিবারিক গল্পে সাধারণত মেয়েদের হিরো হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এখানেও তাই হয়েছে। তবে গদগদ উপায়ে নয়। সাধারণত আমরা যেটা দেখি, ধারাবাহিকে অযথা অযৌক্তিক মিউজিকের ব্যবহার, বিভিন্ন ফালতু ইফেক্ট আর বেহুদা সাজগোজ, হাজারো অলঙ্কার; এসব এই ধারাবাহিকে দেখিনি, দেখিনি ঘটনাগুলোকে অযথা টেনে নেওয়ার প্রবণতা।

আমি একটি পর্ব দেখা শেষ করে বললাম- আরেকটি পর্ব দেখতে পারি? কর্তৃপক্ষ সহাস্যে চালিয়ে দিলো। মুখে বিজয়ের হাসি, নাহ্ দর্শককে আকর্ষণ করতে পেরেছি।

পরের পর্বটিও দেখলাম। সবার অভিনয়ই আমাকে মুগ্ধ করেছে। জান্নাত চরিত্রটি যিনি করেছেন, তিনি যেমন অসাধারণ সুন্দরী তেমনি অসাধারণ অভিনেত্রী। নিকোলাস কিডম্যানের মতো দেখতে হিরোর প্রেমে অনেক তরুণী পড়বেন বলে আমার ধারণা। নেগেটিভ ক্যারেক্টার আমাকে সবসময়ই টানে। মনে হয় এখানে অভিনেতার বৈচিত্র্য দেখানোর অনেক সুযোগ আছে। সেদিক থেকে বলতে গেলে নেগেটিভ ক্যারেক্টরগুলোও আমাকে টেনেছে। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে শিল্প-নির্দেশনা আর ক্যামেরার কাজ। মনে হয়েছে প্রতিটি ফ্রেম যত্ন নিয়ে ধরে ধরে কাজ করা হয়েছে। সাথে তুরস্কের অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ তো রয়েছেই।

আমি ধারাবাহিকটির কাস্টিং ডিরেক্টরকে ধন্যবাদ দিতে দিতে তৃতীয় পর্বটিও চালাতে বললাম মুচকি হেসে। ভালোই তো লাগছে। এই সিরিয়ালে অন্যতম ভালোলাগার আরেকটি দিক হলো পরিমিতিবোধ। পরিচালককে আমি অবশ্যই ধন্যবাদ দেবো তার পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত কাজের জন্য।
তৃতীয় পর্বে গিয়ে গল্পে আরও টুইস্ট এলো। সেটা আমি এখানে বলতে চাই না। তবে তা সব শ্রেণির দর্শককে মুগ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস। আমরা নিজেরাই ফোল্ডারে থাকা বাকি পর্বগুলো চালিয়ে মোট পাঁচটি পর্ব তৃপ্তি নিয়েই দেখে ফেললাম।

জান্নাত ধারাবাহিকটির বিষয়ে যেকথাটি আমি বিশেষভাবে বলতে চাই তা হলো এর ডাবিং। এককথায় বলব অসাধারণ ডাবিং। যেমন যথাযথ কণ্ঠ, তেমনি পরিষ্কার ও শুদ্ধ উচ্চারণ, কোথাও অর্থের গোজামিল আছে বলে মনে হয়নি। যে কেউ দেখলে বলবে অনেক যত্ন নিয়ে ডাবিং করা হয়েছে। ভাষান্তরের ক্ষেত্রে আরেকটি দিক আমার কাছে ভালো লেগেছে। তা হলো প্রচলিত ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। অনেক সিরিয়ালে দেখেছি অপরিচিত বাংলা শব্দ জোর করে ব্যবহার করা হয় যা শুনতে কানে লাগে। মনে হয় আমরা জোর করলেই চেয়ারটা কেদারা হয়ে যাবে। একটি মেয়ে একটি ছেলের কাছ থেকে চলে যাওয়ার সময় হাত নেড়ে বলছে ‘বিদায় বিদায়’ বিষয়টি আমার কাছে হাস্যকর লাগে। সেটি এখানে করা হয়নি। প্রচলিত ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে।

তুর্কি ধারাবাহিকগুলো সারা পৃথিবীর বাজার দখল করে রেখেছে একথা চোখ বন্ধ করে বলা যায়। পৃথিবীতে অর্ধশত’রও বেশি দেশে বিভিন্ন তুর্কি প্রযোজনা দোর্দণ্ড প্রতাপে ব্যবসা করে চলেছে। তুরস্কের জাতীয় আয়ের একটা বড় অংশ আসে এইসব ধারাবাহিক রপ্তানি করে। কারণ কী? কারণ হচ্ছে কাজের প্রতি তাদের যত্ন ও ভালোবাসা। আমার ধারণা জান্নাত-এর কাজও তারা অনেক যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে করেছে। সেটি বাংলাদেশে এনে অনেক যত্নসহকারে ডাবিং করেছে বঙ্গবিডি। যা সব মিলিয়ে আমার কাছে ভালো লেগেছে। আমার বিশ্বাস, এটি অন্য দর্শকদেরও ভালো লাগবে এবং ‘জান্নাত’ দর্শকদের আকাঙ্খা পূরণ করতে সক্ষম হবে।

নোট: জান্নাত সিরিয়ালটি অক্টোবরের ১৪ তারিখ থেকে রবি থেকে বৃহস্পতিবার রাত ৯:৩০-এ এটিএন বাংলায় প্রচারিত হবে।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী।

সম্পাদক/এসটি