প্রচ্ছদ স্পটলাইট বাংলাদেশের নির্বাচনে মার্কিন অতিউৎসাহের নেপথ্যে কারা?

বাংলাদেশের নির্বাচনে মার্কিন অতিউৎসাহের নেপথ্যে কারা?

296
বাংলাদেশের নির্বাচনে মার্কিন অতিউৎসাহের নেপথ্যে কারা?

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে মার্কিন উৎসাহ অনেক বেড়ে গেছে।

সম্প্রতি গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ তাঁর প্রতিক্রিয়া জানায়। এই বিষয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ও তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে মার্কিন দূতাবাসকে বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন।

এর জবাবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য, তাঁর নিজস্ব নয়। তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র মাত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবই তিনি প্রকাশ করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, শুধু বার্নিকাট বা ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন নিয়ে অতি উৎসাহী।

আরও নির্দিষ্ট করে বললে, মার্কিন নীতি আওয়ামী লীগের পক্ষে নয়। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো বিরোধ নেই। দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো।’

তবে তিনি বলেন, ‘গাজীপুর এবং খুলনা নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কথা বলেছে।’ ড. গওহর রিজভী বলেন, ‘আমরাও আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক চাই। এটা নিয়ে তো কোনো বিতর্ক নেই।’

প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মনে করেন, কিছু ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল তথ্য দিচ্ছে।’ কিন্তু কারা দিচ্ছে সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত কয়েকমাসে বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। এরা মার্কিন নীতি নির্ধারকদের কাছে বাংলাদেশ সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এরাই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে বাংলাদেশের ব্যাপারে নাক গলাতে উৎসাহিত করেছে।

গত মাসেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন শান্তিতে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড. ইউনূসের সম্পর্ক দীর্ঘ পুরোনো। যদিও বলা হয়, ডেমোক্রেটদের সঙ্গেই বিশেষ করে ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু ডেমোক্রেট এবং রিপাবলিকান দুই দলেই ড. ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট বদল হয়, নীতি নয়। ড. ইউনূস মূলত গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়ে কথা বলতে যেয়ে বাংলাদেশে সুশাসনের অভাব, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। অন্তত দুটি সিনেট সভায় ড. ইউনূস বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য মার্কিন শক্ত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

ড. ইউনূসের সফরের কিছুদিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন ড. কামাল হোসেন। নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে ড. কামাল ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। ড. কামালও এক ঝুড়ি অভিযোগ নিয়ে যান স্টেট ডিপার্টমেন্টে। সেখানেও তিনি বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ শাসনব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে তারও উদাহরণ দেন।

অতি সম্প্রতি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন সফর করে এসেছেন ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের এই উপদেষ্টাকে বাংলাদেশে মার্কিন এজেন্ট বলা হয়। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে বাংলাদেশে প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকে তার অবস্থান ছিল মার্কিন নীতির পক্ষে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ নিয়ে এক পরামর্শক সভায় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনিও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই কথা বলে এসেছেন বলে জানা গেছে। এসব কারণেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ব্যাপারে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে বলে কূটনীতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে, সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো অবশ্য মার্কিন অতি উৎসাহের অন্য কারণও দেখছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বাণিজ্যে চীন এবং ভারতের চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশ পিছিয়ে পড়েছে। এটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চিন্তিত করে তুলেছে। একারণেই সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সুশাসন এবং নির্বাচন ইস্যুকে সামনে এনেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ঐ সূত্র জানিয়েছে, পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ এবং সমুদ্র অর্থনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের কোম্পানির পক্ষে কয়েকটি টেন্ডারে তদ্বির করে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কুশল বিনিময় ছাড়া বার্নিকাট প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাচ্ছেন না। বাংলাদেশে মার্কিন বাণিজ্য স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়াতেই তারা এখন সরকারের উপর সুশাসন, নির্বাচন ইত্যাদি চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। এটাই সারা বিশ্বে মার্কিন নীতি।