প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত নামের কোন ধর্ম হয় না, ইসলামিক নাম বলে কিছু নেই

নামের কোন ধর্ম হয় না, ইসলামিক নাম বলে কিছু নেই

3488
নামের কোন ধর্ম হয় না, ইসলামিক নাম বলে কিছু নেই

ইসলামের প্রচলন শুরু হয় ৬১০ খৃষ্টাব্দ থেকে (নবী মুহাম্মদ (সা.) এর বয়স যখন ৪০)। তখন নবী সহ যে সকল মানুষ জীবিত ছিল তারা জন্মের সময় কি মুসলমান ছিল? ছিল না।

তারা ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত হয়ে কি তাদের নাম পাল্টে ফেলেছিলো? না ফেলেনি। তাদের জন্মের সময় তাদের যে নাম রাখা হয়েছিলো সেই নামসমূহ কি আদৌ ইসলামী নাম হতে পারে? বরং যদি দাবি করা হয় যে ঐ সকল নাম খাঁটি প্যাগানদের নাম তাহলে তা অস্বিকার করার কোন পথ খোলা থাকবে না। বর্তমানে বিভিন্ন মুসলিম পরিবারে সন্তানদের নাম রাখা হয় বিখ্যাত সাহাবিদের নামে। সেইসব সাহাবাদের জন্মের সময় কি তাদের ইসলামী নাম ছিল? অবশ্যই তাদের নাম রাখা হয়েছিলো প্যাগান ধর্ম, ঐতিহ্য অনুসরণে।

“আব্দুল্লাহ” নামটি সবথেকে বেশি সহী ইসলামী নাম। আব্দুল্লাহ ছিলেন নবীজির পিতা যিনি নবীজির জন্মেরও আগে মারা যান। খেয়াল রাখতে হবে, আব্দুল্লাহ পৌত্তলিক হিসেবেই মারা যান। আব্দুল্লাহ নামের অর্থ আল্লাহর দাস। কিন্তু কোন আল্লাহ্‌র দাস? তখনও ইসলামের জন্মও হয়নি এবং ইসলামের প্রচারকেরও জন্ম হয়নি। ইসলামের পূর্ববর্তী ইহুদী-খৃষ্টান ধর্মেও আল্লাহ বলে কোন শব্দ-ই নেই। এই আল্লাহ্‌ সেই প্যাগানদের মধ্যে প্রচলিত আল্লাহ্‌ নামের দেবতা যে লাত, মানাত ও উজ্জাতের পিতা।

নবী ও সাহাবিরা নাম কোন ধর্মের পরিচয় বহন করত বলে মনে করতেন না। কেননা নামকে তারা যদি ধর্মের পরিচয় বহনকারী হিসেবে ভাবতেন তাহলে ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে তারা তাদের পুরনো পৌত্তলিক ধর্মের নাম বাদ দিয়ে নতুন ইসলামিক নাম নিতেন। অর্থাৎ নবী ও সাহাবিরাই প্রমাণ দিয়ে গেছেন নাম কোন ধর্মের হয় না।

মাত্র ২০ জনের মত সাহাবি নাম পরিবর্তন করেছেন কারণ তাদের নামগুলো শিরক ও বাজে অর্থ এর মত দোষে দুষ্ট ছিল। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)বলেছেন, “পিতার উপর নবজাতকের হক হলো তার জন্য সুন্দর নাম রাখা” (মুসলিম)।

হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তার দাদা হাজন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর খেদমতে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করেন তোমার নাম কি? তিনি বললেন আমার নাম হাজন (শক্ত)। নবী মুহাম্মদ (সা.) বললেন তোমার নাম হওয়া উচিত “সাহল”(সহজ-সরল)। (সহিহ বুখারি গ্রন্থ ৮ এর ২১৩ নং হাদিস) ও (মেশকাত শরীফ)। সহিহ মুসলিম শরীফ এ নাম সংক্রান্ত অনেকগুলো হাদিস আছে। ১০০৬, ১০০৭, ১০০৮, ১০০৯, ১২৫১ নং হাদিস পড়ে নিন।

নবী আসিয়াহ (অর্থ: অবাধ্য/দুর্বল) এর নাম পরিবর্তন করে বললেন আজ থেকে তুমি হচ্ছ জমিলাহ (অর্থ: সুন্দর ও সাস্থবান) (মুসলিম: ১০০৭)। হযরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত জুওয়ারিয়া (রা.) এর পূর্ব নাম ছিল ‘বাররাহ’। রাসূল (সা.) তার নাম পরিবর্তন করে রাখলেন জুওয়ারিয়া। (মুসলিম: ১০০৮)

খেয়াল করুন, নবী নিজেই ইসলামিক নাম রাখতে বলেননি, বলেছেন সহজ-সরল, সুন্দর ও অর্থবোধক নাম রাখতে। আরবী ভাষা আমাদের মাতৃভাষা নয়। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এরাবিক নামগুলো শুনতে তাই কঠিন, শ্রুতিকটু এবং অদ্ভুত শোনাবে। এটাই স্বাভাবিক। আবারও বলছি, সবখানেই বলা হয়েছে “সহজ, সুন্দর, অর্থবোধক নামের কথা”।

যাই হোক, একটা নাম কোন বিশেষ গোষ্ঠী বারবার ব্যাবহার করতে থাকলে লোকজন সেই নামধারীকে সেই গোষ্ঠীর ভাবা শুরু করে, এটা ঠিক। কিন্তু তার মানে এই না যে নামটা সেই গোষ্ঠীর একার সম্পত্তি হয়ে গেল। আর কেউ সেটা রাখতে পারবে না বা ব্যবহার করতে পারবে না। যেমন: “খান” নামটি তো মঙ্গোলিয়ান নাম কিন্তু মুসলমানরা এই নামটিকে এত ব্যাবহার করেছে যে এখন কেউ এই নাম বললে সাধারনত ভাবা হয় সে একজন মুসলিম। কিন্তু তার মানে এই না যে “খান” নামটি এখন মুসলমান ছাড়া আর কারও হতে পারবে না!

নাম একজন মানুষের ধর্মের পরিচয় বহন করে এই ভুল ধারণাটা আসলে মুসলমানদের মধ্যে গেঁথে বসেছে ধর্ম ব্যবসায়ী হুজুর/মোল্লাদের কারণে। লোকজন সন্তান জন্মের পর হুজুরদের কাছে গিয়ে যখন ইসলামিক নাম চায় তখন হুজুররা সাধারনত আরবি ডিকশনারি খুলে একটি শব্দ ধরিয়ে দেয় বা সাহাবীদের নাম ধরিয়ে দেয় (যদিও সাহাবীদের এই নাম কিন্তু তারা পৌত্তলিক থাকার সময় থেকেই যেটা ছিল সেই নাম)। এবং তারপর হুজুররা বলে “নেন, আপনার সন্তানের জন্য সহীহ ইসলামিক নাম খুঁজে দিলাম”। অতঃপর সেই অভিভাবক হুজুরদের হাদিয়া চুকিয়ে তার সন্তানের সহীহ ইসলামিক (আরবী) নাম নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়।

ইদানীং অবশ্য সহীহ ইসলামিক নাম এর বই বের হয়েছে যা আসলে আরবী টু বাংলা ডিকশনারি থেকে সংকলিত কিছু শব্দ সম্ভার মাত্র।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, ইসলাম ধর্ম আরবী ভাষায় প্রচলিত হয়েছে বলেই আরবী ভাষার সব শব্দ ইসলামের একার সম্পত্তি হয়ে যায় না। এবং অভিভাবকরা সহিহ ইসলামিক নাম ভেবে সন্তানের যে নাম রাখছেন তা আসলে সাধারণ আরবী শব্দ ছাড়া কিছুই না।

নাম বা শব্দ যে কোন ধর্মের হয় না তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানো যায়:

ধরুন, বাংলাদেশের এই খারাপ আর্থ-সামাজিক অবস্থা দেখে কোন এক সমাজ সংস্কারক বাংলাদেশে বাংলা ভাষার মাধ্যমে “সুখ” নামে কোন ধর্ম প্রচার করলেন, কিছু বাঙালি অনুসারিও পেলেন। এখন কিছুদিন পর এই ‘সুখ’ ধর্মের অনুসারিরা যদি দাবি করেন যে ‘সুখ’ ধর্ম যেহেতু বাংলা ভাষায় প্রচারিত হয়েছে অতএব বাংলা ভাষা তাদের নিজেদের, সব বাংলা শব্দ/নাম তাদের নিজেদের এবং তারা যদি দাবি করেন “সুখ” ধর্মের অনুসারিরা ছাড়া আর কেউ বাংলা নাম রাখতে পারবে না, তাহলে ব্যাপারটা কি হাস্যকর লাগবে না?

একইভাবে, ইসলাম যেহেতু আরবী ভাষায় প্রচার হয়েছে, সুতরাং মুসলিমরা ছাড়া আর কেউ আরবী নাম রাখতে পারবে না, তাহলে ব্যাপারটা কি হাস্যকর লাগে না? অবশ্যই হাস্যকর!

পাকিস্তানি শাসকরাও বাংলাকে হিন্দুদের ভাষা হিসেবে ভাবতো। ১৯৫২/১৯৭১ সালে এই ভুলের মাশুল তারা দিয়েছে। বর্তমান সময়ে এরাবিক নাম দেখলেই অনেকে ভাবতে শুরু করেন সেটা মুসলিম নাম। তা ঠিক নয়। আরবের মুসলমানরা সহ অনেক খ্রিষ্টান-ইহুদি –কাফিরের নাম এখনও একইরকম হয়।

প্রমাণ: নবী মুহাম্মদ এর সাহাবি ও তার বিরধীতাকারি কাফেরদের নামে আপনি পার্থক্য খুঁজে পাবেন না। একই নামের সাহাবি ও কাফের দুইটাই ছিল। উদা: খালেদ বিন ওয়ালিদ (মুসলিম) ও ওয়ালিদ বিন মুঘাইরা (কাফের)। মুনাফিকদের সর্দার এরও নাম ছিল আব্দুল্লাহ বিন উবায় ইবন সালুলি। আরও একজন ইহুদী মুনাফিক এর নাম ছিল আব্দুল্লাহ ইবন সাবার।

কোন নাম শুধুমাত্র তখনই ধর্মের একার শব্দ হবে যখন সেটা হবে ধর্মীয় মৌলিক শব্দ। অর্থাৎ ধর্মটি প্রচলনের আগে সেই শব্দটি কোন ভাষায় প্রচলিত ছিলও না। শুধুমাত্র তখনই বলা যাবে নামটা হচ্ছে সেই ধর্মের। এরকম মৌলিক শব্দ ইসলামে খুব বেশী নেই বললেই চলে।

আল্লাহর ৯৯টি নাম, মুহাম্মদ, আহমদ, ইত্যাদি কোনটাই মৌলিক শব্দ নয়। সবগুলোই ইসলাম আসার আগে থেকেই পৌত্তলিক আমল থেকেই প্রচলিত ছিল।

সাহাবিদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জনের নাম ছিল আব্দুল্লাহ ও শতাধিক সাহাবির নাম ছিল আব্দুর রাহমান। দুইটা শব্দই ইসলাম আসার আগে থেকেই প্যাগানদের মাঝে বহুল প্রচলিত শব্দ ছিল।

উপরের যুক্তিগুলোতে স্পষ্ট হয়ে যায় ইসলামিক বা মুসলিম নাম বলে কিছু নেই। সবই এরাবিক বা আরবী নাম। অন্য সবার মতই আমাদের অভিভাবকও সহিহ ইসলামিক শব্দ ভেবেই আহমদ-মোহাম্মদ শব্দগুলো আমাদের নামের আগে ও পরে জুড়ে দিয়েছিলেন। অন্য সবার মতই তাঁরাও হয়তো জানতেন না, আহমদ-মোহাম্মদ শব্দগুলো মোটেও ইসলামিক নয়, বরং ইসলাম প্রচলনের বহু আগে থেকেই আরবের প্রচলিত শব্দ।

লেখক: তানভীর আহমদ, মো. খোরশেদ আলম