প্রচ্ছদ স্পটলাইট বিভ্রান্তিতে বিএনপি: সকালে নিন্দা, বিকালে ভারত বন্দনা

বিভ্রান্তিতে বিএনপি: সকালে নিন্দা, বিকালে ভারত বন্দনা

242
বিভ্রান্তিতে বিএনপি: সকালে নিন্দা, বিকালে ভারত বন্দনা

বাংলাদেশের একটি ভোটারবিহীন সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের ভূমিকা ঔপনিবেশিক

শাসকদের মতো, যেন তারা বাংলাদেশে তাদের প্রতিভুদের টিকিয়ে রাখতে উঠে-পড়ে লেগেছে’— রবিবার (৮ জুলাই) সকালে রাজধানীর নয়া পল্টনে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর। একই দিন বিকালে আবার সংবাদ সম্মেলন ডেকে ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেন তিনি।

বিকালের পর্বে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বিএনপি’র নীতি হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। বিএনপি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক যোগাযোগই হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের ভিত্তি। ভারত একটি বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে।’

‘ব্রিটিশ নাগরিক খালেদা জিয়ার আইনী পরামর্শক লর্ড কার্লাইলকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি মিলেনি’— এমন খবরকে কেন্দ্র রবিবার সকালে দেওয়া রিজভীর বক্তব্যের পরপরই বিএনপির মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। দলের ভারত বিষয়ে দেখভাল করা স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য উষ্মা প্রকাশ করেন। এক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন সম্পর্কে রিজভীর বিরূপ মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

গত জুনে ভারত সফর করে আসা বিএনপির একজন নেতা রবিবার দুপুরে বলেন, ‘ভারত সম্পর্কে এ ধরনের বক্তব্যে বিএনপির কোনও সম্পর্ক নেই। বিশেষ করে এ ধরনের বক্তব্যে দলের নীতিনির্ধারকরা একেবারেই জানেন না। ভারতের হাইকমিশন সম্পর্কে বক্তব্য পুরোপুরি রিজভীর একান্ত ও ব্যক্তিগত।’

শুধু এই নেতাই নন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির অনেক নেতাও রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেন, ‘আগামী নির্বাচনে ভারতের ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে বিএনপির হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নিয়ে সহযোগিতা চেয়েছেন। এরপর হঠাৎ করেই কার্লাইলের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনকে জড়ানো অনৈতিক হয়েছে।’

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যের পর বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে এ বিষয়ে সংশোধনী দেওয়ার কথা বলা হয়। পরে বিকালে তিনি ফের নয়া পল্টনে সাংবাদিকদের ডেকে কথা বলেন।

ভারত বিষয়ে বিএনপির ইতিবাচক অবস্থানের মধ্যেই হঠাৎ করে কী কারণে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের বিরোধীতা করা— এমন প্রশ্নের উত্তরে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, ‘লর্ড কার্লাইল একজন বিট্রিশ আইনজীবী। আর ভারতীয় হাইকমিশন হচ্ছে, ভারতেরই হাইকমিশন। তাদের দেশে একজন বিট্রিশ হাউস অফ লর্ডসের মেম্বার যাবেন। তাকে ভিসা না দেওয়ার জন্য ভারতীয় হাইকমিশন সুপারিশ করে থাকেন, তাহলে তো নিসঃন্দেহে মনে হতে পারে যে খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়েছে সেখানে তার ভূমিকা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে তো লর্ড কার্লাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কিছু নেই। বিএনপির সঙ্গেও ভারতের কিছু নেই। এখানে বাংলাদেশে সরকারের সঙ্গে বিএনপির লড়াই হচ্ছে খালেদা জিয়াকে নিয়ে। তখন লর্ড কার্লাইলের ভিসা না দেওয়া হলে এটা মনে করাই তো স্বাভাবিক যে এটার সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশন জড়িত আছে কিনা।’

আপনার এই বক্তব্যে বিএনপি ও ভারতের সম্পর্কের কোনও নৈতিবাচক প্রভাব পড়েবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী আহমেদ বলেন, ‘আমি তো ভারতকে নিয়ে কিছু বলি না। কারণ, আমি কথা বলেছি বাংলাদেশে যে ভারতীয় হাইকমিশন আছে, তাদের এই আচরণ দেখে তাদের সম্পর্কে এসব কথা বলেছি। আমি তো এসব কথা গতকাল বা এর আগে বলিনি।’

বিএনপির আইনজীবীরা জানান, লর্ড কার্লাইলের ভারত সফর সম্পর্কে তারা অনেকটাই অজ্ঞাত। এ বিষয়টি সরাসরি লন্ডন থেকে পরিচালিত হচ্ছে। বিএনপির শীর্ষ আইনজীবীদের অন্যতম অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, লর্ড কার্লাইলের ভারত সফরের বিষয়টি সংবাদপত্রের সূত্রেই তারা জেনেছেন। এ বিষয়ে হাইকমান্ডের কোনও নির্দেশনা তাদের কাছে আসেনি।

সকালে সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ঢাকার একটি দৈনিকের প্রতিবেদকের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘গতকাল একটি দৈনিক পত্রিকায় নয়া দিল্লির একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনি পরামর্শক লর্ড কার্লাইলকে ভারতে ঢোকার অনুমতি না দিতে নয়া দিল্লিতে জোরালো সুপারিশ পাঠিয়েছে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন।’

তিনি আরও বলেন, ‘লর্ড কার্লাইল এ সপ্তাহেই নয়াদিল্লি সফরের সময় ১৩ জুলাই ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা ও কারাদণ্ডের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা। যদি ঢাকাস্থ হাইকমিশনের জোরালো সুপারিশের কারণে লর্ড কার্লাইলের ভিসা দেওয়া না হয় তাহলে এটা প্রমাণিত হবে যে, বেগম জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাদণ্ড দিতে হাইকমিশনের নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে। ভারতীয় হাই কমিশনের এই ভূমিকা দুঃখজনক এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আগ্রাসী হস্তক্ষেপ।’

রবিবার বিকালে রিজভী আহমেদ বলেন, ‘ভারত একটি বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। এ দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে, বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থন দেবে এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরে পেতে সহযোগিতা করবে। যেভাবে ভারত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণের পাশে থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করেছে। ভারতের সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার। তাই বাংলাদেশের জনগণ আশা করে, ভারত জনগণের মতামতকেই প্রাধান্য দেবে।’

জানতে চাইলে বিএনপির ফরেন উইং ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়টি আমি জানি না। আমি কিছু বলতে পারবো না।’