প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য ‘আমার প্রতি যে অবিচার করা হচ্ছে, এর ফল জিয়াকে ভোগ করতে হবে’

‘আমার প্রতি যে অবিচার করা হচ্ছে, এর ফল জিয়াকে ভোগ করতে হবে’

2321
‘আমার প্রতি যে অবিচার করা হচ্ছে, এর ফল জিয়াকে ভোগ করতে হবে'

১৯৭৬ সালে ১৭ জুলাই। নাজিমউদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্নেল তাহেরের বিচার চলছিল। প্রহসনের ওই বিচারের তীব্র প্রতিবাদ করে কর্নেল তাহের বলেন, এই বিচার আমি মানি না।

বীরউত্তম এই মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল বলেছিলেন, ইতিহাস বড়ই নির্মম। আজ আমার প্রতি যে অবিচার করা হচ্ছে, এর ফল জিয়াকে ভোগ করতে হবে।’

প্রহসনের বিচারের তিনদিন পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই ফাঁসি হয় কর্নেল তাহেরের। কিন্তু প্রয়াত এই মুক্তিযোদ্ধা কর্নেলের কথাই যেন আজ সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। জিয়াউর রহমান মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে তাঁর স্ত্রী ও তাঁরই প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আজকের বিচার বসল কারাগারে।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার শুনানির জন্য আজ বুধবার আদালত বসেছিল পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরানো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগারে। আসামি বেগম জিয়া হুইল চেয়ারে পাশের কারাকক্ষ থেকে হাজির হন আদালত কক্ষে। আজ কারগারেরর যে স্থানটিতে খালেদা জিয়ার জন্য আদালত বসেছিল, ঠিক সেখানেই ১৯৭৬ সালে ১৭ জুলাই কর্নেল তাহেরের প্রহসনের বিচার মঞ্চায়ন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার উত্থানের মধ্য দিয়ে একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। এই বিপ্লবের কারণেই সামরিক সরকার তথা জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছিলেন। অথচ সেই বিপ্লব সংঘটিত করার অপরাধে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের ও তাঁর রাজনৈতিক দল জাসদের নেতৃবৃন্দকে এক প্রহসনের বিচারের মুখোমুখি করে তৎকালীন সামরিক সরকার।

১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই কারাগারে তাঁর বিচার করা হয়। বিচারে কর্নেল তাহেরকে বেআইনিভাবে ফাঁসি দেওয়ার আদেশ আসে। আর এই আদেশের মাত্র তিন দিনের মাথায় ২০ জুলাই দিবাগত রাত ৪টায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৭ নভেম্বরের ওই বিপ্লবের পর জিয়াউর রহমান ভোল পাল্টে ফেলেন। জাসদ ও তার অঙ্গসংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বকে জেলে পুরতে শুরু করেন। কর্নেল তাহেরকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁর চারপাশে জড়ো করতে থাকেন পাকিস্তান প্রত্যাগত প্রতিক্রিয়াশীল সেনা কর্মকর্তাদের, এর সঙ্গে যুক্ত হয় খোদ জিয়াউর রহমানকে যাঁরা বন্দি করেছিল তাঁরা। এরই ধারাবাহিকতায় কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয় ১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর। সামরিক এক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

১৯৭৬ সালের ২১ জুন এক নম্বর বিশেষ সামরিক আদালতে ১২১-এর (ক) ধারায় কর্নেল তাহের, সিরাজুল আলম খান, মেজর এমএ জলিল, আ স ম আব্দুর রব, হাসানুল হক ইনুসহ ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিকে আসামি করে গোপন বিচার শুরু হয়।

এই বিচারে ১৭ জুলাই এক রায়ে মেজর এমএ জলিল এবং কর্নেল তাহেরের বড় ভাই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আবু ইউসুফ বীরবিক্রমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও তাঁদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। আ স ম আবদুর রব, হাসানুল হক ইনু ও ড. আনোয়ার হোসেনকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ডসহ অন্য ১৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার মাত্র ৭২ ঘণ্টা পর রায় কার্যকর করা হয়।

সামরিক আদালতে যে ১২১ (ক) ধারায় কর্নেল তাহেরকে সাজা দেওয়া হয়েছিল তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি নির্দিষ্ট ছিল যাবজ্জীবন পর্যন্ত। কর্নেল তাহেরের মৃত্যুর ১০ দিন পর ৩১ জুলাই সামরিক অধ্যাদেশ জারি করে যাবজ্জীবনের স্থলে মৃত্যুদণ্ড বসানো হয়।

তাহেরসহ জাসদ নেতৃবৃন্দের বিচারের জন্য ১৯৭৬ সালের ১৪ জুন বিশেষ সামরিক আইন ট্রাইব্যুনাল জারি করা হয়েছিল। ১৫ জুন ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শন করেন। ২১ জুন বিচার শুরু হয়। অধ্যাদেশ জারি, ট্রাইব্যুনাল গঠন ও ডিআইজি প্রিজনের কক্ষকে আদালত হিসেবে প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া থেকে স্পষ্ট হয় যে, সমগ্র বিচারটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। `দণ্ড` নির্ধারিত হয়েছিল আগেই।

শুধু তাই নয় একই অভিযোগে সেনাবাহিনীর ১৩ হাজার জোয়ানকে আটক করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া, এর মধ্যে অনেকেকে ফাঁসিও দেওয়া হয়। কারাগারেই আদালত বসে, বিচারের নামে অভিযুক্তকে শুধু জানিয়ে দেওয়া হয় তাঁর শাস্তি। ফাঁসি হলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই তা কার্যকর হয়। হাজার হাজার সেনা জওয়ানের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে কারাগারের দেয়াল।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এমন অনেক ইতিহাসেরই সাক্ষী। জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এই কারাগারেই। আবার ১৯৭৭ সালের জাপানী বিমান হাইজ্যাক করে বাংলাদেশে অবতরণের ঘটনাও সামরিক বাহিনীর অনেকের ফাঁসি হয়। সেই সাজাও কার্যকর হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

১৯৭৬ সালে ১৭ জুলাই সামরিক আদালতে অভিযোগ অস্বীকার করে কর্নেল তাহের তাঁর জবানবন্দিতে বলেছিলেন, ‘জনাব চেয়ারম্যান ও ট্রাইব্যুনালের সদস্যবৃন্দ, আপনাদের সামনে দণ্ডায়মান এই মানুষটি, যে মানুষটি আদালতে অভিযুক্ত, সেই একই মানুষ এই দেশের মুক্তি ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য রক্ত দিয়েছিল, শরীরের ঘাম ঝরিয়েছিল। এমনকি নিজের জীবন পর্যন্ত পণ করেছিল। এটা আজ ইতিহাসের অধ্যায়।

একদিন সেই মানুষটির কর্মকাণ্ড আর কীর্তির মূল্যায়ন ইতিহাস অতি অবশ্যই করবে। আমার সব কর্মে, সমস্ত চিন্তায় আর স্বপ্নে এ দেশের কথা যেভাবে অনুভব করেছি, তা এখন বোঝানো সম্ভব নয়।’

কর্নেল তাহের আরও বলেছিলেন, ‘ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! যে সরকারকে আমিই সরকারে বসিয়েছি, যে ব্যক্তিটিকে আমিই নতুন জীবন দান করেছি, তারাই আজ এই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আমার সামনে এসে হাজির হয়েছে। এদের ধৃষ্টতা এত বড় যে তারা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো আরও অনেক বানানো অভিযোগ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা করেছে।’

কর্নেল তাহেরের জবানবন্দিতে বলা কথাগুলো আজকে পুনরায় ফিরে এসেছে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ইতিহাস বড়ই নির্মম।

সম্পাদক/এসএ