প্রচ্ছদ চিলেকোঠা উপন্যাস জনয়িতা | ২য় পর্ব || আফরোজা অদিতি

জনয়িতা | ২য় পর্ব || আফরোজা অদিতি

78

টর্নেডো হলে যেমন সাগর উথাল পাথাল জোয়ারে ভাসিয়ে দেয় তেমনই ফাতেমার বুকের ভেতর উথাল পাথাল শুরু হয়ে ওর দুচোখ ভাসিয়ে দিচ্ছে।

ফাতেমার বসে থাকতে ইচ্ছা করে না; বসে থাকতেও পারে না। শুয়ে পড়ে ও। কাল থেকে না-খাওয়া। পেটের ভেতরের সবকিছু শুকিয়ে গেছে। সারারাত পেটের ছুঁচোর দৌড় ছিল এখন আর নেই। একটা কথা ভেবে খুব কষ্ট হয় শাশুড়ির যত্ন নিতে কম করে না তবুও শাশুড়ি দেখতে পারে না ওকে। ও জানে না কোথায় কমতি ওর। বুঝতেও পারে না। বকাবকি করুক, গালমন্দ যাই করুক একবার তো ভালো কথা মুখ দিয়ে বের হয় মানুষের কিন্তু ওর শাশুড়ির মুখে সারাবেলা শুধু গালমন্দ। বকাবকি ছাড়া ভালো কথা কিছু বলতে পারে না। কাল থেকে খায়নি; খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করা তো দূরের কথা একবার জিজ্ঞাসাও করেনি শাশুড়ি ও খেয়েছে কিনা! মহব্বত বাড়ি থাকলে না খেয়ে কিছুতেই থাকতে দিতো না ওকে। ফাতেমা না খেলে, মহব্বতও খেতো না। বাড়িতে থাকলে খাবার সময় হলে কখনও ওকে ছাড়া খায়নি মহব্বত। শাশুড়ির কোন কথাতেই এর হেরফের হয়নি। মহব্বতের এই আদরটুকুর জন্যই ওকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না ওর। চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। ফাতেমা মুছে না। মহব্বতের এই আদরটুকুর জন্যই ওকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না ওর।

দরোজায় ধাক্কা। শাশুড়ির কণ্ঠ শোনা যায়।
‘এত্তো বেলা হইয়া গেল এখন পর্যন্ত উঠতাছ না ক্যান। আজ যে মেহমান আইবো সে কথা কী মনে নাই!’
ফাতেমা কথা বলে না। উঠে দরোজা খুলে দেয়। শাশুড়ির হাতে তসবী!
‘বাড়ির কাম করবো ক্যাডায়? আমি করবো! নবাবের বেটি! শুইয়া রইছো যে। কালকে তোমারে কইয়া রাখছি না মেহমান আইবো।’
শাশুড়ির কোন কথার জবাব দেয় না ফাতেমা। ঘরে গিয়ে আবার বিছানায় বসে। আজ মহব্বতের বিয়ের কথা পাকাপাকি হবে। মেয়ে পক্ষের লোকজন আসবে। একথা মনে হতেই আবারও চোখ ভরে জল আসে। তাই দেখে শাশুড়ির গজগজ করে।
‘সাত-সকালে চোক্ষে পানি! নাহ! অকল্যান না কইরা ছাড়বা না দেখি। আজ নতুন কথার দিন! আর তুমি চোক্ষের পানি দিয়া নতুন দিনডারে পিছল বানাইতাছ! যাও, কাম কর। কাইন্দা কোন লাভ হইবো না! আমি মহব্বতরে বিয়া দিয়াই ছাড়–ম! অ্যাই রকম কইরা থাকতে পারলে থাকবা না হইলে… ।’ কথা শেষ না করে তসবী টিপতে থাকে শাশুড়ি।

ফাতেমা এ কথারও কোন উত্তর দেয় না। শাশুড়ি চলে যায় তার জায়গায়। ফাতেমা ঘর থেকে বের হয় না, বের হতে ইচ্ছা করে না। কী হবে এই সংসারের কাজ করে! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সংসারের সব কাজ করে ফাতেমা। শাশুড়ি কোন কাজ করে না। শাশুড়িকে কোন কাজ করতে দেয় না ফাতেমা। কিন্তু শাশুড়ি একটুও ভালো ব্যবহার করে না ওর সঙ্গে। এতো যত্ন, এতো কাজ, সংসারের দেখ-ভাল, পরিবর্তে একটু ভালো ব্যবহার তো পাইতে পারে! কিন্তু না! শাশুড়ির কাছ থেকে কখনও তা পায় না! ওর স্বামী, মহব্বত কখনও অবহেলা করেনি ওকে! ওর জন্যই তো এই সংসারের সব কাজ করে, যার জন্যে ওর এই ব্যতিব্যস্ততা, ওর সংসার গোছানো! সেই স্বামী বিয়ে করবে ভাবতে অবাক লাগে ওর! স্বামীকে জিজ্ঞাসা করেনি কখনও! ভেবেছে শাশুড়ি কথায় বিয়ে করতেও পারে! আর বিয়েই যদি মহব্বত করে তাহলে…। ও আর ভাবতে চায় না। ওর তো আর কপাল এমন নয় যে ‘স্বামীর হাতে টাকা থাকলে বউ হয় লক্ষ্মীমন্ত’। ওর ফাটা কপাল।

নাহ, আর ভাবতে চায় না ফাতেমা। ও মহব্বতের দিকে তাকিয়ে থাকে। মহব্বত ওর স্বামী। বয়স ৩০। ছিমছাম, হালকা পাতলা। শহুরে বাবুর মতো দেখতে, গ্রামের ছেলে মনেই হয় না। শুধু যখন কথা বলে তখন গ্রামের টান থাকে একটু, আর শুদ্ধ, চলতি, আঞ্চলিক কথার মিশেল করে ফেলে। কথা বলার সময় সবসময় বলে ফাতেমা, আপনি যখন কথা বলবেন তখন একরকম করে বলবেন। হয় গাঁয়ের ভাষায় না হয় বইয়ের ভাষায়। মহব্বত হো হো করে হাসে। বলে, চেষ্টা করি তো বউ, কী করবো; পারি না। মহব্বতের এই হাসি খুব ভালো লাগে ফাতেমার। মহব্বতের হাসিতে মনে হয় ওর চারপাশে হাজার লক্ষ প্রজাপতির উড়ে বেড়াচ্ছে। এই মুহূর্তে ওর মনে হয় স্বামীর জন্য অনায়াসে এই নিরাসক্ত প্রাণটা দিতে পারে।

মহব্বতের একটা মুদির দোকান আছে। সব কিছু পাওয়া যায়। এই গ্রামে ওর দোকান সবচেয়ে বড়। চলেও ভালো। মহব্বতের দিকে আবার তাকায়। তার এতো ভালো মানুষ স্বামী, কিন্তু ওর ভাগ্যেই এতো কষ্ট কেন! এতো দুঃখ ক্যান কপালে লিখলা আল্লা! কী পাপ আমার! ফাতেমার আবার চোখ ভরে যায়।

ভেজা চোখে জানালার বাইরে তাকায়। আকাশের নীলে উড়ছে একটা একলা পাখি। বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েছে ওর ডানা। ঘুরছে আকাশে। ফাতেমার খুব ভালো লাগে। কান্না ভুলে চেয়ে থাকে সেদিকে। ওর পাখি হতে ইচ্ছা করে। আকাশে ডানা ভাসিয়ে দিয়ে অনেক দূরে চলে যেতে ইচ্ছা করে। অনেক অনেক অনেক দূরে। পরিচিত আবাস থেকে বাইরে। এক অপরিচিত পরিবেশে গিয়ে নতুন ভাবে নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছা করে ওর। বাঁচার ইচ্ছা প্রবল হয়। সেই তাগিদে ইচ্ছা করে স্বামীকে জড়িয়ে ধরতে। আবেগি হয়ে ধরতে গিয়ে পিছিয়ে আসে। ঘুম যদি ভেঙে যায় মানুষটার। ক্লান্ত মানুষটা। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মোহগ্রস্থের মতো।

স্বামীকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। এখনও করছে না। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে ওর যদি একটা কলার ভেলা থাকতো ভেসে যেতো। না বেহুলা লখিন্দরের মতো না; ওরা দুজনে; জ্যান্ত দুজন মানুষ। ওরা ভেসে ভেসে চলে যেতো দূরে বহুদূরে; যেখানে কেউ নেই; শাশুড়ি-মা নেই পাড়াপড়শি নেই; নেই কোন ভ-পীরের দল। ওর ভাবনা ছেদ পড়ে; শাশুড়ির কন্ঠ ভেসে আসে।

‘কই, ঘর থাইক্কা বাইর হইলা না। তাড়াতাড়ি আসো।’ ফাতেমার ঘর থেকে বের হতে ইচ্ছা না করলেও বের হয়। শাশুড়ি গুরুজন। অবহেলার পাত্র নয়। গুরুজনদের অবহেলা করতে শিখেনি কখনও। কিন্তু প্রতিবাদ করতে তো বাধা নেই। ও কেন করে না; কিসের ভয়ে। ওর মন জানে ভয়ে নয়; ও ইচ্ছা করেই প্রতিবাদ করে না। সেই ফুলশয্যার রাতের কথা মনে পড়ে; ওর স্বামী বলেছিল, ‘ফাতেমা তুমি আমার বউ। আমার মাকে কখনও অবহেলা করো না। আমার মায়ের মুখে মুখে তর্ক করো না কখনও। মায়ের জন্যই তো আমার এতো বড় হয়ে ওঠা।’ স্বামীর কথা রাখতেই এই নিরবতা।

ফাতেমা নিরবে সামনে এসে দাঁড়ায়। ফাতেমা দাঁড়াতেই শাশুড়ি বলে, ‘যাও ফিরনি রান্না করো। মহব্বতকে ডাকো, মিষ্টি আনুক। ভালো মিষ্টি য্যান আনে। আর মহব্বতরে কওনের দরকার নাই, যে অরে দেখবার আইতাছে।’

ফাতেমা না গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বলে, ‘কী হইলো, খাড়াইয়া আছ ক্যান খাম্বার মতন! দশটার সময় আইবো সব!’

এর মধ্যে মহব্বত বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে কখন কেউ দেখেনি। মহব্বত জিজ্ঞাসা করে, ‘কে আইবো মা।’ কিছু বলে না ফাতেমার শাশুড়ি। মা কোন কথা বলছে না দেখে ফাতেমাকে জিজ্ঞেস করে মহব্বত, ‘কে আইবোরে বউ।’

ফাতেমাও কিছু বলে না। ‘কী রে কথা কস না ক্যান!’/ ‘ও কী কইবো। আমি কইতাছি! আমি তরে আবার বিয়া দিমু। আজ মাইয়া পক্ষ আইবো।’/ ‘কী!’ অবাক করা চিৎকার বের হয় ওর কন্ঠ চিরে; ‘কার বিয়া দিবা!’/ ‘তোর, আবার কার!’ নির্বিকার কণ্ঠ মায়ের।

‘ক্যান বিয়া দিবা আমার! এই বউ কী দোষ করছে!’ / ‘আমার বংশের বাতি চাই!’ মহব্বত অবাক চেয়ে থাকে মায়ের দিকে। মাকে বুঝতে চেষ্টা করে। এরমধ্যে মেয়ে পক্ষের লোকজন ঢুকে পড়ে বাড়িতে। আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মা।

মহব্বত কিছু বলতে চেয়েও পারে না। বারান্দায় হতাশ বসে পড়ে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওর বউ। ওর ভালোবাসার মানুষ। ওর কোন দোষ নাই। মহব্বত জানে ছেলেপেলে না হওয়ার দোষ ওর। ও পরীক্ষা করিয়েছে। ওর বীর্য সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম। এ কথা লজ্জায় বলতে পারেনি ফাতেমাকে। মাকে তো নয়ই। কিন্তু না বলার ফলাফল যে এমন হবে বুঝতে পারেনি ও। ফাতেমাকে কাজ শেষে ঘরে যেতে বলে ঘরে যেতে উদ্যোত হয় মহব্বত।

‘কোথায় যান আপনে। মা মিষ্টি আনতে বলছে।’/ ‘মিষ্টি-ফিস্টি আনতে পারবো না।’ রাগে গজগজ করে মহব্বত।/ ‘এমন করবেন না তো। বাড়িতে মেহমান কী বলবে!’ মহব্বত বউয়ের মুখের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। বলে, ‘তোরে কী দিয়া পয়দা করছে খোদায়, ক আমারে। আমি না হয় একদিন তোর কইছিলাম মায়ের মুখে মুখে তর্ক না করতে তাই বলে এই সব অত্যাচার অনাচার করবে তার প্রতিবাদ করবি না।’

ফাতেমা আবার মোহগ্রস্থ হয়। কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারে না। ঐ ঘর থেকে কথার আভাস আসছে। আনন্দময় কথায় বাড়ির বাতাস আস্তে আস্তে মুখর হচ্ছে। শাশুড়ি দরোজায় এসে দাঁড়ায়। সেদিকে চোখ পড়তেই মোহ কেটে যায় ফাতেমার। বলে, ‘যান তো মিষ্টি নিয়ে আসেন। আমি শরবত দিয়ে ফিরনি রান্না করি।’ মহব্বত গায়ে জামাটা চাপিয়ে বের হয়ে যায়। মনের মধ্যে ফাতেমার জন্য আরও ভালোবাসা জমাট বাঁধে। ঐ জমাট ভালোবাসা একসময় সুন্দর এক শিশির ভেজা গোলাপে পরিণত হয়।

মেয়ে পক্ষ থেকে ছয়জন এসেছে। এরা পাশের গ্রামের। মেয়ের বাবা অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। দেখতে সুন্দর। বয়স ফাতেমার থেকে কম। শরবত আর মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢোকে ফাতেমা। ওকে দেখেই মেয়ের মা প্রশ্ন করে, ‘এই মেয়েটি কে?’
‘ও ফাতেমা। মহব্বতের বউ আছিল। তালাকের নোটিশ দেওয়া হইছে, হইয়া যাইবো। আমার ছেলেরে যদি আপনাদের পছন্দ হয়, আর আমাদের মাইয়া পছন্দ হইলে চইলা যাইবো ওই পোড়ারমুখি। খুব গরীব তো তাই সারাদিন এইখানে কাম করে, সন্ধ্যায় চইলা যায়। বিয়া হইয়া গেলে ওরে আর কামে রাখুম না।’

একটু থামে মহব্বতের মা। তারপর বলে, ‘আমি বাতের রুগি। কাম তো করতে পারি না, তাই…। একটু থেমে বলে, কামের লোক তো পাওয়া যায় না। গাঁয়ে কেউ কাম করতে চায় না। তাছাড়া কেউ কেউ চালের কলে কাম করে আবার কেউ কেউ শহরে গার্মেন্ট না কি য্যান হইছে সেখানে কাম করে। ওরে ছাড়া উপায় নাই তাই… তয় ভাইবেন না রাখুম না।’

মেয়ের মায়ের তড়িঘড়ি জবাব। ‘না, না রাখবেন না ক্যান। রাখবেন। ছেলে আমাদের পছন্দ হইছে! আমার মেয়ে তো কাজ করতে পারে না। আহ্লাদে আহ্লাদে মানুষ কি- না।একটাই মেয়ে বুঝেনই তো। আমরা সব দিব। খাট-পালঙ থেকে গয়না গাটি সব। দোকানটাও বড় করে দিবো।’ প্রায় ঘন্টাখানেক কথাবার্তা হয়। ফাইনাল কথা হবে আগামী সপ্তাহে। মেয়েপক্ষ বিদায় নেয়।

চলবে…