প্রচ্ছদ চিলেকোঠা উপন্যাস ধারাবাহিক উপন্যাস: জনয়িতা | পর্ব ৩১ | আফরোজা অদিতি

ধারাবাহিক উপন্যাস: জনয়িতা | পর্ব ৩১ | আফরোজা অদিতি

58
ধারাবাহিক উপন্যাস: জনয়িতা | পর্ব ৩১ | আফরোজা অদিতি

মোমেন সুস্থ হয়ে ওঠে। ব্যবসা শুরুর মুহূর্তে যে খামটি দিয়েছিল সামিনা, ওটি খুলে দেখেনি; না করেছিল সামিনা।

ফাতেমা অবশ্য যেদিন এই খামের কথা জানতে পেরেছিল সেদিনই বলেছিল, ‘খুলে দেখলেন না, ওটার মধ্যে সাপ-ব্যাঙ কী আছে!’ ওর কথায় হেসেছিল মোমেন। ‘খুলে দেখতে ইচ্ছা নেই, সময় হলে দেখবো। সামিনা ওটি দেওয়ার সময় খুলে দেখতে বারণ করেছিল, বলেছিল যখন বলবো তখন দেখবে! খামটি দেখার বিষয়ে সামিনার সঙ্গে কোন কথাই তো হয়নি আমার, তাই!’ খাম দেয়া-নেয়া গত বছরের ঘটনা। এ বিষয়ে সামিনার সঙ্গে আর কোন কথাও হয়নি; ওরও এই খামটি খুলে দেখা হয়নি এখনও। প্লেবয় টাইপ ছেলে হলেও নিজস্ব একটা বিশ্বাস একটা দায়বদ্ধতা তো আছে, আছে মূল্যবোধ। মোমেন এই বিশ্বাস থেকে সরতে পারেনি কখনও! তাছাড়া সামিনার সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারেও অনিশ্চিয়তার মধ্যে ছিল; সেই কারণেই ভেবেছিল বিয়েটা যদি না হয় ঐ খাম ফেরত দিবে সামিনাকে। হাসপাতালে থাকার সময়ে সামিনাকে কথাটা বলতে চেয়েছিল কিন্তু তার আগেই সব গোলমাল হয়ে গেল। রীণা আসাতে এলোমেলো হয়ে গেল; সবকিছু মাটি করে দিলো রীণা। এবারেও হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে ভেবে রেখেছে বাড়ি ফিরে খামটি দিয়ে দিবে সামিনার ভাই, জহরতকে। এখন সামিনা নেই; এই খামের প্রকৃত মালিক সামিনার ভাই। জহরত নিলে ভালো, না নিলে খামটি নিয়ে কী করবে ভেবে দেখবে। তার আগে খামটি খুলে দেখতে হবে। আলমারীতে আছে; আজ অফিস ফেরৎ খুলে দেখবে! ফাতেমার ভাষায় সাপ-ব্যাঙ কী লুকিয়ে আছে ওর ভিতর দেখা প্রয়োজন; ফাতেমার কথায় মনে হয়েছে খামটি খুলে দেখা প্রয়োজন; খুলে দেখবে। ফাতেমার কথায় যুক্তি আছে। ওর যুক্তিতে খাম খুলে দেখার বিষয়টা এড়িয়ে যেতে পারছে না!

অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে মোমেন। এমন সময় ড্রাইভার এলো একটি চিঠি নিয়ে। মুখবন্ধ চিঠি। চিঠি খুলে অবাক হয় মোমেন। হাত কাঁপছে। এ কী সম্ভব! চা নিয়ে ঘরে ঢোকে ফাতেমা। ‘কী হয়েছে আপনার’ ব্যস্ত হয় ফাতেমা। ‘শরীর খারাপ। এইতো দেখে গেলাম ভালো।’ ফাতেমার দিকে চিঠিটি বাড়িয়ে দেয় মোমেন। কোন কথা বলে না। চিঠি পড়ে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায় ফাতেমার। ফাতেমা ভেঙে পড়ে না। ধীরস্থিরভাবে বলে, ‘আপনি শুয়ে পড়–ন। ভাববেন না কিছু। আল্লা যা করেন ভালোর জন্যই করেন।’ মোমেন দুই হাতে মাথা গুঁজে বসে থাকে। মাথা নিচু করেই বলে, ‘কোন ভালোটা আমার করেছে তোমার আল্লা বলো আমায়।’ ‘এমন কথা বলবেন না, কখনও বলতে নেই’ কথাটা বলেই মুখে হাত চাপা দেয়। ‘আল্লার ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে নাই। সব সময় মনে করবেন আল্লা যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আপনার ভালো হবে।’ ‘তোমার হতে পারে আমার নয়’। একগুঁয়ে জেদি বালকের মতো ঘাড় গোঁজ করে থাকে মোমেন। মোমেনের এই অবস্থা দেখে কষ্ট পেলেও বুঝতে দেয় না ফাতেমা। বলে, ‘আমি গাঁয়ের মানুষ, তার ওপরে গরীব, গরীবের তো আল্লাই ভরসা! আমারও তাই। আপনি তো ভালো জানেন, গরীবের আল্লা ছাড়া আর দেখার কেউ নাই।’ মোমেন অবাক হয়। এই কষ্টের মাঝেও ওর কথা শুনে বিস্মিত হয় মোমেন।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ওর মুখের দিকে; তারপর উঠে দাঁড়ায়। বলে, ‘অফিস থেকে ঘুরে আসি। না গেলে তো সব কথা জানতে পারবো না। কেন আমাকে স্যাক করা হলো সেটাও জানা জরুরি।’ ফাতেমা এ কথার কী জবাব দেবে, দেওয়ার আছেই বা কী? মাথা নেড়ে সায় দেয়। দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। বাড়ি নেই রীণা; দরোজা বন্ধ করে ফাতেমা ফিরে আসে নিজের ঘরে। রীণা গেছে কোথায় ? কোথায় যায় কী করে এটা জানা খুব দরকার। কিছু একটা ঘোঁট পাকাচ্ছে বুঝতে পারছে, কী সেটা তাই ধরতে পারছে না। ছেলে হওয়ার পর থেকে দেখতে পারে না ওকে! সারাক্ষণ দূর-দূর-ছাই-ছাই করে! ছেলেদের কোলে নেয় না, যতœ-আত্তি করা তো দূরের কথা! মাঝে মাঝে মনে হয় এসব শিমুলের জন্য! কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে তা কি করে হয়! সন্তান সন্তান করেই তো এতো টাকা খরচ করেছে; মহব্বতকে দিয়েছে, ডাক্তারকে দিয়েছে! দিচ্ছে ওকেও। এতো তোড়জোড় করেছে, এই সন্তান সন্তান করের গ্রামে গিয়ে দিনের পর দিন থেকেছে! ছেলে গর্ভে আসার পওে ওর ওপরে রাগ থাকলেও যতেœর কোন ত্রুটি করেনি। খাবার-দাবার ঘরে পৌঁছে দিয়েছে, ওকে কোন কাজ করতে দেয়নি;এমন কি কাপড়ও বুয়াকে দিয়ে ধুইয়ে দিয়েছে। তারপরেও কোথায় যেন একটা খটকা লেগে আছে! বুঝতে পারছে না।

রীণা কী শিমুলের সঙ্গে মেশার পর থেকেই ওকে না-পছন্দ করতে শুরু করেছে। না অন্য কোন ঘটনা আছে! কী ঘটনা থাকতে পারে। ফাতেমা ভেবে পায় না। কী এমন ঘটনা থাকতে পারে যা রীণার মন বিষিয়ে দিয়েছে ওর ওপর; মহব্বত নিতে আসছে না ওকে সেজন্য কী? কিন্তু তাই বা কী করে হয়; মহব্বত ছেড়ে দিয়েছে ওকে, ওতো আর ছাড়েনি। ওর কাছে মহব্বত ছিল সব কিছু। ওদের জন্যই তো ছাড়াছাড়ি দুজনের। কিন্তু! এই একটা কিন্তুর গেরোয় পড়েছে অনেকদিন। বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, শরীরও খারাপ হচ্ছিল, মনও। খবর নিতো না মহব্বত! বিষণ্ন থাকতো সবসময়। একদিন ছাদে ঘুরছিল হঠাৎ পেছন থেকে চোখে চেপে ধরে একটি পুরুষালি হাত। চমকে ওঠে। মহব্বত এসেছে ভেবে খুব খুশি হয়ে চোখ চেপে ধরা হাত দুটো দুই হাতে চাপ দিয়েছিল; ওই চাপের মধ্যে ছিল মনের ভেতরের উজাড় করা প্রেমের নৈবেদ্য! আরতি করেছিল ভালোবেসে; ভেবেছিল মহব্বত ছাড়া এমন সাহস আর কার হবে? কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে এতক্ষণ এই ছাদের রেলিঙে, মহব্বতকে তো আসতে দেখতে পায়নি! তাহলে! মহব্বত কোথা থেকে আসবে! এই কথা মনে হতেই ভীত সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলে,‘কে ছাড়–ন। এ কেমন মস্করা!’

চোখের ওপর থেকে সরে যায় হাত। দেখে মোমেন। ‘আপনি’! বিস্ময়ে হতবাক! মোমেন একটি হাত ধরে ওর। ‘না এমন কিছু না। একা আছ,একা থাক, বিষণ্ন থাক তাই। চল না একটু ঘরে গিয়ে বসি। তোমার রীণা আপা তো নাই। তুমি সন্তান সম্ভবা এই সময়টাতে হাসিখুশি থাকতে হয়, তুমি বিষণ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াও তাই ভাবলাম একটু কথা বলি, গল্প করি।’ ওই দিন খুব রেগে গিয়েছিল ফাতেমা। যা মুখে আসে তাই বলেছিল মোমেনকে। মোমেন লজ্জা পেয়ে, ক্ষমা চেয়ে ছাদ থেকে নেমে এসেছিল। ছাদ থেকে নামতে নামতে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিল ও তো এমন নয়; লজ্জা পেলো কেন, আর ক্ষমাই বা চাইলো কেন? তবে? বদলে গেছে কি ও! এরপর অনেকদিন ফাতেমার সঙ্গে কথা বলেনি, সামনেও যায়নি মোমেন। ওর গর্ভের বয়স যখন পাঁচ মাস তখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ফাতেমা তখন আবার কথা বলতে শুরু করে মোমেন। সে সময় থেকেই একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়েছে ফাতেমা। মাঝে মাঝে খুব কাছে ডাকতে ইচ্ছা করেছে মোমেনকে, বলতে ইচ্ছা করেছে কাছে বসতে! অনুভব করাতে চেয়েছে গর্ভে সন্তানের নড়চড়! একটু আদরও চেয়েছে! কিন্তু সংকোচে পারেনি! পূর্বে ব্যবহারের লজ্জা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে! তাছাড়া নিজেকে পণ্যস্ত্রী মনে হতো মোমেনকে কাছে ডাকলে; তখনও মনে তখন মহব্বত নড়াচড়া করতো! কিছুতেই ভুলতে পারছিল না মহব্বতকে।

এখন আর এসবের কোন ভিত্তি নেই। তাছাড়া এখন তো আর পণ্যস্ত্রী নয় ও, ও এখন মোমেনের বিয়ে করা বউ। বিয়ে করা বউ শুধু নয়, ও-ই হলো মা, জনয়িত্রী, জন্মদাত্রী মা। লালন-পালনকারী মা-ও তো ও-ই। ও হলো মা আর মোমেন হলো বাবা, জনয়িতা। বিশ্ব না জানুক, সমাজ-সংসার না জানুক মোমেনের ছেলেদের মা হলো ফাতেমা। এটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। বাইরের মানুষের চোখে যাই হোক নিজে জানে, ওদের মায়ের নাম ফাতেমা আর বাবার নাম মোমেন। এ কথা কি জানে বা বিশ^াস করে মোমেন! সে ছেলেদের জন্ম যেভাবেই হোক। হোক না তা কৃত্রিম উপায়ে; কথা তো সেই একই। মোমেনের বীর্যে ধারণ করেছে সন্তান; এই বিশ্বাস না থাকলে কি বিয়ে করেছে মোমেন! এই সন্তান তো মহব্বতের নয়, মোমেনের। মোমেনের সন্তানই লালিত-পালিত হয়েছে ওর গর্ভে। এখন কোলে-কাঁখে-পিঠে। ওদের জন্যই তো রাত জাগে, স্তন্য পান করায়। না, দুধ মা নয়, আয়াও নয়। হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, ‘আমিই মা, আমিই।’ স্থিও কওে ফাতেমা, বাচ্ছরা কথা শিখবে যখন তখন ওকে মা ডাকতে শেখাবে! যে যাই মনে করুক, কিছুই যাবে আসবে না।

ঐ কথা ছাড়াও আর একটি কথা ভেবে রাখে ফাতেমা, ছেলেদের স্কুলে ভর্তি করার সময় মায়ের নামের জায়গায় লিখবে ওর নিজের নাম। ছেলেদেরও শেখাবে। এখানে যখন থাকাই স্থির হয়েছে তখন তাই হবে। এই যদি ওর ভবিতব্য হয় তবে তাকে মেনে নিয়েই সুখে থাকতে চায়। হোক দয়া, করুণা, না থাক ভালোবাসা,আছে শ্রদ্ধা, আছে সম্মান। মোমেনের চোখে দেখেছে ওর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। কথায়ও প্রকাশ পেয়েছে তা। ঐ একদিন এরপরে আর কখনও করেনি অমন। এখন তো আর এমন কথা মনে আনাও উচিত নয়, তবুও মনে পড়ে! কেন যেন মনে হয় কৃত্রিম উপায়ে এই সন্তানের গর্ভধারণ হয়তো নাও হতে পারে। রীণা আপার ব্যবহার পাল্টে যাওয়াতে এই চিন্তা অনেকদিন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছে ওর মাথায়। এখন এসব কথায় গা ঘিনঘিন করে না আর। বরং মনে মনে চায় মোমেন কাছে এসে বসবে, ভালো-মন্দ কথা বলবে, ভালোবাসবে। এখন সম্পর্কে জড়িয়ে গেলেও আপত্তি করবে না ও। লজ্জাও লাগে না আর। এখন আর মনে হয় না মহব্বত নামের একজন লোক আছে যে ওর স্বামী; না মহব্বত স্বামী নয়; একদিন ছিল। বর্তমান স্বামী মোমেন! মোমেন বলেছে তালাকের ব্যবস্থা সেই করে নিবে! যদিও সমাজের চোখে কেউ নয় মোমেন তবুও নিজে যেমন জানে তেমন জানে মোমেনও; ওরা স্বামী স্ত্রী। স্ত্রীর মর্যাদা নাই-বা পেলো, ছেলেদের বাবার পরিচয় তো পেয়েছে; তাকে ঘিরেই তো চলতে পারে তার এই একমুখি জীবন; চলতে পারে নয়, চলছে, চলবে। ছোট্ট এই জীবনের কম্পার্টমেন্টে থাকবে না হয় তার ছেলেদের বাবার সঙ্গে কিছু ভালো-মন্দ স্মৃতি। সেসব স্মৃতির পাতা উল্টে পাল্টে না হয় কাটিয়ে দিবে জীবন। মা হতে পেরেছে ফাতেমা। স্ত্রী হতে পারেনি, না-ই বা পারলো স্ত্রী হতে, মা হতে তো পেরেছে এটাই বা কিছু কম! তাছাড়া ও জানে “সবুরে মেওয়া ফলে”, একদিন স্ত্রীর পরিচয় পাবেই পাবে। ততোদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা!

এই অপেক্ষাতেই ওর ভাবতে ভালো লাগছে, মোমেন ওর স্বামী, মোমেনের সন্তানেরা ওর সন্তান। মোমেনকে ভালো লাগছে, ওর সন্তানদের ভালো লাগছে, মোমেনকে ভালোবাসতে শুরু করেছে আর সন্তান তো ভালোবাসারই পাত্র। একদিন অসহ্য লাগতো সব; অসহ্য লাগতো এই বাড়ি, মোমেন, রীণা আর নিজের গর্ভের সন্তান। তখন যদি এমন মনের অবস্থা থাকতো তাহলে কতো সুন্দর মুহূর্ত আসতে পারতো জীবনে। ভাগ করে নিতে পারতো জীবনবোধ। বাচ্চাদের অনুভূতি ভাগ করতে পারতো মোমেনের সঙ্গে। গর্ভে থাকার সময় ছেলেদের নড়চড়ার যে অনুভূতি সেটি ভাগ করে নিতে পারতো মোমেনের সঙ্গে। মোমেন তো চেয়েছে, মুখে না বললেও চোখেমুখে ফুটে উঠেছে আকুলতা দেখেছে; তবুও দেয়নি ও, দিতে পারেনি। উচিত নয় জেনে দিতে পারেনি; এসব তো পাওয়ার কথা ছিল মোমেনের, দিতে পারেনি। প্রয়োজন ছিল সব কিছু উজাড় করে দেওয়া; হয়নি, দিতে পারেনি। এখন কষ্ট হয়, কেন দিতে পারেনি ওর সবটুকু… এই দেহ মন সব সব সবটুকু। অনেকদিন পরে লেখার খাতা খুলে বসে ফাতেমা।

তোমাকে অনেক ঠকিয়েছি মোমেন। পারলে ক্ষমা করো আমাকে। জীবনের ছোট-খাট অনুভুতিগুলো তোমাকে দিতে পারতাম কিন্তু দিতে পারিনি। বাধা হয়ে ছিল সংস্কার। তাছাড়া রীণা আপাকে দুঃখ দিতে চাইনি। কিন্তু টুকরো অনুভূতির মালা গাঁথতে খুব ইচ্ছা ছিল তোমার তা বুঝেছিলাম আমি। কিন্তু করার কিছু ছিল না। ক্ষমা করো আমাকে ক্ষমা করো। সেদিন যদি তোমাকে পছন্দ করতে পারতাম আজ হয়তো এমন কথা মনে হতো না আমার। আজ তোমাকে পছন্দ করি ছেলেদের বাবা হিসেবে, স্বামী হিসেবে, পছন্দ করি মানুষ হিসেবে। মনের দিক থেকে তুমি খুবই ভালোমানের মানুষ একজন। তোমাকে কী ভালোবেসে ফেলেছি?…

খাতার ভেতরে কলম রেখে খাতাটি বন্ধ করে ফাতেমা। খাতার ভেতরই শুধু প্রশ্নবোধক চিহ্ন পড়েনি, প্রশ্নবোধক চিহ্ন পড়েছে মনের মধ্যেও। নিজেকেই প্রশ্ন করে তুমি কী ভালোবেসে ফেলেছ মোমেনকে? না, না তা কী করে হয়! মহব্বত আছে এখনও তার জীবিত স্বামী, ডিভোর্স হয়নি এখনও। তাকে তালাক না দিলে মোমেনের সঙ্গে ঘর বাঁধা যাবে না। বিয়ের সময় মোমেন বলেছে, এসব নিয়ে না ভাবতে! তবুও কী না ভেবে থাকা যায়! স্বামীকে ভালোবাসা মেয়েদের কর্তব্য! কিন্তু এই কর্তব্য কার প্রতি; মোমেন না মহব্বত। মোমেনও তো ওর স্বামী। জানে না ফাতেমা ডিভোর্সের ব্যাপারে কী করেছে মোমেন। জানতেও চায়নি কারণ জানতে চেয়ে কোন ফায়দা নেই; জবাব মিলবে না। তাছাড়া জানতে চাওয়ার প্রয়োজনটাই বা কী? মহব্বত তো খোঁজই করে না; যে লোক খোঁজ করে না, খবর নেয় না তাকে ভালোবাসতে যাবে কোন দুঃখে। বছর তো পার হয়ে গেছে কবে সে আসে না, খবর নেয় না! ফোন পর্যন্ত করে না, তার প্রতি কর্তব্য! ফোন পর্যন্ত করে না যে তার জন্য পিত্যেশ করেই তো ছিল এতদিন! এখন আর থাকবে না। যে স্বামী বিক্রি করেছে তাকে তার প্রতি ভালোবাসা! ছি! ওর থেকে ছেলেদের বাবা ভালো; তাকে ভালোবাসতে নিষেধ নেই। হোক না সতীনের ঘর তাতে কী।

মোমেন তো কতো কিছু করছে, করছে ওর জন্য। আগে রীণা আপা দিতো এখন তো মোমেনই দেয়। ওর জন্য হাত খরচা আর ছেলেদের খরচের জন্য টাকা দেয় মোমেন এটা পছন্দ করে না রীণা। ফাতেমা বুঝতে পারছে না যে তা নয় তবুও “আদার ব্যাপারির জাহাজের খবরের কি দরকার।” এই ভেবে চুপ করে থাকে! ও তো আদার ব্যাপারি! এখন তো ছেলেদের দেখভাল করতে করতে সংসারের দেখভালও ওকেই করতে হচ্ছে। সমাজ না জানুক নিজে তো জানে। মোমেনের কাছ থেকে অর্থ নেওয়াতে কোন পাপ নেই। ওর স্বামী মোমেন, যেমন রীণার স্বামী তেমন তো ওরও তাহলে আপত্তি কেন? ওর বিষয়ে আজও কিছু করতে বলে না মোমেনকে, মোমেনের কাছে কিছু চায়-ও না, সবই নিজে নিজেই করে; ছেলেদের কিছু দরকার হলে যতোটুকু সাধ্যে কুলায় নিজেই করে; না পারলে বাধ্য হয়ে বলে মোমেনকে। রীণাকে সময় মতো পায় না; পেলে হয়তো মোমেনের সাহায্য নিতে হতো, নিতো না।

মোমেনের ঘরে থাকে না রীণা। মোমেনকে ছটফট করতে দেখে; খুব কষ্ট হয় ফাতেমার। ইচ্ছা হয় দৌড়ে যায় ওর কাছে। অসুস্থ শরীর সব সময় একজনের পাশে থাকা প্রয়োজন। যেদিন রীণা বাসাতে থাকে না সেদিন রাতে থাকতে চায় কিন্তু ছেলেদের জন্য থাকা হয়ে ওঠে না। মোমেন একেবারে অন্য মানুষ; সামিনা নামের মেয়েটি মারা যাবার পর থেকে একেবারে অন্য মানুষ হয়ে উঠেছে মোমেন! ওর ওপর কেমন যেন নির্ভর করতে শুরু করেছে; ওর কিছু করার নাই। ওর মন তো এটাই চায়; শুধু রীণার প্রতি দয়াপরবশে এটি করতে পারে না। হাজার হোক ওরই মতো রীণা একজন নারী, একজর নারী হয়ে অপর একজন নারীকে কষ্ট দিবে তাতে সায় দেয় না ওর মন। নিজে নারী হয়ে অন্য একজন নারীকে সম্মান দিতেই না পারলো তাহলে তো ওকেও সম্মান করবে না কেউ। একজন নারীর জন্য অন্য একজন নারীর এটুকু করা উচিত। এক এক সময় মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এই বাড়িতে আছে? কেন বিয়ে করেছে অন্যের স্বামীকে? কিন্তু এই কাজ তো বাধ্য হয়ে করেছে, ওর ভাগ্য ওকে এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। ওকে, মোমেনকে, রীণাকে। মোমেন বিশ্বাস করে মানুষ তার জীবন-কর্মের ৯০% ফলের অংশীদার আর ১০% ভাগ্যের আর ফাতেমা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে ভাগ্যের ওপর! তবুও যার যার বিশ^াস মতো তাদের কর্মফল তাদের যার যার নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দিয়েছে; এখানে তাদের কোন হাত নেই!

মোমেন বের হয়েছে সকালে ফেরেনি এখনও। জানে না অফিসে কী হলো? রীণা নেই, মোমেনের জন্য টেবিলে খাবার রেখে অন্যদিন খেয়ে ফেলে ফাতেমা। আজ খায়নি খেতে ভালো লাগেনি। অপেক্ষা করেছে সারাদিন। অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ডোরবেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। দরোজায় দাঁড়িয়ে বিধ্বস্ত মোমেন। একপাশে সরে ঘরে ঢোকার জায়গা করে দেয়। মোমেন ঘরে ঢুকলে দরোজা লাগিয়ে পানি এনে ওর সামনে এসে দাঁড়ায় ফাতেমা। শুকনো মুখে পানির গ্লাস শেষ করে। বলে,‘চাকরি নয় শুধু, ব্যবসার অংশিদারিত্ব থেকেও বাদ দিয়েছে। আমি এখন কী করবো! কী ভাবে খরচ চালাবো। ফ্ল্যাট না হয় আছে কিন্তু ছেলেদের কী হবে। তোমরা না হয় বড় মানুষ কিন্তু ছেলেরা তো বাচ্চা।’ কথা বলতে বলতে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে মোমেনের। ‘এসব কথা পরে হবে, এখন চলুন…’ গ্লাস হাত থেকে নিয়ে টেবিলে নামিয়ে রেখে বলে, ‘খেয়েছেন কিছু।’ মাথা নেড়ে না বলে। ফাতেমা বলে, ‘চলুন টেবিলে, খাবার ঢাকা দিয়ে রেখেছি।’ মোমেন ডাইনিং-এ যেতে যেতে বলে, ‘রীণা কোথায়? বাসায় দেখছি না তো!’ ‘এখনও আসেনি, কোথায় গেছে জানি না।’

‘গিয়েছে কখন।’ কণ্ঠে বিষণ্নতা। ‘আপনি বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই।’ রীণা বাসায় নেই শুনে চিন্তিত হয় মোমেন। এই মুহূর্তে কেন যে রীণার কথা মনে পড়ছে। ওর মনে হচ্ছে কোন বড় ধরণের বিপদ টেনে আনছে রীণা। মোমেন জানে বিপদ কখনও একলা আসে না, দল বেঁধে চারদিক থেকে আসে। এটি কী রীণার বিপদ না রীণা ওর জন্য বিপদ ডাকছে সেটিই বুঝতে পারছে না। ওর মনের কথা বুঝতে দেয় না ফাতেমাকে। মুখ নিচু করে খাওয়া শেষ করে।

রেস্ট নিয়ে খামটি খুলে একটি দলিল দেখতে পায়; সামিনার জমি, ব্যবসা সব ট্র্যান্সফার করা আছে মোমেনের নামে। দানপত্র। মোমেন নিতে চায় না, এখনই ওটা ফেরত দিয়ে আসবে ওর ভাইকে। এটার প্রাপ্য ও নয়, যারা এর প্রাপ্য তাদেরই দিয়ে দিবে এই দলিল। মোমেন দলিল হাতে বসে থাকতে থাকেতেই ঘরে ঢোকে ফাতেমা। জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে, হাতে ওটা কী?’ মোমেন বাড়িয়ে দেয় দলিল। ফাতেমা পড়ে। এটা বুঝেছে এটি একটি দানপত্র। দানপত্রটি গুছিয়ে খামে ভরে হাতে দেয় মোমেনের। বলে, ‘এটি কী করবেন।’ ‘ফেরত দিয়ে দিব ওর ভাইকে।’ মোমেনের বিষণ্ন কণ্ঠস্বর ঘরের বাতাস ভারী করে তোলে। সেই হাওয়া লাগে ফাতেমার বুকে। ফাতেমা স্নেহে বলে, ‘দেখুন এটি এখন যেখানে আছে সেখানে রেখে দিন, আর রাখতে না চান, মনে কিছু না করলে আমায় দিন, রেখে দিব। কয়েকদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন, এখনই এটি ফেরত দেওয়ার সময় নয়।’ ফাতেমা গ্রামের মেয়ে স্বল্পশিক্ষিত হলেও ওর ভাবনা-চিন্তার ওপর অগাধ বিশ্বাস মোমেনের। মাথা নেড়ে সায় দিলো। বলল, ‘ঠিক আছে ওটি রেখে দাও। কী করবো ওটি দিয়ে আমি। আর একটা কথা কী জানো অফিসে গেলাম ওর ভাইয়ের মুখে কোন বেদনা বা দুঃখের কোন ছাপ দেখতে পেলাম না। খুব স্বাভাবিক কথা বলল। বুঝলাম না কিছু।’ ফাতেমা সব শুনে বলল, ‘ওসব নিয়ে এই শরীরে মাথা ঘামাতে হবে না। যা গেছে তার জন্য আফশোস করতে হবে না আপনার। সব সময় মনে রাখবেন যা আপনার নয় তা কখনও আপনার কাছে থাকবে না; যতোদিন থাকার ঠিক ততোদিন তা থাকবে আপনার কাছে তারপর ফুড়ুৎ। এ নিয়ে দুঃখ হয়, কিন্তু দুঃখ করা, হাহুতাশ করা ঠিক নয়, আল্লাহ নারাজ হন!’ মোমেন অবাক হয়ে ওর কথা শোনে। বলে, ‘তুমি কী কবিতা টবিতা লিখ নাকি।’ ফাতেমা লজ্জা পায়, হাসে কোন কথা বলে না। মোমেন আরও অবাক হয়। ফাতেমা বলে, ‘এসব কথা বাদ দিন, কাজের কথা শুনুন। একটি কথা বলবো; রীণা আপা আসলে তো বলতে পারবো না।’ মোমেন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফাতেমা বলে, ‘আপনি তো আমাকে প্রতিমাসে অনেকগুলো টাকা দিয়েছেন, সব তো খরচ হয়নি। টাকাগুলো নিয়ে এসেছি, যদি রাখেন তো খুব খুশি হবো। তবে মনে রাখবেন এ কথা রীণা আপা যেন জানতে না পারে। রীণা আপা জানলে তুলকালাম কান্ড হয়ে যাবে! আপনি এটি দিয়ে যাহোক করে একটা কিছু করেন। আমি সব সময় আপনার পাশে আছি।’

মোমেনের মনের আকাশে নিশ্চিন্ততার ছায়া ভাসে। করুণ একটি হাসি দেখা দেয় ঠোঁটের কোণে। ‘তোমার টাকা নেব কেন ফাতেমা।’ ফাতেমার কণ্ঠে দুঃখের ছোঁয়া। ‘এই টাকা দিয়ে কী হবে। আমার টাকা কী আপনার নয়! আপনাকে না, এই টাকা দিলাম আমার সন্তানদের কথা ভেবে। ওরা আমার- আপনার, আমাদের সন্তান, বাইরের পরিচয় যাই হোক! একথা কেউ স্বীকার করুক না করুক আপনি নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না।’ তাড়াতাড়ি বলে ওঠে মোমেন, ‘কী যে বলো ফাতেমা, আমার বুকের পাটা কি এত্ত শক্ত যে এই কথা অস্বীকার করবো।’ ‘তাহলে নিন’। ফাতেমা টাকা বাড়িয়ে ধরে। মোমেন টাকা নিয়ে ওর ব্রিফকেসে রেখে আবার বসে। ফাতেমা চায়ের কাপ নিয়ে বেরিয়ে যাবে এমন সময় ঘরে এসে ঢোকে রীণা। ঘরে ঢুকেই চিৎকার। ‘কী করছো এই ঘরে।’ ‘চায়ের কাপ নিতে এসেছে দেখতে পাচ্ছ না।’ মোমেনের ঝাঁঝালো জবাব। ‘তোমার বুয়া তো গেছে, তার খবর কী? ’ রীণা সমান তালে চিৎকার করে জবাব দেয় ‘আর তো বুয়া রাখবো না। এক বুয়া থাকতে আবার বুয়া রাখবো আমার টাকা তো বেশি হয়ে যায়নি।’ মোমেন আর কথা বলে না। কথায় কথা বাড়ে; মোমেনের আর এই সব খ্যাচখ্যাচানি-কচকচানি ভালো লাগে না। ব্রিফকেস নিয়ে ঐ অবস্থাতেই বের হয়ে যায়। আগে থেকেই ভেবে রেখেছিল ছোট একটা বুটিকের দোকান দিবে। ওটার জন্য ঘর একটা দেখেছিল; ওটা আজ পাকা করে আসবে ভেবেই বের হলো। একটা কিছু না করলে তো চলবে না। এই করে যে সংসার চলবে তাও ভাবে না ও। বাচ্চা দুটোর কথা ভেবে অন্য কিছু করার চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। আপাতত এই শুরু করবে, এরপর দেখা যাবে। বাচ্চাদের কথা ভেবেই এই টাকা নেওয়া ফাতেমার কাছ থেকে। এখন কিছু একটা দাঁড় করাতে হবে; ওর নিজের তো কিছু নেই। জয়েণ্ট অ্যাকাউণ্ট, চেকবই থাকে রীণার কাছে। নিজের আছে একটা অ্যাকাউণ্ট কিন্তু তাতে সব মিলিয়ে হাজার পঞ্চাশ থাকতে পারে। ওটা তো সামনের মাসের খরচ, ওটাতে হাত দিলে চলবে না। সবার প্রথমে নিজের সন্তান তারপরে অন্যকিছু; সন্তানের বড় কিছু নেই। একজন মানুষ তার সন্তানের জন্য সবকিছু করতে পারে তাই মনে হয় ওর; নিজেও করতে পারে সন্তানদের জন্য, সন্তান আর ওদের মা ছাড়া আর কেউ নাই ওর জীবনে! এই ছোট্ট কথাটা সব সময় মনে রাখবে এখন থেকে। ফাতেমা আর দুই সন্তানকে নিয়েই পথ চলা শুরু। রীণা যদি থাকতে চায় বাধা দিবে না কিন্তু রীণা যদি মনে করে ফাতেমাকে ছাড়া এই সংসার চলবে বা চালাবে তা কখনই হতে দিবে না মোমেন। কারণ মোমেন এাঁ ভালো করেই বুঝে গিয়েছে ওর জীবনে অপরিহার্য এখন ফাতেমা রীণা নয়! এই কথা ভাবতেই মোমেনের মনে পূর্ণিমার নরম আলোয় পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এই মুহূর্তে ইচ্ছা করছে ফাতেমাকে তাবিজ করে গলায় রাখতে, বুকে পুরে রাখতে। ইচ্ছা করছে অনেক অনেক আদর করতে ওকে! গুনগুনিয়ে কন্ঠে গান এলো মোমেনের- ‘ আমার সকল নিয়ে বসে আছি … ।’

চলবে…