প্রচ্ছদ চিলেকোঠা কিশোর কারুণিকের ছোটগল্প | অভাব

কিশোর কারুণিকের ছোটগল্প | অভাব

54
কিশোর কারুণিকের ছোটগল্প | অভাব

বাবার বুকের ব্যাথায় খুব বেশি হয়ে গিয়েছিল। বাবাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল তাপস। ডাক্তার তার ফিস ছাড়া রোগী

দেখবেন না। বড় ডাক্তার। ডাক্তার ফিস ৫০০ টাকা। তাপস বুঝতে পারলো না এখন কী করবে। ওর কাছে কে যেন বলল সরকারী হসপিটালে নিয়ে যাও। রোগীকে আবার ভ্যানে তুলে সরকারী হসপিটালের দিকে ভ্যান ছুটছে, হঠাৎ বাবার মুখ ঘুরে পড়লো। তাপস বুঝতে পারলো বাবা মারা গেলেন। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো তাপস। আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো।

তাপসদের সংসারে বাবাই ছিল একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। তাপসের বয়স ১৫ বছর। পাড়া-প্রতিবেশিদের সহযোগীতায় মরদেহ গঙ্গাঁ দেবার ব্যবস্থা হলো। ধর্মীয় বিধান মতো কাঁচা গলায় দিয়েছে তাপস। সংসারে বোন আর মা। ঘরে একমুঠো চাল নেই। এই সময় আতপ চালের ভাত খেতে হয়, ধর্মীয় কিছু বিধান মানতে হয়। পাড়া-প্রতিবেশিদের কথা মতো বাবার শ্রাদ্ধক্রিয়ার কাজ পনের দিন করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

প্রথম কয়েকদিন পাড়া-প্রতিবেশিরা আতপ চাল আলু-পটল দিয়ে যায়। ঐ দিয়েই চলে যায় পাঁচদিন। আজ সকাল থেকে পথের দিকে চেয়ে আছে কেউ যেন আসে। পৌষ মাস। সকালে স্নান করে গায়েই পরনের ধূতিটা শুকানো হয়ে গেল। দুপুর ২টা বেজে গেল। কিন্তু কারোর আসার কোন খোঁজ নেই। খিদেই ছটপট করছে ছোট বোন, ওর বোধ হয় খুব খিদে লেগেছে। এভাবেই চলে গেল দিনটা। পরের দিন আর শরীর চলে না। উঠানে বরই গাছ। তাপস স্নান করে গাছ ঝাকি দিলো, বেশ কিছু কুলফল পড়লো। ঐ দিয়েই ঐ দিনটা চললো। ঘরের পাশে কলা গাছের ঝাড়, গাছে কলা ধরেছে কিন্তু এখনো পক্ত হয় নি। কী আর করা, কলার কান কেটে কলা সিদ্ধ করে খেয়ে ১৪ দিন পার হলো। তবু কারো কাছে কিছু চায়নি তাপস। ওর খুব লজ্জা। পাশের বাড়ির একজন এসে বললো, তোর বাপের শ্রাদ্ধনুষ্ঠান না করলে তোর বাপের নরকেও ঠাঁই হবে না।

তাপসের মা ওদের অভাবের কথা বললো। লোকটি বুদ্ধি দিলো মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে। তাপস প্রথমে রাজি ছিল না। কিন্তু বাবার নরকেও ঠাঁই হবে না ভয়ে লোকটির কথামতো মানুষের কাছে বাজারে দোকানদার দের কাছে সাহায্য চাইলো।

মানুষজন তাদের সাধ্যমত সাহায্য করলো। ঠাকুর মশায় বড় একটি ফর্দ ধরিয়ে দিয়ে বললে, “ফর্দের একটিও জিনিস যেন বাকি না থাকে তাহলে তোমার বাবার গতি হবে না। তাপস ফর্দের লেখামতো সব জিনিস-সদয় কিনলো। দশ কেজি সিদ্ধ চাল, পাঁচ কেজি আতপ চাল, আলু, পঠল, ধূতি গামছা ইত্যাদি ।

আজ শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। আজ ৯/১০ দিন অন্ন পেটে পড়েনি, ও ভেবেছে ভালোই হলো যে সব জিনিস কিনা হলো ও দিয়েই ওদের সংসার বেশ কিছুদিন চলে যাবে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে গেল। হাতে আর কোন টাকা নেই। বোনটা সকাল থেকে কাঁদছে, মা’র মুখে কোন কথা নেই। ঠাকুর মশায়ের আর্থিক অবস্থা ভালো। ঠাকুর মশাই কলাপাতা করে কী যেন তাপসের হাতে দিয়ে বলল, “নদীতে দিয়ে স্নান করে আসো। তাপস ঠাকুর মশায়ের কথা মতো তা করতে চললো। সঙ্গে ছোট বোন গেল।

বোন বললো, “দাদা খুব খিদে লেগেছে!” -“চল বাড়ি গিয়ে রান্না করব।”
বাড়ি ফিরে এসে দেথে ঠাকুর মশায় চাল ডাল পটল সামগ্রী তার পুটলায় বেঁধে বসে আছে। তাপস বললো, “কাকাবাবু আপনি সব চাল নিয়ে যাচ্ছেন?” -“হ্যাঁ, এগুলো ব্রাহ্মণের পাওনা। আমার দক্ষিণা দাও।
-“দক্ষিণা কোথায় পাব?” -“আমার দক্ষিণা না দিলে তোর বাপ নরকগামি হবে।” -“কী বলছেন কাকাবাবু?”

ঘরে ঢুকে কিছু কয়েন এনে ঠাকুর মশায়কে দিতে গেল। ঠাকুর মশায় রেগে উঠলো। তাপসকে মারতে গিয়ে ঠাকুর মশাই পড়ে গেল। ঠাকুর মশাই আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। ঠাকুর মশায়ের পা চেপে ধরলো তাপসের মা। ব্রাহ্মণ পা সরিয়ে নিলো, তাপসের মাথা গরম হয়ে গেল। তাপস চাল ডাল পটলের পুটলা কেড়ে নিলো, বললো, “এই চাল আমি ভিক্ষা করে এনেছি, আপনাকে দেব না, আমরা আজ দশদিন না খেয়ে আছি; আমার বোন খিদেয় কাঁদছে; আপনার তো অনেক আছে!”

আশেপাশে ছড়িয়ে পড়লো তাপস ঠাকুরমশাইকে মেরেছে। কিছু লোক এসে তাপসকে আচ্ছামতো লাটি পেটা করলো। ঠাকুর মশায় তার পুটলাগুলো নিয়ে তাপসকে অভিশাপ দিতে দিতে তার বাড়ির পানে রওনা দিলো। লোকগুলো নানাকথা বলতে বলতে চলে গেল। তাপসকে জড়িয়ে ধরে বোন-মা অঝরে কেঁদে উঠলো!

পোস্টে মন্তব্য করে ফেসবুকে শেয়ার করুন